পদোন্নতির বিলম্বে প্রশাসনে ক্ষোভ

0
334
বাংলাদেশ সরকার

যুগ্ম সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির কার্যক্রম শুরু হয়েছে গত এপ্রিলে। এ জন্য নিয়মিত ব্যাচ হিসেবে প্রশাসনের ১১তম ব্যাচ, পদোন্নতিবঞ্চিত (লেফটআউট) ও বিলুপ্ত ইকোনমিক ক্যাডারের প্রায় পাঁচশ’ কর্মকর্তার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে সরকার। পদোন্নতির জন্য গত এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত অন্তত ১৫ দফা বৈঠক করে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি)। এর পরও গত চার মাসে পদোন্নতির কাজ চূড়ান্ত না হওয়ায় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্নিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা যায়, গত বছরের ১৩ নভেম্বর বিলুপ্ত ইকোনমিক ক্যাডার প্রশাসনের সঙ্গে একীভূত হয়। এর পর অল্প সময়ের ব্যবধানে এসএসবির মাধ্যমে যুগ্মপ্রধান ও বিভাগীয় প্রধানরা অতিরিক্ত সচিব; উপপ্রধানরা যুগ্ম সচিব ও সিনিয়র সহকারী প্রধানদের উপসচিব হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার কথা। কিন্তু একীভূত হওয়ার ৯ মাস অতিবাহিত হলেও পদোন্নতির মাধ্যমে তাদের পদনাম পরিবর্তন হয়নি। এর মধ্যে গত ১৬ জুন প্রশাসন ক্যাডারের ১৩৭ জন কর্মকর্তা উপসচিব থেকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পেলেও উপপ্রধানদের পদোন্নতি হয়নি। এবার যুগ্মপ্রধান ও বিভাগীয় প্রধানদের অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি নিয়েও বিলম্ব হচ্ছে। তাদের কারণে প্রশাসনের নিয়মিত ১১তম ব্যাচ ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও আগে পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতিও ঝুলে রয়েছে। অতিরিক্ত সচিবের পদোন্নতি না হওয়ায় উপসচিবের পদোন্নতির জন্য সম্প্রতি যোগ্যতা অর্জন করা ২৭তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের কার্যক্রমও আটকে আছে। এসব কারণে প্রশাসনের প্রায় এক হাজার কর্মকর্তার মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বিলুপ্ত ইকোনমিক ক্যাডার, পদোন্নতিবঞ্চিত ও নিয়মিত ব্যাচের কর্মকর্তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে এবারের পদোন্নতিতে বিলম্ব হচ্ছে। এ ছাড়া শোকের মাস আগস্টে বড় কোনো আনন্দ উদযাপন করতে চায় না সরকার। এ জন্যও পদোন্নতি কার্যক্রমের চূড়ান্ত পর্যায়ে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এসএসবির এক সদস্য বলেন, এবারের পদোন্নতির কাজ ধাপে ধাপে সম্পন্ন করায় কিছুটা সময় বেশি লেগেছে। তিনি বলেন, শুরুতে শুধু প্রশাসনের নিয়মিত ও বঞ্চিত কর্মকর্তাদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। এর প্রায় তিন মাস পর এসএসবি বিলুপ্ত ইকোনমিক ক্যাডার কর্মকর্তাদের তথ্য সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তী সময়ে অতীতে পদোন্নতি না পাওয়া লেফটআউট কর্মকর্তাদের এক বিশাল বহরকেও মানবিক বিবেচনায় পদোন্নতির সুপারিশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাই বঞ্চিতদের মধ্যে যাদের শুধুই রাজনৈতিক সমস্যা আছে, তাদের পুনরায় তদন্তের উদ্যোগ নেয় সরকার। এসব কারণে অতিরিক্ত সচিব পদের পদোন্নতিতে এবার কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তবে চলতি মাসের মধ্যেই পদোন্নতির চূড়ান্ত তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে বলে জানান তিনি।

৮৪ ও ৮৫ ব্যাচের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, তাদের চাকরি আছে মাত্র ৬ মাস থেকে বড় জোর দেড় বছর। এর মধ্যে বেশিরভাগ কর্মকর্তা ডিসেম্বরের মধ্যে পিআরএলে চলে যাবেন। যারা পদোন্নতিবঞ্চিত হয়েছেন তাদের প্রায় প্রত্যেকে বর্তমান সরকারের আমলেই যুগ্ম সচিব হয়েছেন। আবার এই সরকারের আমলেই অবসরে চলে যাবেন। তাই এই বিদায়বেলায় তৃতীয় মেয়াদে থাকা আওয়ামী লীগ সরকার নিশ্চয় কিছু একটা করবে। এমন প্রত্যাশায় তারা জাতির পিতার কন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সানুগ্রহের জন্য অপেক্ষা করছেন। কিন্তু পদোন্নতির কাজ শেষ করতেই পাঁচ মাস অতিবাহিত হওয়ায় হতাশায় ভুগছেন তারা। বঞ্চিতরা বলছেন, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী আগে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি হওয়ার কথা। এর পর যুগ্ম সচিব, তারপর উপসচিব। এবার আগে যুগ্ম সচিবের পদোন্নতি হয়েছে। এতেও আমাদের কপাল পুড়েছে।

বিলুপ্ত বিসিএস ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বিলুপ্ত ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তারা নিজেদের পরিচয় সংকটে রয়েছেন। একীভূত হওয়ার ৯ মাস পরও পদোন্নতি ও পদনাম পরিবর্তন না হওয়ায় তারা হতাশায় ভুগছেন। সম্প্রতি প্রশাসন ক্যাডারের ১৭তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হলেও বিলুপ্ত ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। তারা স্বপদেই বহাল আছেন। এখন অতিরিক্ত সচিব পদেও বিলম্ব করছে। এতে ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তারা প্রশাসনের সঙ্গে একীভূত হওয়ার পরও পদোন্নতিতে পিছিয়ে পড়ছেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ (এপিডি) অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ্‌ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, পদোন্নতি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এর অংশ হিসেবেই পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ব্যাচের পদোন্নতি দেওয়া হয়। অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির কাজ চলছে। বিলুপ্ত ইকোনমিক ক্যাডার বিষয়ে তিনি বলেন, উপসচিব, যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিবের পদগুলো সরকারি পদ। এসব পদে পদোন্নতি বা পদায়ন পেতে হলে এসএসবির মাধ্যমে সুপারিশ পেয়ে আসতে হয়। ফলে যেসব কর্মকর্তা অতিরিক্ত সচিব হওয়ার যোগ্য; পদোন্নতির জন্য তাদের যাচাই-বাছাই চলছে।

সূত্র জানায়, অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দিতে প্রায় ৫০০ কর্মকর্তাকে বিবেচনায় নেওয়া হবে। এর মধ্যে নিয়মিত ব্যাচ ১১তম ব্যাচের ১২৬ কর্মকর্তা পদোন্নতির জন্য যোগ্য বিবেচিত হচ্ছেন। এসব কর্মকর্তার সঙ্গে আগের বিভিন্ন ব্যাচের বাদ পড়া প্রায় ৩০০ জন এবং বিলুপ্ত ইকোনমিক ক্যাডারের অর্ধশতাধিক কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত সচিব করা হবে। একই সঙ্গে উপসচিব পদে আরও প্রায় ৩০০ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন। গত জুন মাসে ২৭ ব্যাচের বেশিরভাগ কর্মকর্তা পদোন্নতির সেই যোগ্যতা অর্জন করেছেন। এই ব্যাচের যেসব কর্মকর্তা পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করেছেন, তারা চাইছেন শিগগির পদোন্নতি পেতে।

জনপ্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, ২৭ ব্যাচের কর্মকর্তাদের এখনও গোয়েন্দা প্রতিবেদন সংগ্রহ করা হয়নি। এ ব্যাচের কর্মকর্তারা চান গোয়েন্দা প্রতিবেদন সংগ্রহ শুরু হোক। পরে সরকারের নিয়ম অনুযায়ী পদোন্নতি হবে। এ জন্য তারা প্রতিনিয়ত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ঘোরাঘুরি করছেন। কিন্তু অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি কার্যক্রম বিলম্বিত হওয়ায় তাদের কাজ শুরু করছে না জনপ্রশাসন। এতে ২৭তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যেও ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।

তবে এ দুই পদে নির্ধারিত পদের তুলনায় অনেক বেশি কর্মকর্তা কর্মরত। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২১ আগস্টের তথ্যানুযায়ী অতিরিক্ত সচিবের ১২১টি পদের বিপরীতে ৪৭৩ জন কর্মকর্তা কর্মরত এবং উপসচিবের এক হাজার ৩২৪টি স্থায়ী পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন এক হাজার ৭০০ কর্মকর্তা। ফলে পদ না থাকার পরও পদোন্নতি পেলে এসব কর্মকর্তাকে আগের পদেই (ইন সি টু) কাজ করতে হবে অথবা ওএসডি থাকতে হবে। সরকারের উপসচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পদে পদোন্নতি বিধিমালা, ২০০২-এ বলা হয়েছে, যুগ্ম সচিব পদে কমপক্ষে তিন বছর চাকরিসহ ২০ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা বা যুগ্ম সচিব পদে কমপক্ষে দুই বছরের অভিজ্ঞতাসহ ২২ বছরের অভিজ্ঞতা থাকলে কোনো কর্মকর্তা অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির জন্য বিবেচিত হবেন।

আর উপসচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে সিনিয়র স্কেল পদে ৫ বছরের চাকরিসহ সংশ্নিষ্ট ক্যাডারের সদস্য হিসেবে কমপক্ষে ১০ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। সর্বশেষ গত বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২৯ আগস্ট ১৬৩ জন কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত সচিব, ২৪ অক্টোবর ২৭৩ জনকে উপসচিব পদে পদোন্নতি দেয় সরকার।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে