পেঁয়াজের এলসি নিয়ে ‘কানামাছি’

0
185
পেঁয়াজ। ফাইল ছবি

পেঁয়াজের এলসি (ঋণপত্র) খোলা নিয়ে ‘কানামাছি’ খেলছেন বড় শিল্পপতিরা। উদ্ভিদ সংগনিরোধ থেকে গত দুই মাসে দুই লাখ টনের বেশি পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি নিলেও ব্যবসায়ীরা এলসি খুলেছেন মাত্র ৮০ হাজার টনের। সেই এলসির পণ্যও আসছে না ঠিকঠাকভাবে। গত এক মাসে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে বড় শিল্পপতিদের মাত্র আট হাজার ৩৪৩ টন পণ্য এসেছে দেশে। আর বিমানপথে এসেছে মাত্র ৪৭৪ টন পেঁয়াজ। এদিকে, শুল্ক্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর তলব করার পর সতর্কভাবে এগোচ্ছেন অন্য আমদানিকারকরাও। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পেঁয়াজ আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন তারা। এ কারণে পেঁয়াজের বাজার অস্থির আছে দুই মাস ধরে। খুচরা বাজারে এখনও ২০০ থেকে ২৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে পেঁয়াজ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজার স্বাভাবিক করতে হলে পেঁয়াজের আমদানি বাড়াতে হবে দ্রুত। কারণ, দেশের পেঁয়াজ বাজারে আসতে আরও অন্তত ১৫ দিন সময় লাগবে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিলে নিত্যপ্রয়োজনীয় এ পণ্যের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে সর্বকালের সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হয়। আজ শুক্রবার ওই ঘটনার দুই মাস পূর্ণ হলেও দাম কমার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না।

ঢাকার উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের পরিচালক ড. আজাহার আলী বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে অনুমতিপত্র নেওয়ার পর চার মাস আমদানির সময় পান ব্যবসায়ীরা। কোনো কারণে এ সময়ের মধ্যে পণ্য আনতে না পারলে আরও দুই মাস বাড়তি সময় দেওয়া হয়। এ কারণে অনুমতিপত্র নিয়েও যারা এখনও এলসি খোলেননি, তাদের আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না; চাপও দেওয়া যাচ্ছে না।’

তিনি জানান, আমদানির জন্য এ পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ টন পেঁয়াজের অনুমতিপত্র ইস্যু করেছেন তারা। এর মধ্যে শুধু গত দুই মাসে ইস্যু করেছেন এক লাখ ৩৪ হাজার টনের।

উদ্ভিদ সংগনিরোধ চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর শাখার উপপরিচালক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বুলবুল বলেন, ‘বড় ব্যবসায়ীদের বেশির ভাগ চালান এ বন্দর দিয়েই আসবে। বিমানপথে আনা হচ্ছে অল্প পরিমাণ পণ্য। ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের পর গতকাল পর্যন্ত মাত্র আট হাজার ৩৪৩ টন পণ্য এসেছে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। অথচ এই বন্দর দিয়ে পণ্য আনতে গতকাল পর্যন্ত অনুমতিপত্র ইস্যু করেছি ৯৫ হাজার ৬৩৪ টনের।’

উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্র শাহজাহাল বিমানবন্দর শাখার উপপরিচালক রতন কুমার সরকার জানান, বিমানপথে এখন পর্যন্ত মাত্র ৪৭৪ টন পেঁয়াজ এসেছে। এ হিসাবে বড় শিল্পপতিদের পেঁয়াজ এসেছে সব মিলিয়ে আট হাজার ৮১৭ টন। অথচ অনুমতিপত্র নেওয়া হয়েছিল দুই লাখ টনের।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা কর্মকর্তা খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘ভারতের বিকল্প দেশ থেকে জরুরি ভিত্তিতে পেঁয়াজ আনতে যেসব ব্যবসায়ী অনুমতিপত্র নিয়েছেন, তারা কেউই প্রকৃতপক্ষে পেঁয়াজ ব্যবসায়ী নন। সরকারের অনুরোধে ঢেঁকি গিলেছেন তারা। প্রশাসনকে খুশি করতে গত এক মাসে ব্যাপক হারে তারা অনুমতিপত্র নিয়েছেন। কিন্তু আমদানি প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এলসি কার্যক্রম সম্পন্ন করেননি অনেকেই। অথচ বাজার স্থিতিশীল ও স্বাভাবিক করতে হলে পেঁয়াজ আমদানি বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, প্রয়োজনে সরকারের উচিত উদ্যোগী হয়ে পেঁয়াজ আনা। আর অনুমতিপত্র নিয়েও কেন পেঁয়াজ আসতে এত দেরি হচ্ছে, সেটিও খতিয়ে দেখা উচিত।

পেঁয়াজ আমদানির সুবিধার্থে এলসি মার্জিন ও সুদের হার কমাতে গত ২ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশনা দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। পেঁয়াজবোঝাই জাহাজ ও ট্রলারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পণ্য খালাসের সুযোগও দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের ১০ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারা স্ব-স্ব্ব জেলায় গিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পেঁয়াজ খালাসের ব্যবস্থাও করেন। কিন্তু এলসি খুলে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ না আসায় সংকট কাটছে না দুই মাসেও। গত ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত রপ্তানি বন্ধের পর থেকে এখনও অস্থির আছে পেঁয়াজের বাজার। পাইকারি বাজারে ১৫০ থেকে ১৭০ টাকায় পেঁয়াজ বেচাকেনা হলেও খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২৩০ টাকা।

ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের পর তুরস্ক, মিসর, চীন, উজবেকিস্তানসহ বিকল্প দেশগুলো থেকে পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ নেয় এস আলম গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, বিএসএম গ্রুপসহ বেশক’টি বড় প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে এস আলম গ্রুপ তাদের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান সোনালী ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে এককভাবে সর্বোচ্চ ৬৪ হাজার টন পেঁয়াজ আনার এলসি খোলে। কিন্তু তাদের পেঁয়াজ সমুদ্রপথে এখনও পৌঁছেনি চট্টগ্রাম বন্দরে। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তাদের পেঁয়াজ বন্দরে পৌঁছবে বলে জানা গেছে।

এস আলম কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রথম চালানে মিসর থেকে দুই হাজার টন এবং তুরস্ক থেকে খোলা জাহাজে ১০ হাজার টন পেঁয়াজ আসবে তাদের। তবে বিমানপথে এখন পর্যন্ত তারা ৩৭২ টন পেঁয়াজ আমদানি করে টিসিবিকে দিয়েছে।

এলসির পণ্য যথাসময়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছে সিটি গ্রুপ ও মেঘনা গ্রুপও। তবে বিএসএম গ্রুপ সবার পরে এলসি খুললেও তাদের পেঁয়াজ এরই মধ্যে পৌঁছে গেছে দেশের বাজারে। বিএসএম গ্রুপ তিন জাহাজে ৩৯টি কনটেইনারে করে এক হাজার ১০০ টন পেঁয়াজ আমদানি করেছে। এর মধ্যে ৫৮০ টন বন্দরে খালাস হয়ে চলে এসেছে বাজারেও। আর মেঘনা গ্রুপের পেঁয়াজ এসেছে সাড়ে ৮০০ টন। মঙ্গলবার রাতে ‘ওইএল স্ট্রেট’ জাহাজের ৩০টি কনটেইনারে পেঁয়াজের প্রথম চালান আনে মেঘনা গ্রুপ। এর আগে মেঘনা গ্রুপ ২০ টন পেঁয়াজ বিমানপথে এনে তা বিক্রি করতে দিয়েছে টিসিবিকে। সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর ও বিমানপথে এখন পর্যন্ত বড় শিল্পপতিদের মাত্র আট হাজার ৮১৭ টন পেঁয়াজ এসেছে।

পেঁয়াজ আমদানি প্রসঙ্গে এস আলম গ্রুপের বাণিজ্যিক বিভাগের প্রধান মহাব্যবস্থাপক আখতার হাসান বলেন, পেঁয়াজের সংকট কাটাতে মিসর থেকে ৫০ হাজার টনের বড় চালান আমদানির এলসি খুলেছেন তারা। এই বড় চালানটি আসার পর দেশে পেঁয়াজের সংকট থাকবে না। দামও কমে আসবে। সাধারণ মানুষ যাতে সহনীয় দামে পেঁয়াজ কিনতে পারে, সে জন্য এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অবশ্য গত ২৯ অক্টোবর পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পেঁয়াজের এই বড় চালানটি এক সপ্তাহের মধ্যে আসবে বলে জানিয়েছিলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান মহাব্যবস্থাপক। তবে গতকাল ২৮ দিন পেরিয়ে গেলেও চালানটি এখনও পৌঁছেনি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি প্রতিষ্ঠানটির কেউই।

একই প্রসঙ্গে সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, ‘কয়েক হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির এলসি খোলা হলেও এখন পর্যন্ত বিমানপথে ৩০ টন পেঁয়াজ এসেছে আমাদের। আগামী ৪ ডিসেম্বর সমুদ্রপথে আড়াই হাজার টন পেঁয়াজ আসার কথা রয়েছে।’ কত হাজার টনের অনুমতিপত্র নিয়ে কত হাজার টনের এলসি খোলা হয়েছে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আগে আড়াই হাজার টন আসুক। এরপর এটি জানাব। সমুদ্রপথে দূরত্ব বেশি হওয়ায় পেঁয়াজ আনতে আমাদের দেরি হচ্ছে।’

চট্টগ্রাম বন্দরে দ্রুততম সময়ে পেঁয়াজ আনা বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী বলেন, ‘পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীল করতে সরকারের অনুরোধে সাড়া দিয়েছি। এ পণ্যের ব্যবসায়ী না হয়েও দ্রুততম সময়ে কিছু পেঁয়াজ এনেছি। আমরা প্রথম দফায় চীন থেকে ৮০০ টন পেঁয়াজ আমদানির ঋণপত্র খুলেছি। এর মধ্যে ৫৮০ টন গত সোমবার পৌঁছেছে। বাকি পেঁয়াজ পৌঁছাবে ৩০ নভেম্বর (আগামীকাল)। মিসর থেকে আরও পেঁয়াজের চালান জাহাজে তোলা হচ্ছে, শিগগির সেগুলোও চট্টগ্রামে পৌঁছাবে।’

অন্য ব্যবসায়ীদের পেঁয়াজ কেন এখনও দেশে আসছে না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অন্যদের বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। তবে আমি আন্তরিকভাবে চেয়েছি দেশের এই সংকটে কিছুটা ভূমিকা রাখতে।’ অনুমতিপত্র নেওয়ার পরও অনেকে এলসি খোলেননি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে ক্যাবের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বড় শিল্পপতিদের পেঁয়াজ যথাসময়ে এলে কিছুটা হলেও স্থির করত বাজার। কিন্তু অনুমতিপত্র নেওয়ার পরও কেন এলসি খোলা হয়নি, আর এলসি খোলা হলেও কেন এক মাসেও সেই পণ্য দেশে আসেনি- তা খতিয়ে দেখা উচিত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের। তিনি বলেন, যাদের এলসি খোলার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তারা সবাই বড় ব্যবসায়ী। পেঁয়াজের ব্যবসা না করলেও ভোগ্যপণ্যের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত আছে সবাই। এ ব্যাপারে তারা যথেষ্ট অভিজ্ঞও। এ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দ্রুততম সময়ে পেঁয়াজ আনার সুযোগ ছিল তাদের।

এদিকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, এলসির পণ্য আসতে আরও দেরি হলে পেঁয়াজের বাজারে তা আর প্রভাব ফেলবে না। কারণ, ১৫ দিন পর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দেশি পেঁয়াজ উঠতে শুরু করবে। তখন বেশি দামে কেনা এ পেঁয়াজ বাজারে এলে তা কাজে দেবে না। খাতুনগঞ্জের হামিদুল্লাহ মিয়া মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস বলেন, ‘বড় ব্যবসায়ীদের পেঁয়াজ খুব দরকার ছিল এ মাসেই। কিন্তু মাস শেষ হয়ে গেলেও সেই পেঁয়াজের মুখ আর দেখল না ভোক্তারা। শেষদিকে কিছু বড় ব্যবসায়ীর পেঁয়াজ এলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারে নগণ্য। দেশি পেঁয়াজ ওঠার আগে এলসির পেঁয়াজ না এলে বাজার আরও অস্থির থাকবে অন্তত ১৫ দিন।’

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে