পেঁয়াজের দামের ঝাঁজে কান্না দক্ষিণ এশিয়ায়

0
259
ভারতের কলকাতার একটি বাজারে এক পাইকারি পেঁয়াজ বিক্রেতা ক্রেতার অপেক্ষায় আছেন। বিক্রি-বাট্টা শুরুর আগে অলস সময়টুকুতে সংবাদপত্রে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছেন তিনি। রয়টার্স ফাইল ছবি

দক্ষিণ এশিয়ার হেঁশেলে পেঁয়াজ নিত্যপণ্য। এই অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি রান্নার পদে—হোক সেটা পাকিস্তানের চিকেন ফ্রাই, ভারতের সম্বর কিংবা বাংলাদেশের বিরিয়ানি—পেঁয়াজ লাগবেই। তবে হঠাৎ এই পণ্যের আকাশছোঁয়া দামে এই অঞ্চলের লাখ লাখ রাঁধুনির কান্না ঝরছে।

পেঁয়াজের এই উচ্চ দামের প্রধান কারণ ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা। বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, ভারতে এবার বর্ষাকাল দীর্ঘায়িত হয়েছে। এ ছাড়া ভারী বর্ষণে পেঁয়াজের উৎপাদন বিঘ্নিত হওয়ায় মজুত কমেছে। ফলে আশপাশের দেশগুলোকে নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে রেখেই হঠাৎ পেঁয়াজের রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করেছে ভারত।

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর এক সবজির বাজারে দাঁড়িয়ে গৃহিণী সীমা পোখারেল রয়টার্সকে বলেন, পেঁয়াজের এবারের মূল্যবৃদ্ধি রীতিমতো ভয়ংকর। গত মাসের তুলনায় এবার দামটা দ্বিগুণ।

দ্রুত আমদানির সুবিধার জন্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো পেঁয়াজের জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীল। এই অঞ্চল ভারতের বিকল্প হিসেবে চীন ও মিসর থেকে পেঁয়াজ আনতে পারে। তবে এসব দেশের তুলনায় ভারতের পেঁয়াজ দ্রুত আমদানিকারক দেশে পৌঁছায় বলে গুণে-মানে ভালো থাকে।

গত ছয় বছরের মধ্যে এবারই ভারতে ১০০ কেজি পেঁয়াজের দাম বেড়ে ৪ হাজার ৫০০ রুপিতে (প্রায় ৫ হাজার ৩০০ টাকা) পৌঁছেছে। এ কারণে দেশটি গত রোববার পেঁয়াজ রপ্তানি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে। আর এই নিষেধাজ্ঞার পর বাংলাদেশের মতো অন্য দেশগুলোও এখন পেঁয়াজ আমদানির জন্য মিয়ানমার, মিসর ও চীনের দিকে ঝুঁকছে। তবে যে ধাক্কা এসব দেশের পেঁয়াজের বাজারে লেগেছে, তা হঠাৎ কাটিয়ে ওঠা সহজে সম্ভব হবে না।

মিসর থেকে পেঁয়াজ বাংলাদেশে পৌঁছাতে অন্তত এক মাস সময় লাগে। চীন থেকে আসতে সময় লাগে ২৫ দিনের মতো।

‘ইন্ডিয়ান এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড প্রোসেসড ফুড প্রোডাক্ট এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট অথোরিটি’ জানিয়েছে, ২০১৮/১৯ অর্থ বছরে ৩১ মার্চ পর্যন্ত ভারত ২ কোটি ২২ লাখ টন পেঁয়াজ রপ্তানি করেছে। ব্যবসায়ীদের অনুমান, এই রপ্তানির অর্ধেকের বেশির গন্তব্য ছিল এশিয়ার দেশগুলো।

এদিকে ভারতের রপ্তানি বন্ধের পরে অন্যান্য রপ্তানিকারক দেশও এর সুবিধা উশুল করতে চাচ্ছে। তারা এই সুযোগে দাম বাড়াচ্ছে বলে জানান বাংলাদেশের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইদ্রিস।

ঢাকায় পেঁয়াজের দাম এখন আকাশছোঁয়া। এক কেজি পেঁয়াজের জন্য ভোক্তাদের এখন ১২০ টাকার মতো ব্যয় করতে হচ্ছে। কয়েকদিন আগেও ঢাকায় এই দামের অর্ধেক টাকায় পেঁয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। ২০১৩ সালের পর এবারই পেঁয়াজের দামের ঝাঁজ এত বেড়েছে।

ইদ্রিস বলেন, ‘এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোতেও পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। সবাই ভারতের নিষেধাজ্ঞার সুযোগ নিচ্ছে।’

পেঁয়াজের সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে ভর্তুকি দিয়ে সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ(টিসিবি) মাধ্যমে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করেছে। টিসিবির মুখপাত্র হুমায়ুন কবির বলেন, ‘পেঁয়াজ আমদানির জন্য আমরা সব বিকল্প পথের কথা ভাবছি। যত দ্রুত সম্ভব দেশে পেঁয়াজ আমদানি করাটাই এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’ ভারত বাদে অন্য দেশ থেকে পেঁয়াজের চালান আনতে যথেষ্ট সময় লাগে।

সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে ভর্তুকি দিয়ে সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করেছে।

ব্যবসায়ী ইদ্রিস বলেন, ‘মিসর থেকে পেঁয়াজ বাংলাদেশে পৌঁছাতে অন্তত এক মাস সময় লাগবে। চীন থেকে আসতে সময় লাগে ২৫ দিনের মতো।’

ভারতের পরিবর্তে অন্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর এ মুহূর্তে আর কোনো বিকল্প পথ নেই। এরই মধ্যে মিসর থেকে পেঁয়াজ আমদানির তোড়জোড় শুরু করেছে শ্রীলঙ্কা। গত সপ্তাহে দেশটির বাজারে পেঁয়াজের দাম ৫০ শতাংশ বেড়েছে।

পেঁয়াজের দামের এই হঠাৎ ঊর্ধ্বগতি সহজে কমবে না বলে জানাচ্ছে রয়টার্স। মুম্বাইভিত্তিক ওনিয়ন এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অজিত শাহ্ বলেন, ‘ভারতের বাজার স্থিতিশীল রাখতে মিসর থেকে পেঁয়াজ আমদানি করতে হচ্ছে। আগামী গ্রীষ্মের সময় বাজারে নতুন পেঁয়াজ ঢুকলেই তবে এই পণ্যের দাম কমবে।’ অজিত শাহ বলেন, ‘বাজারে পেঁয়াজের দাম পড়তে শুরু করলে ভারত আবারও এই পণ্য রপ্তানি করতে পারবে। আর ভারতের রপ্তানি শুরু না হওয়া পর্যন্ত এশিয়ায় এই পণ্যের সরবরাহ কিছুটা ঘাটতি থাকবেই।’

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে