বজ্রপাত বাড়ছেই ঝরছে প্রাণ

এবার মৃত্যু গতবারের চারগুণ

0
85
বজ্রপাত।

দেশে বজ্রপাত শুরুর সময় ধরা হয় এপ্রিল মাস। জুন পর্যন্ত আকাশে ঘন কালো মেঘ থাকে। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বজ্রপাত থাকলেও শুরুর তিন মাসকে ‘পিকটাইম’ গণ্য করেন বিশেষজ্ঞরা। এবার বজ্রপাতের ভয়ংকর রূপ দেখা গেছে এপ্রিলেই। এ মাসে প্রাণ গেছে অন্তত ৮৩ জনের, যা গত বছরের এপ্রিল মাসের তুলনায় প্রায় চার গুণ।

করোনাভাইরাসের কারণে চলমান পরিস্থিতিতে এ বছর বজ্রপাতে কম মৃত্যুর আশঙ্কা করেছিলেন সংশ্নিষ্টরা। কিন্তু প্রথম মাসেই অনেক মৃত্যুর ঘটনা ভাবিয়ে তুলেছে তাদের। নিহতদের অধিকাংশই পুরুষ। এর মধ্যে অন্তত ২৫ জন কৃষক।

জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে পাহাড়ি ঢল এবং বৈরী আবহাওয়া সৃষ্টির আগে গোলায় ধান তুলতে বজ্রপাতের হুমকি নিয়েই মাঠে রয়েছেন কয়েক লাখ কৃষি শ্রমিক। কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক গত শনিবার বলেছেন, ধান কাটতে গিয়ে কোনো কৃষক বা শ্রমিক মারা গেলে প্রত্যেকের পরিবারকে এক লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বজ্রপাতে নিহতদের বেশিরভাগই কর্মঠ ব্যক্তি। এদের হারিয়ে একেকটি পরিবার দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে। প্রাণহানি কমাতে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় মোবাইল ফোনের টাওয়ারে লাইটেনিং এরস্টোর লাগানো যেতে পারে। তবে কম কাভারেজ ও ব্যয়সাপেক্ষ হওয়ায় সরকার এ পদ্ধতির দিকে যাচ্ছে না।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মহসীন বলেন, বিদ্যুতের খুঁটিতে এরস্টোর লাগানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। বজ্রপাতের ভয়ে গত বছর সুনামগঞ্জের হাওরে ধানকাটা শ্রমিক যেতে চায়নি। ভয় দিন দিন বেড়েই চলেছে।

বেসরকারি সংগঠন ডিজাস্টার ফোরামের হিসাব অনুযায়ী গত বছর এপ্রিলে মারা গিয়েছিল ২১ জন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের আলোকে সংগঠনটি বলছে, চলতি এপ্রিলে প্রাণহানি ৬২ জন। তবে সমকালের নিজস্ব পর্যবেক্ষণে ৮৩ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। ফোরামের সমন্বয়ক মেহেরুন নেসাও বলছেন, তারা এপ্রিলের সম্পূর্ণ তথ্য এখনও হালনাগাদ করেননি। সংখ্যাটি বাড়তে পারে। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২২ থেকে ২৪ এপ্রিল তিন দিনে বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছে ৩৬ জন। ২২ এপ্রিল ৬ জেলায় ১৪ জন, ২৩ এপ্রিল ৭ জেলায় সাতজন এবং ২৪ এপ্রিল ১২ জেলায় ১৫ জন মারা যায়। ৪ এপ্রিল শুরু হয় মৌসুমের প্রথম বজ্রপাত। প্রথম দিনেই মারা যায় তিনজন। এ পর্যন্ত নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৯ জন চট্টগ্রাম বিভাগে। এরপর ঢাকা বিভাগে ১৮ জন, বরিশালে ১২, ময়মনসিংহে ১১, খুলনায় ৮, সিলেটে ৬, রংপুরে ৫ এবং রাজশাহীতে ৪ জন।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের গবেষণায় দেখা গেছে, এপ্রিলে বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে কিশোরগঞ্জ, পটুয়াখালী এবং লক্ষ্মীপুরে। তিন জেলায় প্রাণ হারিয়েছে ছয়জন করে। গাইবান্ধা ও ময়মনসিংহে পাঁচজন করে মারা যায়। হাওর এলাকা সুনামগঞ্জ এবং খাগড়াছড়িতে মৃত্যু চারজন করে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মো. আবদুল মান্নান জানান, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত বজ্রবৃষ্টি বেশি হয়। বজ্রপাতের সময়সীমা ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট। খোলা স্থানে বজ্রপাত হলে মৃত্যুঝুঁকি বেশি থাকে। এ জন্য হাওরাঞ্চলে বজ্রপাত পূর্বাভাস যন্ত্র বসানো যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অব জিওগ্রাফির গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বে বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয় বাংলাদেশে। বিশ্বে মোট বজ্রপাতের এক-চতুর্থাংশ বাংলাদেশে ঘটে বলে জানানো হয়েছে ন্যাশনাল লাইটনিং সেফটি ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনেও।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে গত এক দশকে (২০১০ থেকে ২০১৯ সাল) দেশে বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন দুই হাজার ৮১ জন। ২০১৮ সালে সবচেয়ে বেশি ৩৫৯ জনের প্রাণহানি ঘটে। ২০১৬ সালে চার দিনে ৮১ জনের প্রাণহানির পর নড়েচড়ে বসে সরকার। সে বছরই বজ্রপাতকে দুর্যোগ ঘোষণা করা হয়।

আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, আগামী এক সপ্তাহে চট্টগ্রামের কিছু স্থানসহ দেশের বাকি সব বিভাগে হাল্ক্কা থেকে মাঝারি ধরনের বজ্রবৃষ্টি হতে পারে। কৃষি শ্রমিকদের প্রতি দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ- আকাশে ঘন কালো মেঘ দেখা দিলে ঘরের বাইরে যাওয়া যাবে না। বাইরে থাকলে এই পরিস্থিতিতে নিকটস্থ সুবিধামতো স্থানে আশ্রয় নিতে হবে। বজ্রপাতের সময় ধানক্ষেত বা খোলা মাঠে থাকলে তাড়াতাড়ি পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে এবং কানে আঙুল দিয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকতে হবে।

জয়নাল আবেদীন

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে