পার্বত্য অঞ্চলে শুরু হলো কঠিন চীবরদান উৎসব

0
665
পানছড়ি শান্তিপুর অরণ্য কুঠিরে কঠিন চীবর দান উৎসবের ছবি।

সারাদেশে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব আজ শুরু হলো দানোৎত্তম কঠিন চীবর দান। গতকাল রবিবার ১৩ অক্টোবর তিন মাস বর্ষাবাস যাপনের পর আশ্বিনী পূর্ণিমা তিথিতে হয়ে গেল প্রবারণা উৎসব।

সে দিন বিকেল হতে তুলা থেকে সুতা কেটে, সুতায় রং করে কাপড় বুনে সেই কাপড়ে চীবর সেলাই করে পরবর্তী দিন অর্থাৎ ২৪ ঘন্টার মধ্যে দান কার্য সম্পাদন করে ভিক্ষুসংঘকে প্রদান করতে হয়।সে কারণে এই দান কঠিন চীবরদান বলা হয়। বুদ্ধের আ্মলে বিশাখা এ দানের প্রবর্তন করেন।

গতকাল রাঙ্গামাটির রাজবন বিহারে প্রবারণা উৎসব পালনের ছবি।

প্রবারণা উৎসবে দায়ক দায়িকা পরস্পর থেকে ভিক্ষুসংঘের উপস্থিতিতে দাঁড়িয়ে জানা অজানা দোষ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হয়। বসে থাকা দায়ক দায়িকারা ডান হাত উপরে তুলে সাধু সাধু সাধু বলে ক্ষমা করে দিতে হয়। এভাবে অপর পক্ষকেও দাঁড়িয়ে ভিক্ষু সংঘের উপস্থিতিতে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হয়। এ্কইভাবে বসে থাকা দায়ক দায়িকারা ডান হাত উপরে তুলে আর্শিবাদের সহিত সাধু সাধু সাধু বলে ক্ষমা প্রদান করতে হয়।

ক্ষমা প্রার্থনার ছবি।
ক্ষমা প্রার্থনার ছবি।

অপর দিকে ভিক্ষুসংঘরাও বুদ্ধের সম্মুখে নিজের জানা অজানা দোষ স্বীকার করে পরস্পরের কাছ থেকে ক্ষমা প্রর্থনা করতে হয়।সাধু সাধু সাধু বলে অন্যভিক্ষু অনুমোদনের সহিত ক্ষমা দেন। এটি পার্বত্য অঞ্চলে শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবির বনভান্তে ১৯৮১সাল হতে প্রবর্তন করেন।

আর্শিবাদ প্রদানের ছবি।

এ উপলক্ষে রাজবন বিহারে সংঘদান অষ্টপরিস্কার দান , হাজার বাতিদান, বিশ্বশান্তি প্যাগোডার উদ্দেশ্যে টাকাদান, বুদ্ধমুর্তিদানসহ নানাবিদ উপকরণ দানীয় সমাগ্রী ভিক্ষু সংঘের উদ্দেশ্যে দান করা হয়।

বক্তব্য রাখছেন গৌতম দেওয়ান।

অনুষ্ঠানে উপাসক উপাসিকা পরিষদের সভাপতি গৌতম দেওয়ান, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বৃষকেতু চাকমা বক্তব্য প্রদান করেন। আরো উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন উপমন্ত্রী মনিস্বপন দেওয়া, উপাসিকা পরিষদের সদস্য নিরুপা দেওয়ান ও বনবিহারের স্থায়ী উপাসিকা সমীরা দেওয়া্নসহ হাজারো পূণ্যার্থীবৃন্দ।

বক্তব্য রাখছেন বৃষকেতু চাকমা।

ভিক্ষুসংঘের মধ্য হতে দেশনা প্রদান করেন শ্রীমৎ জ্ঞানপ্রিয় মহাস্থবির ও রাজবন বিহার অধ্যক্ষ শ্রীমৎ প্রজ্ঞালংকার মহাস্থবির।

আজ বোধিপুর অরণ্য কুঠিরে দানোত্তম কঠিন চীবর দানানুষ্ঠান উদযাপন করা হয়। গতকাল রাতে বেইন বুনে সেই কাপড় সেলাই করে আজ বিকালে বিহারে অধ্যক্ষ শ্রীমৎ জিনবোধি মহাস্থবির ভান্তের নিকট দান কার্য সম্পাদন পূর্বক তাঁর হাতে অর্পন করা হয়।

বোধিপুর অরণ্য কুঠিরের বিহার অধ্যক্ষ জিনবোধি ভা্ন্তেকে কঠিন চীবর প্রদান করেন।

অনুষ্ঠানে সাপছড়ি ইউপি চেয়ারম্যান মৃণাল কান্তি চাকমা, রাঙ্গামাটি সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান দুর্গেশ্বর চাকমা ও রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বৃষকেতু চাকমা বক্তব্য রাখেন।

বৃষকেতু চাকমা বলেন, বুদ্ধের পঞ্চশীল পালনের মাধ্যমে জগতের শান্তি বিরাজ করবে। তিনি নিজেও পঞ্চশীল পালন করেন অপরকেও পালন করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

অনুষ্ঠানে শ্রীমৎ কন্ঠক মহাস্থবির ভান্তে ও শ্রীমৎ প্রজ্ঞালংকার মহাস্থবির ভান্তে ধর্মদেশনা প্রদান করেন। কন্ঠক ভান্ত বলেন, মৈত্রী ভাবনা করলে মৃত্যর পর স্বর্গে গমন করে আর দান করলে ত্যাগ উৎপন্ন হয়। জগতে কোন কিছুই সঙ্গে যাবেন না, একমাত্র দান, কর্মফলই পরপারের সাথী হবে।

প্রজ্ঞালংকার ভান্তে দেশনা প্রদান করেন।

প্রজ্ঞালংকার ভান্তে বলেন, বনভান্তের মুখ সৃতবাণী সবই সত্যি হয়। তিনি বিশ্বশান্তি প্যাগোডা নির্মাণের কথা বলতেন। এই প্যাগোডা নির্মাণ করতে পারলে বাংলাদেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায় আর্ন্তজাতিক পরিমন্ডলে প্রবেশ করবে এবং জনগণের নিকট সুখ ফিরে আসবে। সে কারণে সবাইকে প্যাগোডার উদ্দেশ্যে দান করতে আহবান জানান।

অনুষ্ঠানের মধ্যে ছিল রাতে বেইন বুনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, জুম কালচারাল একাডেমীর উদ্যোগে চাকমা ভাষায় বুদ্ধ কীর্তন পরিবেশন। সকালে সকালে সংঘদান অষ্টপরিস্কারদান বুদ্ধমুর্তিদান ও নানাবিদ উপকরণদান অনুষ্ঠান। পূর্ণসংকর চাকমার ধর্মীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা করা হয়।

চাকমা কালচারাল একাডেমীর পরিবেশনায় চাকমা ভাষায় বুদ্ধকীর্তন।

বিকালে কঠিন চীবরদান বুদ্ধমুর্তিদান হাজার বাতিদান ফানুবাতিদান কল্পতরুদান ও ভোজনশালাদানসহ না্নাবিদ দান সমগ্রী প্রদান করা হয়। লক্ষ্মীদেবী চাকমার ধর্মীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু করা হয়। অনু্ষ্ঠানের সার্বিক সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করেন অনুময় চাকমা।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে