পাসের কী দরকার!

0
251

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ‘কালচারাল অফিসার’ পদে আবেদন করেছিলেন রুনা লায়লা। লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পর খুব দম্ভের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘সাদা খাতা জমা দিয়ে এলাম, দেখি নিয়োগ ঠেকায় কে?’ সবাইকে অবাক করে ওই পদে নিয়োগও পান তিনি। অথচ এ পদের জন্য নির্ধারিত অভিজ্ঞতাই ছিল না তার।

আরেকজন হামিদুর রহমান রাসেল। একাডেমির এক কালচারাল অফিসারের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে চ্যালেঞ্জ করে বলেছিলেন, ‘কালচারাল অফিসার হয়েই এখানে ঢুকব, হিসাবটা মিলিয়ে নিয়েন।’ যেমন কথা, তেমন কাজ। তিনিও শেষ পর্যন্ত নাম লেখান কাঙ্ক্ষিত পদে।

একাডেমির কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর মুখ থেকে এমন বিস্ময়কর তথ্য শুনে অনুসন্ধানে নামে । কয়েকদিনের অনুসন্ধানে জানা যায় আরও অনেকের নাম, যাদের নিয়োগ ঠেকাতে পারেননি কেউ! এখানে বিভিন্ন পদে পরীক্ষা ঠিকই হয়; কিন্তু দিনের শেষে নিয়োগ পান পূর্বনির্ধারিত প্রার্থী। এসব অসম্ভবকে সম্ভব করার নেপথ্যে রয়েছেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী।

সর্বশেষ একটি নিয়োগ পরীক্ষার জালিয়াতির ঘটনা অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, তিনটি সার্কুলারের মাধ্যমে ৪৬ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে- যারা কেউ পরীক্ষায় পাসই করেননি। ২০১৭ সালের আগস্টে অনুষ্ঠিত ওই পরীক্ষার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট একাধিক ব্যক্তি নিশ্চিত করে বলেন, লিখিত পরীক্ষায় পাস না করেও মৌখিক পরীক্ষায় ডাক পেয়েছেন অনেকে- সবাইকে অবাক করে মৌখিক পরীক্ষায় উতরে নিয়োগও পেয়েছেন। ঝামেলা এড়াতে গোপন রাখা হয়েছে পরীক্ষার ফল।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মহাপরিচালকের ‘সৌজন্যে’ শিল্পকলা একাডেমি এখন বিএনপি-জামায়াতের প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করেছে। যোগ দেওয়ার পর প্রায় ৯ বছরে তিনি অন্তত ১০০ জনকে ঘুষ ও জালিয়াতির মাধ্যমে সুযোগ করে দিয়েছেন নানা পদে। নিয়োগ পাওয়া কেউ কেউ বিএনপি ঘরানার রাজনীতিতেও সম্পৃক্ত।

২০১৭ সালের আগস্টে তিনটি সার্কুলার জারি করে শিল্পকলা একাডেমি। এর অধীনে নৃত্যশিল্পী ১২ জন, কণ্ঠশিল্পী আটজন, কালচারাল অফিসার ছয়জন, যন্ত্রশিল্পী ১০ জন, ইনস্ট্রাক্টর (নৃত্য) তিনজন, ক্যামেরাম্যান দু’জন, ইনস্ট্র্রাক্টর (চারুকলা), সহকারী পরিচালক (গবেষণা), সহকারী পরিচালক (বাজেট), মঞ্চ ব্যবস্থাপক এবং ইনস্ট্রাক্টর (সংগীত ও যন্ত্র) পদে একজন করে নিয়োগ দেওয়া হয়।

ওই বছরের আগস্টে অনুষ্ঠিত হয় লিখিত পরীক্ষা। একটি পদের বিপরীতে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন ২৪ জন। ওই পদের লিখিত পরীক্ষার ফলাফলের একটি অনুলিপিতে দেখা যায়, লিখিত পরীক্ষায় পাস করেছেন মাত্র চারজন। কিন্তু বিস্ময়কর ঘটনা হলো, কর্তৃপক্ষ মৌখিক পরীক্ষায় ডাকে সবাইকে। লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ও উত্তীর্ণদের তালিকা পাশাপাশি রেখে দেখা যায়, লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন প্রদীপ কুমার সরকার, এবিএম তৈমুর হান্নান, আবুল কালাম আজাদ ও উত্তম কুমার রায়। তাদের একজনও ওই পদে নিয়োগ পাননি।

একাডেমি সূত্র জানায়, ওই সার্কুলারে যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়, তাদের অধিকাংশই লিখিত পরীক্ষায় পাস করেননি। আবার অনেকে পাস করলেও মৌখিক পরীক্ষার চিঠি পাননি। অথচ নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে অকৃতকার্য প্রার্থীদেরও মৌখিক পরীক্ষায় ডাকা হয়েছে। এই কৌশলের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মহাপরিচালক আগে থেকেই ঠিক করে রাখেন, কোন পদে কাকে নিয়োগ দেওয়া হবে। লিখিত পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত প্রার্থী পাস করতে না পারলে মৌখিক পরীক্ষায় ডাকা হয় সবাইকে।

তিনটি বিভাগের পরীক্ষায় সরাসরি যুক্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক নিশ্চিত করেন, অংশগ্রহণকারীদের অর্ধেকের বেশি লিখিত পরীক্ষায় পাস করেননি। তবু তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি, ওই সব পরীক্ষায় অল্প যে কয়েকজন পাস করেছিলেন, তাদের একজনও নিয়োগ পাননি।’

বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি জানান, যে পরীক্ষা হয়েছিল, তার ফলই প্রকাশ করা হয়নি। পরীক্ষা ছিল লোকদেখানো। যথেষ্ট কারচুপি হয়েছিল এতে। তিনি বলেন, ‘প্রতিবাদ করতে পারিনি। কারণ সেই পরিবেশ ছিল না। তবে তখন থেকেই এ নিয়ে নিজের মধ্যে অপরাধবোধ ছিল।’

সেই পরীক্ষার নিয়ন্ত্রক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের তৎকালীন ডিন অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। তিনি বর্তমানে সিলেট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

লিখিত পরীক্ষার ফলাফল প্রসঙ্গে জানতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলে অনুষদের বর্তমান ডিন সাদেকা হালিম কোনো নথিপত্র নেই বলে দাবি করেন। তিনি উল্টো প্রশ্ন করে বলেন, ‘এত আগের নথি খুঁজছেন, কারণ কী!’

বিভাগের কম্পিউটার অপারেটর মনির জানান, নিয়োগ পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ নথি তাদের সংরক্ষণে নেই। তাদের কাছে এগুলো সরবরাহ করা হয় না।

এদিকে, শিল্পকলার কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একাডেমিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়মকানুনের বালাই নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উপরির জোরে নিয়োগ পেয়ে যান বিএনপি-জামায়াত ঘরানার প্রার্থী। ঘুষ দিতে না পারায় যোগ্যতা সত্ত্বেও বঞ্চিত হন অনেকে। এমনকি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যেরও সুযোগ মেলেনি। নিয়োগ-বাণিজ্যে সরাসরি মহাপরিচালক যুক্ত বলে একাধিক সূত্র জানায়।

জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া সেই ৪৬ জনের আটজনই লিয়াকত আলী পরিচালিত লোকনাট্য দলের সদস্য। তাদের মধ্যে একই পরিবারের দুই ভাইবোনও রয়েছেন। সেই আটজন হলেন- কণ্ঠশিল্পী রোকসানা আক্তার রুপসা, আবদুল্লাহেল রাফি, সোহানুর রহমান, সুচিত্রা রানী সূত্রধর, গাইড লেকচারার মাহবুবুর রহমান সুজন, ক্যামেরাম্যান (সিনেমাটোগ্রাফি) নুরুল আমিন, নৃত্যশিল্পী রুহি আফসানা দীপ্তি এবং ক্যামেরাম্যান রুবেল মিয়া। রুবেল কণ্ঠশিল্পী রুপসার আপন ভাই।

একাডেমির একাধিক কর্মকর্তা ক্ষুব্ধ হয়ে সমকালকে বলেন, লোকনাট্য দলের মতো কয়েকশ’ দল রয়েছে দেশে। একটি দল থেকে কীভাবে আটজন নিয়োগ পায়? লিয়াকত আলী নিজের সিন্ডিকেটের পাল্লা ভারী করতেই যোগ্যতা না থাকার পরও বেছে বেছে নিজের লোকদের নিয়োগ দিয়েছেন। এ ছাড়া অনেকের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

নিয়োগ পেতে মোটা অঙ্কের ঘুষ :শিল্পকলা একাডেমির একজন কালচারাল অফিসারের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে নিজেও ওই পদে আসীন হওয়ার চ্যালেঞ্জ ছুড়েছিলেন হামিদুর রহমান রাসেল। তিনি এ চ্যালেঞ্জে ‘জিতে’ও যান। তবে এই নিয়োগে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

একাডেমির একটি বিভাগের সহকারী পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘রাসেল ২২ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে এই পদে নিয়োগ পান।’ বর্তমানে রাসেল চুয়াডাঙ্গা জেলা কালচারাল অফিসার।

ওই নিয়োগের আগে শিল্পকলা একাডেমিতে চতুর্থ শ্রেণির পদমর্যাদায় সাউন্ড অপারেটর (আউটসোর্সিং) হিসেবে কাজ করতেন রাসেল। উপপরিচালক (অর্থ) শহীদুল ইসলামের মাধ্যমে ঘুষের অর্থ লেনদেন হয় বলেও জানা গেছে। তবে এ প্রসঙ্গে শহীদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

সবকিছুই ‘নিজের’ কবজায় :শিল্পকলা একাডেমির পাঁচটি বিভাগ রয়েছে- চারুকলা; সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তি; গবেষণা; প্রশিক্ষণ এবং নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র। সব বিভাগের অধীনেই বছরজুড়ে কোনো না কোনো উৎসব-অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সংশ্নিষ্ট বিভাগের পরিচালকরা থাকেন অন্ধকারে। অনুষ্ঠানগুলো সরাসরি মহাপরিচালকের দপ্তর থেকে নতুবা ওই বিভাগের নিম্নস্তরের কোনো কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়।

চারুকলা বিভাগের শিল্পকর্ম প্রদর্শনী এবং কর্মশালা আয়োজনে মূল দায়িত্ব পালন করার কথা ওই বিভাগের। কিন্তু সেটিও মহাপরিচালকের কবজায়। গত সেপ্টেম্বরে মাসব্যাপী দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীর আয়োজন করে শিল্পকলা একাডেমি। অথচ ওই অনুষ্ঠান সম্পর্কে অন্ধকারে ছিলেন চারুকলা বিভাগের পরিচালক আশরাফুল আলম পপলু।

একইভাবে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান, বিজয় ফুল অনুষ্ঠান, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক উৎসব আয়োজনের কথা সংগীত বিভাগের। কিন্তু এই বিভাগের পরিচালক সোহরাব উদ্দীন এসব অনুষ্ঠানের কোনো দায়িত্বেই ছিলেন না।

এক কর্মকর্তা জানান, পাঁচটি বিভাগের একজন পরিচালককেও নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া হয় না। সংশ্নিষ্ট বিভাগের পরিচালককে এড়িয়ে অন্য নিম্নস্তরের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজ বাস্তবায়ন করেন মহাপরিচালক। এখানেও প্রাধান্য দেওয়া হয় বিএনপি-জামায়াত সিন্ডিকেটের লোকজনকে।

প্রায় প্রতিদিনই রাত ২টা অবধি পছন্দের পাঁচ-ছয়জন কালচারাল অফিসারকে নিয়ে মিটিং করেন লিয়াকত আলী লাকী। ওই বৈঠকে মূলত তারা নিজেদের মধ্যে কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করেন। বিভাগীয় পরিচালকদের বিভিন্ন কার্যক্রমের বাইরে রাখতেই তিনি অধস্তন কর্মকর্তাদের নিয়ে সিন্ডিকেট করেছেন।

অন্যদিকে, টাকা খরচের বিধান না থাকলেও একের পর এক অনুষ্ঠান আয়োজন এবং অর্থ খরচ করে যাচ্ছে অর্থ বিভাগ। সংশ্নিষ্ট বিভাগের ঊর্ধ্বতনদের এড়িয়ে মহাপরিচালকের নির্দেশে নিয়মবহির্ভূতভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে অর্থ বিভাগ। একাডেমির নানা পর্যায়ে অন্তত ৪০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন, যাদের তেমন কোনো কাজই নেই। সিন্ডিকেট শক্তিশালী রাখতেই তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

কিছু না লিখেও পাস! :পরীক্ষায় সাদা খাতা জমা দিয়ে দম্ভ প্রকাশ করা রুনা লায়লার বাড়ি বাগেরহাটের মোল্লাহাটে। তার স্বামী এস এম আলীউজ্জামান ওই উপজেলায় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি। আলীউজ্জামান পরে থানা স্বেচ্ছাসেবক দলেরও প্রার্থী হয়েছিলেন। বাগেরহাটের একাধিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

নিয়ম অনুযায়ী, কালচারাল অফিসার পদে নিয়োগ পেতে অনার্স পাসের ক্ষেত্রে নূ্যনতম ১০ বছর এবং মাস্টার্স পাসের ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের একাডেমিক অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক। রুনা লায়লার এমন কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না।

বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার হিসেবে কর্মরত রুনা লায়লা এ প্রসঙ্গে বলেন, তার স্বামী কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তার নিয়োগে কোনো রাজনৈতিক ইস্যু ছিল না বলেও দাবি করেন।

সহকারী পরিচালক (বাজেট) পদে নিয়োগ পাওয়া সামিরা আহমেদের বাবা জাহিদ উদ্দিন আহমেদ খুলনায় বিএনপি সমর্থিত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন বলে জানা গেছে।

নিয়োগ ও পরীক্ষায় অনিয়মের বিষয়ে জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী ফোন ধরেননি। নিয়োগে জালিয়াতির বিষয় উল্লেখ করে এসএমএস দেওয়া হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে