ফেরিঘাটের সেই তিন ঘণ্টা এখন শুধু কাঁদায়

0
329
হাইকোর্টে তিতাসের মা সোনামণি ঘোষ।

আদালতের কার্যক্রম তখনো শুরু হয়নি। তিতাস ঘোষের মা সোনামণি ঘোষ এজলাসের পেছনের বেঞ্চে চুপচাপ বসে ছিলেন।

জানতে চাইলাম, কেমন আছেন?
সোনামণি ঘোষের জবাব, ভালো নেই।
একপর্যায়ে কাঁদতে থাকেন তিনি।

কিছুটা সময় নিয়ে সোনামণি ঘোষ বললেন, ‘আমার বুকের ধন তিতাস। এক থালায় খাইতাম, এক বালিশে ঘুমাইতাম। ফেরিঘাটে তিন-তিনটা ঘণ্টা কতজনের হাত-পায়ে ধরে বলেছিলাম, আমার ছেলে তিতাস অ্যাম্বুলেন্সে আছে। ঢাকায় হাসপাতালে না নিতে পারলে ও মারা যাবে। অ্যাম্বুলেন্সটা একটু উঠতে দিন। কিন্তু কেউ শোনেনি আমার কথা। ভিআইপির জন্য আমার ছেলে মারা গেল।’ কথা বলার সময় সোনামণি ঘোষের কথা জড়িয়ে আসছিল।

গত ২৫ জুলাই রাতে সরকারের অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্পের যুগ্ম সচিব আবদুস সবুর মণ্ডলের গাড়ির অপেক্ষায় প্রায় তিন ঘণ্টা মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ি ১ নম্বর ফেরিঘাটে বসে থাকায় আটকে পড়া অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে স্কুলছাত্র তিতাস ঘোষের মৃত্যু হয়। এই খবর সংবাদমাধ্যমে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। তিতাস ঘোষের এমন মৃত্যুর ঘটনায় তিন কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে গত ৩০ জুলাই হাইকোর্টে রিট করেন লিগ্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড পিপলস রাইটসের চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জহির উদ্দিন।

 

রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে অতিরিক্ত সচিবের নিচে নন, এমন পদমর্যাদার কর্মকর্তার নেতৃত্বে তিতাসের মৃত্যুর ঘটনার তদন্ত করার নির্দেশ দেন বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ।

আজ বুধবার প্রতিবেদন দেওয়ার দিন ধার্য ছিল। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার আদালতকে বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত হয়নি। কেন তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি, তা জানতে চান আদালত। তখন ডিএজি আবদুল্লাহ মাহমুদ জানান, তদন্তকাজ চলছে।

তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য আদালতের কাছে সময় চান রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী। আদালত আগামী ২৩ অক্টোবর প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।

নড়াইলের ছেলে তিতাস কালিয়া সরকারি পাইলট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ত। গত ২৪ জুলাই মোটরসাইকেলে বরযাত্রী হিসেবে বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় নড়াইল শহরের পাশে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয় তিতাস। এরপর তাকে নেওয়া হয় নড়াইলের হাসপাতালে। সেখান থেকে নেওয়া হয় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এরপর তিতাসকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হন সোনামণি ঘোষ।

হাইকোর্টে তিতাসের মা সোনামণি ঘোষ।

 

তিতাসের মা আদালতে

শুনানির সময় রিটকারী আইনজীবী জহির উদ্দিন আদালতকে বলেন, তিতাসের মা সোনামণি ঘোষ আদালতে এসেছেন।
তখন সোনামণি ঘোষ আদালতের এজলাসে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

এ সময় জাহির উদ্দিন আদালতকে জানান, তিতাসের মৃত্যুর ঘটনাটি যাঁরা তদন্ত করছেন, তাঁরা তিতাসের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এখনো দেখা করেননি।

তখন আদালত বলেন, ‘প্রতিবেদন আসার পর আমরা দেখব, তদন্ত কমিটি কাদের সঙ্গে কথা বলেছে।’

মামলার শুনানি শেষে আদালত চত্বরে সোনামণি যখন তিতাসের মৃত্যুর ঘটনা শোনাচ্ছিলেন, তখন অনেকেই ভিড় করেন।
সোনামণি জানান, তিতাস স্বপ্ন দেখত বড় হয়ে সে গোয়েন্দা পুলিশ হবে।

তখন হাতে থাকা ব্যাগ থেকে একে একে তিতাসের অনেক ছবি বের করেন। তিনি বলতে থাকেন, ‘এই আমার ছেলে তিতাস। একটা স্বাধীন দেশে ভিআইপির জন্য আমার ছেলে মারা গেল।’

সোনামণি প্রথম আলোকে বলেন, ‘মানুষের বেঁচে থাকার জন্য কিছু না কিছু থাকে। তিতাস চলে যাওয়ায় আমার আর কিছুই রইল না।’

তিতাসের মৃত্যুর পর অসুস্থ হয়ে এক সপ্তাহ হাসপাতালে ছিলেন সোনামণি ঘোষ। এখনো তিনি অসুস্থ। সোনামণি বলেন, ‘শেষনিশ্বাস ত্যাগ করার আগে তিতাসের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়েছিল। তখন আমার মনে হয়েছিল, তিতাসের জীবন ভিআইপির হাতে।’ তিনি বললেন, ‘আমার তিতাস তো কথা বলতে পারছিল না। আমার মন বলে, তিতাস আমাকে বলেছিল, মা তুমি তো আমার জন্য কিছুই করতে পারলে না। আমারই চোখের সামনে তিতাস মারা গেল। ফেরিঘাটের সেই তিন ঘণ্টা আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়; তাড়িয়ে বেড়াবে সারা জীবন।’ শেষে এই মায়ের কথা, ‘আর কিছুই চাই না, আমি চাই বিচার।’

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে