পদোন্নতি বঞ্চনার অবসান হচ্ছে শিক্ষা ক্যাডারে

প্রভাষক পদেই এক দশক পার, আজ বসছে ডিপিসি সভা

0
51
বাংলাদেশ সরকার

গোপালগঞ্জ সদরের শেখ হাসিনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের গণিত বিভাগের প্রভাষক আবদুল হক ১১ বছর ধরে একই পদে চাকরি করছেন। তিনি বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা।

২৮তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তারা বহু আগেই অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হয়েছেন। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারাও উপ-সচিব হবার অপেক্ষায়। অথচ শিক্ষা ক্যাডারের আবদুল হক এখনও এন্ট্রি পদেই রয়ে গেছেন। অন্যান্য ক্যাডারে দুটি, কোথাও একটি পদোন্নতি হলেও ২৮তম ব্যাচের শিক্ষা ক্যাডারের গণিত বিষয়ের শিক্ষকরা ১১ বছর ধরে প্রভাষক পদে থেকে গেছেন।

এ বঞ্চনার মূল কারণ অন্যান্য ক্যাডারে ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতি দেওয়া হলেও শিক্ষা ক্যাডারে বিষয়ভিত্তিক (সাবজেক্টওয়ারি) পদোন্নতি দেওয়া হয়। কোনো বিষয়ে ওপরের পদ শূন্য হলেই কেবল ওই বিষয়ের নিচের দিকের কর্মকর্তারা পদোন্নতি পান। বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেওয়া কর্মকর্তাদের বেশিরভাগ শিক্ষকতায় যুক্ত থাকলেও একাংশকে প্রেষণে সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও প্রকল্পে নিয়োগ দেওয়া হয়।

গত তিন বছর ধরে এই ক্যাডারে সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপক পদে কোনো পদোন্নতি হয়নি। ফলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) হিসাব মতে, এই দুই পদে এ মুহূর্তে পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তার সংখ্যা পাঁচ হাজার ৭১১ জন।

তবে শিক্ষা ক্যাডারের এই পদোন্নতি বঞ্চনার অবসান হচ্ছে। পদোন্নতিযোগ্যদের পদোন্নতি দিতে আজ রোববার এ ক্যাডারের ‘বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি’র (ডিপিসি) সভা ডাকা হয়েছে। বেলা ১১টায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মাহবুব হোসেনের সভাপতিত্বে এ সভা হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (কলেজ) ফজলুর রহমান, মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক এবং অর্থ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দু’জন যুগ্মসচিব সভায় অংশ নেবেন বলে জানা গেছে।

জানতে চাইলে মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক গোলাম ফারুক বলেন, পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রোববার সহযোগী ও সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দিতে সভা অনুষ্ঠিত হবে। অধ্যাপক পদে গত বছর পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, এক সভায় সম্ভব না হলে প্রয়োজনে ডিপিসির একাধিক সভা করা হবে।

জানা গেছে, সহযোগী অধ্যাপক পদে এবার বিসিএসের ২২, ২৩, ২৪, ২৫ ও ২৬তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের বিবেচনা করা হচ্ছে। ২২ থেকে ২৬তম ব্যাচ পর্যন্ত এই পদে পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তা তিন হাজার ৩০৩ জন।

আর সহকারী অধ্যাপক পদে বিসিএসের ২৯, ৩০, ৩১, ৩২ ও ৩৩তম ব্যাচের কর্মকর্তারা বিবেচনায় আছেন। তাদের মধ্যে পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তার সংখ্যা মোট দুই হাজার ৪০৮ জন। এ দুটি পদে সর্বশেষ ২০১৮ সালের অক্টোবরে পদোন্নতি দেওয়া হয়। জানা গেছে, বিসিএসের সর্ববৃহৎ ক্যাডার ‘শিক্ষা’। বর্তমানে এ ক্যাডারে কর্মরত সাড়ে ১৩ হাজারের বেশি। সরকারি প্রায় ৩০০ কলেজকে নতুন করে সরকারিকরণ করায় এই ক্যাডারে আরও সাড়ে ১২ হাজার পদ সৃষ্টির বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি।

২৯তম বিসিএসের শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা আদনান হোসেন বলেন, একসাথে যাদের সাথে বিসিএস চাকরিতে যোগ দিয়েছি অন্যান্য ক্যাডারে তারা আগেই পদোন্নতি পেয়েছেন। এখন আরেক দফা পদোন্নতির অপেক্ষায় আছেন। আমাদেরও চাকরির ১০ বছর পার করেছি। এখনও এন্ট্রি পদেই কাজ করতে হচ্ছে। এতে অনেক কর্মকর্তা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। ক্লাস পারফরম্যান্স থেকে শুরু করে সব কাজে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

শেখ হাসিনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের গণিত বিভাগের গণিতের প্রভাষক আবদুল হক আক্ষেপ করে বলেন, তাদের ২৮তম ব্যাচের সব সাবজেক্টে শিক্ষকদের পদোন্নতি হয়েছে। শুধু তাদের বিষয়েই কেউ পদোন্নতি পাননি।

স্বাধীনতা বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সংসদের যুগ্ম আহ্বায়ক বিপুল চন্দ্র সরকার বলেন, হাজার হাজার কর্মকর্তা আছে যারা পদোন্নতির সব যোগ্যতা অর্জন করে বসে আছেন, অথচ তাদের পদোন্নতি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পদোন্নতি যথাসময়ে না পেলে কর্তকর্তাদের কর্মস্পৃহা কমে যায়।

জানা গেছে, শিক্ষা ক্যাডারে সবচেয়ে বেশিদিন থাকতে হয় প্রভাষক পদে। বছরের পর বছর ধরে প্রভাষক থাকতে হয়। পদোন্নতি বঞ্চনা নিয়ে মানসিক যন্ত্রণায় কাটাতে হয়।

কোন ব্যাচ কতদিন ধরে প্রভাষক:শিক্ষা ক্যাডারে বিসিএসের ২৮তম ব্যাচ যোগ দেয় ২০১০ সালে। এই ব্যাচের গণিতের কর্মকর্তারা ১১ বছর ধরে প্রভাষকের পদে পড়ে আছেন। ২৯তম বিসিএসে ৬৫১ কর্মকর্তা যোগদান করেন ২০১১ সালের আগস্টে। এই ব্যাচের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কর্মকর্তা পদোন্নতি বঞ্চনা নিয়ে ১০ বছর ধরে প্রভাষক পদে আছেন।

৩০ বিসিএসের ৫৫২ কর্মকর্তা ২০১২ সালের জুনে শিক্ষা ক্যাডারে যোগদান করেন। এই ব্যাচের অর্ধেকেরও বেশি কর্মকর্তা গত ৯ বছর ধরে একই পদে আছেন। বিসিএসের ৩১তম ব্যাচের ৪৩৪ কর্মকর্তা ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন। তাদের মধ্যে ২০১৮ সালের সর্বশেষ পদোন্নতিতে ৬৩ কর্মকর্তার পদোন্নতি হয়। বাকি সবাই দীর্ঘ আট বছর একই পদে আছেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান-সন্ততি, নারী ও উপজাতিদের নিয়ে অনুষ্ঠিত ৩২তম বিসিএসের ৬৫১ সদস্য শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন ২০১৩ সালের অক্টোবরে। তারাও প্রায় আট বছর যাবত পদোন্নতি বঞ্চনা নিয়ে প্রভাষক পদে আছেন।

৩৩তম ব্যাচের ৯৮০ কর্মকর্তা শিক্ষা ক্যাডারে ২০১৪ সালের আগস্টে যোগদান করে সাত বছর পূর্ণ করেছেন একই পদে। ইতোমধ্যে ৩৪তম ব্যাচের ৭৭৪ কর্মকর্তাও পদোন্নতিযোগ্য হয়ে উঠেছেন। তবে এবারের পদোন্নতির বিবেচনায় নেই এই ব্যাচ।

সাব্বির নেওয়াজ

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে