পুরোনো ফ্ল্যাটের বেচাকেনা বাড়ছে

0
501
অনেকেই আজকাল পুরোনো ফ্ল্যাট কেনেন। গতকাল রাজধানীর সেগুনবাগিচায়।

দৈনিক পত্রিকা খুললেই অন্য অনেক পণ্যের বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি ব্যবহৃত বা পুরোনো ফ্ল্যাট বিক্রির বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে। সাধারণত সেই বিজ্ঞাপন দেখেই ক্রেতারা চাহিদা অনুযায়ী ফ্ল্যাট খুঁজে নেন। তবে সময় বদলেছে। গত চার-পাঁচ বছরে পুরোনো ফ্ল্যাট বিক্রির মধ্যস্থতায় যুক্ত হয়েছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। একধরনের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেওয়ায় পুরোনো ফ্ল্যাট কেনাবেচা কিছুটা সহজ হয়েছে।

অবশ্য শুধু ফ্ল্যাট নয়, পুরোনো বাণিজ্যিক স্পেস বা জায়গা ক্রয়-বিক্রয় ও ফ্ল্যাট ভাড়ার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা আবার অন্য আবাসন প্রতিষ্ঠানের নতুন ফ্ল্যাটও বিক্রি করছে। নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশনের ভিত্তিতে কাজগুলো করে থাকে এসব প্রতিষ্ঠান। চট্টগ্রামে অল্পবিস্তর হলেও ব্যবসাটির বড় অংশ এখনো রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক।

পুরোনো ফ্ল্যাটের ব্যবসার পরিধি প্রতিবছরই বাড়ছে বলে জানালেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁরা বলছেন, আকাশছোঁয়া দামের কারণে নতুন কেনার সামর্থ্য না থাকায় নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের মধ্যে পুরোনো ফ্ল্যাট কেনার চাহিদা বেশি। তবে ফ্ল্যাটের নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) ব্যয় কমানোর পাশাপাশি নামজারিসহ বিভিন্ন দলিল হালনাগাদ ও ব্যাংকঋণ-প্রক্রিয়া সহজ করা হলে পুরোনো ফ্ল্যাট বিক্রি কয়েক গুণ বাড়বে বলে মনে করেন তাঁরা।

দেশের আবাসন খাতের প্রথম সারির একটি প্রতিষ্ঠান বিল্ডিং টেকনোলজি অ্যান্ড আইডিয়াস লিমিটেড (বিটিআই)। ২০১৫ সালের শেষ দিকে পুরোনো ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক স্পেস কেনাবেচা ও ভাড়ার ব্যবসা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। এ জন্য বিটিআই ব্রোকারেজ নামে একটি স্বতন্ত্র বিভাগ রয়েছে তাদের। বৈধ কাগজপত্র থাকলে যে কেউ পুরোনো ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক ভবন বিক্রির জন্য প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি করতে পারেন।

সেটি বিক্রির জন্য প্রচার-প্রচারণার পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়াটি দেখভাল করে তারা। ব্যক্তিসম্পত্তি ছাড়া যেকোনো আবাসন প্রতিষ্ঠান তাদের নতুন বা পুরোনো, এমনকি নির্মাণাধীন ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক স্পেস বিটিআই ব্রোকারেজের মাধ্যমে বিক্রি করতে পারে। উভয় ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট কমিশন নেয় প্রতিষ্ঠানটি। আবার পুরোনো ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক স্পেস নিজেরা কিনেও বিক্রি করে থাকে তারা।

বিটিআই ব্রোকারেজের নির্বাহী পরিচালক আয়েশা সিদ্দীকা বলেন, পুরোনো ফ্ল্যাটের ব্যবসা বাড়ছে। তবে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পত্তি কেনাবেচার বিষয়টি এখন পর্যন্ত নতুন ধারণা। অবশ্য প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় কোনো রকম হয়রানি ছাড়াই সম্পত্তি হাতবদল করতে পারেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। তিনি বলেন, ‘আমরা সব কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে সম্পত্তি বেচাকেনার মধ্যস্থতা করে থাকি। সে জন্য কোনো পক্ষই প্রতারিত হয় না।’

আয়েশা সিদ্দীকা আরও বলেন, পুরোনো ফ্ল্যাট বেচাকেনার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা অত্যধিক নিবন্ধন ব্যয়। তা ছাড়া সম্পত্তি বিক্রির অনুমতি, নামজারি, বণ্টননামা ইত্যাদি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রচুর সময় ব্যয় হয়। ব্যাংকঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়াটিও সহজ না। এসব সমস্যা সমাধান করা গেলে পুরোনো ফ্ল্যাট বিক্রিতে গতি আসবে। নিম্নমধ্যবিত্তরা উপকৃত হবেন।

পুরোনো ফ্ল্যাট কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, রাজধানীর উত্তরা, বসুন্ধরা, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও মিরপুর এলাকায় পুরোনো ফ্ল্যাটের চাহিদা বেশি। পুরোনো ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে নতুনের চেয়ে সাধারণত প্রতি বর্গফুটে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা কম হয়।

আবাসন খাতের আরেক প্রতিষ্ঠান অ্যাসেট ডেভেলপমেন্টস দুই বছর ধরে পুরোনো ফ্ল্যাট বিক্রি করে। অবশ্য বর্তমানে নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশনের ভিত্তিতে তারা শুধু তাদের নিজস্ব আবাসন প্রকল্পের পুরোনো ফ্ল্যাট বিক্রিতে মধ্যস্থতা করে থাকে। ক্রেতাদের আর্থিক সংকট থাকলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণের ব্যবস্থা এবং কয়েক মাসের কিস্তিসুবিধা দেয় প্রতিষ্ঠানটি।

জানতে চাইলে অ্যাসেট ডেভেলপমেন্টসের উপব্যবস্থাপক (মার্কেটিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন) আরাফাত হাসান বলেন, ‘পুরোনো ফ্ল্যাটের ব্যবসার ভবিষ্যৎ ভালো। আমরা এখন পর্যন্ত স্বল্প পরিসরে এই ব্যবসা করছি। তারপরও প্রতি মাসে পাঁচ-সাতটি পুরোনো ফ্ল্যাট বিক্রি হয়।’ তিনি বলেন, মূলত নিম্নমধ্যবিত্তরাই পুরোনো ফ্ল্যাটের ক্রেতা। কেনার পর অল্প কিছু টাকা খরচ করলেই তা নতুনের মতো হয়ে যায়। তখন নতুন ও পুরোনো ফ্ল্যাটের মধ্যে তেমন তফাত থাকে না।

নতুনের পাশাপাশি পুরোনো ফ্ল্যাট বিক্রি করে বিপ্রাপর্টি ডটকম। ২০১৬ সালে ইমার্জিং মার্কেটস প্রপার্টি গ্রুপের (ইএমপিজি) এই অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে ভাড়া ও বিক্রির জন্য বর্তমানে ২৫ হাজারের বেশি ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক স্পেস আছে। ৩ থেকে ৫ শতাংশ কমিশন নিয়ে পুরোনো ফ্ল্যাট বিক্রির মধ্যস্থতা করে তারা।

ফ্ল্যাট বিক্রি করতে চাইলে প্রথমে বিপ্রাপর্টি ওয়েবসাইটে নির্দিষ্ট ফরম পূরণ করতে হবে। তারপর প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা সরেজমিনে তা যাচাই-বাছাই করে দেখেন। তারপরই তা ওয়েবসাইটে বিক্রির জন্য প্রকাশ করা হয়। এসব তথ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং ম্যানেজার মাহজাবীন চৌধুরী গত বৃহস্পতিবার বলেন, পুরোনো ফ্ল্যাটের বিক্রি বছর বছর বাড়ছে। ঢাকার মধ্যে মোহাম্মদপুর ও উত্তরায় পুরোনো ফ্ল্যাটের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।

জানতে চাইলে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন বলেন, পুরোনো ফ্ল্যাট বিক্রি বা ফ্ল্যাটের সেকেন্ডারি বাজার খুবই সম্ভাবনাময়। প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ফ্ল্যাট কেনাবেচা করলে প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। তিনি বলেন, নামমাত্র মূল্যে পুরোনো ফ্ল্যাট নিবন্ধন হলে তা কিছুটা হলেও নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যে আসবে। বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বিশেষ বিবেচনায় নেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে