প্রথম শ্রেণি পেয়েও বেকার ৩৪%

0
279
গবেষণায় দেখানো হয়েছে, শিক্ষিতদের এক-তৃতীয়াংশই বেকার। তাঁদের মধ্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী বেকার বেশি। ফাইল ছবি

স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণি পেলেও দেশে ভালো চাকরির নিশ্চয়তা নেই। উচ্চশিক্ষায় দুর্দান্ত ফল অর্জনকারীদের মধ্যে ২৮ থেকে সাড়ে ৩৪ শতাংশ বেকার। আবার যাঁরা চাকরি পান, তাঁদের ৭৫ শতাংশেরই বেতন ৪০ হাজার টাকার কম।

উচ্চশিক্ষিত মেধাবীদের চাকরি, বেতন ও বেকারত্বের এই হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায়। বিআইডিএসের মহাপরিচালক কে এ এস মুরশিদের নেতৃত্বে শিক্ষিত তরুণদের নিয়ে গবেষণাটি করা হয়।

ওই গবেষণায় দেখানো হয়েছে, শিক্ষিতদের (এসএসসি, এইচএসসি, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী) এক-তৃতীয়াংশই বেকার। তাঁদের মধ্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী বেকার বেশি।

মেধাবীদের মধ্যে বেকারত্ব বেশি 

বিআইডিএসের গবেষণা অনুযায়ী, সার্বিকভাবে শিক্ষিতদের মধ্যে ৩৩ শতাংশের বেশি বেকার। আর এসএসসি, এইচএসসি, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে যাঁরা প্রথম শ্রেণি পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে বেকারত্ব সাড়ে ১৯ থেকে সাড়ে ৩৪ শতাংশ। বিশেষ করে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে প্রথম শ্রেণিপ্রাপ্তদের মধ্যে ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশই বেকার। স্নাতক পর্যায়ে এমন মেধাবীদের বেকারত্বের হার প্রায় ২৮ শতাংশ।

 এদিকে এসএসসিতে জিপিএ–৫ পাওয়া প্রতি তিনজনের একজনই বেকার বসে আছেন। আর উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে জিপিএ–৫ পাওয়াদের মধ্যে ৩১ শতাংশের বেশি বেকার।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা অনুযায়ী, কাজপ্রত্যাশীদের মধ্যে সপ্তাহে ন্যূনতম এক ঘণ্টা মজুরির বিনিময়ে কাজের সুযোগ না পেলে বেকার হিসেবে ধরা হয়। বাংলাদেশে এমন বেকার ২৭ লাখ।

বিআইডিএসের গবেষণায় বলা হয়েছে, স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণি পেয়েও চাকরি মেলে না।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন গতকাল শনিবার বলেন, ‘হতাশার বিষয় হলো মাস্টার্স পাস করেও ১০ হাজার টাকা বেতনের চাকরি না পাওয়া। পছন্দমতো চাকরি তাঁরা পাচ্ছেন না কিংবা বাজারে যে ধরনের চাকরি আছে, সেই ধরনের ডিগ্রি তাঁদের নেই। এতে সমাজ ও সরকার যে বিনিয়োগ করল, সেটা কাজে লাগল না। এভাবেই শিক্ষিত শ্রমশক্তির অপচয় হচ্ছে।’

বেতন মেলে কম

গবেষণায় প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, প্রথম শ্রেণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী চাকরিজীবীদের মধ্যে মাত্র ২৫ দশমিক ৪৯ শতাংশের বেতন ৪০ হাজার টাকার বেশি। এমন মেধাবীদের মধ্যে আবার ১০ শতাংশ মাসে ১০ হাজার টাকাও বেতন পান না। বাকি ৬৫ শতাংশ মেধাবীর বেতন ১০ থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে। স্নাতকোত্তরে দ্বিতীয় শ্রেণি পেয়েছেন, এমন তরুণ-তরুণীদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের বেতন ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে।

সিজিপিএ ফলাফলের ভিত্তিতে কেমন বেতন মেলে, সেই চিত্রও উঠে এসেছে বিআইডিএসের গবেষণায়। সিজিপিএ সাড়ে তিনের বেশি স্কোর করা ৪৫ শতাংশ স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ৪০ হাজার টাকার বেশি বেতন পান।

স্নাতকে প্রথম শ্রেণি পাওয়া ২৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ ডিগ্রিধারী ৪০ হাজার টাকার বেশি বেতন পান। এ ধরনের ৭০ শতাংশ মেধাবীর বেতন ১০ থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে। আর ৫ শতাংশ তো মাস শেষে ১০ হাজার টাকাও পান না। স্নাতক পর্যায়ে সিজিপিএ পদ্ধতিতে সাড়ে ৩ শতাংশের বেশি স্কোরধারীদের প্রায় ৩৯ শতাংশের বেতন ৪০ হাজার টাকার বেশি।

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, শিক্ষাগত পারফরম্যান্স (প্রথম শ্রেণি বা ভালো রেজাল্ট) চাকরির বাজারে বেতন বেশি পাওয়ার জন্য একমাত্র নিয়ামক নয়; তবে চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণি পাওয়া মেধাবীরা এগিয়ে থাকেন। কিন্তু চাকরিতে তিনি কেমন করছেন, কতটা দক্ষ হয়েছেন—সেটাই পরবর্তী সময়ে বেতন-বৃদ্ধির নিয়ামক হয়ে যায়। তিনি অবশ্য বলেন, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রথম শ্রেণি পাওয়া মেধাবীরা বেশি বেতনের চাকরি পাবেন এবং তাতে সফল হওয়ার ব্যাপারে খুব আশাবাদী থাকেন। কিন্তু পরে বাস্তবতার সামনে পড়ে তাঁরা হতাশ হন।

এই গবেষণায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা হয়েছে। ৬ লাখ ১৮ হাজার ২৬২ জন তরুণ-তরুণীকে ফেসবুক ও ই–মেইলের মাধ্যমে গবেষণার প্রশ্ন পাঠানো হয়। তাঁদের মধ্যে ১৫ হাজার ২৫ জন উত্তর পাঠিয়েছেন। তাঁদের উত্তরের ভিত্তিতেই গবেষণাটি করা হয়েছে। তাঁরা সবাই স্নাতকোত্তর, স্নাতক, উচ্চমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক পাস।

জানতে চাইলে বিআইডিএসের মহাপরিচালক কে এ এস মুরশিদ বলেন, চাকরির বাজারের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এখনো অন্যদের তুলনায় উচ্চশিক্ষিতরা তুলনামূলক বেশি বেতন পান। আবার তাঁদের মধ্যে বেকারও বেশি। চাকরির বাজারের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার ভালো সমন্বয় হচ্ছে না। কারিগরি শিক্ষায় অবশ্য কাজের সুযোগ বেশি।

 কে এ এস মুরশিদ আরও জানান, বিআইডিএস পুরো শ্রমবাজারের যোগ্যতা, দক্ষতা নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করছে। তখন আরও বিস্তারিত জানা যাবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে