নৈশকোচে ৮ ঘণ্টা ধরে ডাকাতদের নির্মমতা

0
53
মহাসড়েক ডাকাতির কবলে বাস-ছবি সংগৃহীত

রাজধানীর আবদুল্লাহপুর এলাকা থেকে টাঙ্গাইলে যাওয়ার জন্য একটি বাসে উঠেছিলেন চিকিৎসক শফিকুল ইসলাম ও তার এক বন্ধু। তখন মধ্যরাত। বাসের ভেতর আলো-আঁধারি পরিবেশ; যাত্রীও খুব কম। ভাড়া মেটানোর পর দু’জনে একটু ঘুমানোর চেষ্টা করেন। এর মধ্যে হঠাৎ সাত-আটজন এসে তাদের ওপর হামলে পড়ে। মারধরের পাশাপাশি একজন গলায় ছুরি চেপে ধরে। আরেকজন বলে, ‘এই বাসে সবাই ডাকাত, যা আছে দিয়া দে।’ আতঙ্কিত শফিকুল ও তার বন্ধু সঙ্গে থাকা টাকা, মোবাইল ফোন, এটিএম কার্ড দিয়ে দেন। তবু প্রায় আট ঘণ্টা ধরে নির্যাতন চলতে থাকে। এক পর্যায়ে সকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় বাস থামিয়ে পালায় ডাকাতরা।

এদিকে খোদ রাজধানীর বুকে বাসে ডাকাতের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব খোয়ানোর পর পুলিশি সহায়তাও পাননি এই ভুক্তভোগীরা। যাত্রাবাড়ী থানা তাদের উত্তরা-পশ্চিম থানায় যেতে বলেছে। অন্যদিকে উত্তরা-পশ্চিম থানা পুলিশ বলছে, তারা কোনো অভিযোগ পায়নি।

ভুক্তভোগী শফিকুল ইসলাম টাঙ্গাইলের আড়াইশ শয্যা হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক। গত ২০ জানুয়ারি রাতে তিনি ওই ঘটনার শিকার হন। তবে রোববার তিনি এ বিষয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিলে তা অনেকের নজরে আসে। গতকাল সোমবার তিনি জানান, জরুরি প্রয়োজনে তিনি ও তার এক বন্ধু ঢাকায় এসেছিলেন। কাজ শেষ হতে অনেক দেরি হয়ে যায়। পরে তারা টাঙ্গাইলে ফেরার উদ্দেশ্যে যখন রাজধানীর আবদুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছেন তখন রাত সাড়ে ১২টা পেরিয়ে গেছে। ওই রুটে নিয়মিত চলাচলকারী শেষ বাস আগেই চলে গেছে। এ পর্যায়ে তারা টাঙ্গাইল হয়ে চলাচলকারী অন্যান্য বাস হাতের ইশারায় থামানোর চেষ্টা করেন।

এক পর্যায়ে ঢাকা থেকে রাজশাহী হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী একটি বাস তাদের দেখে দাঁড়ায়। তারা উঠে পড়েন। কিন্তু বাসের আলো-আঁধারি পরিবেশ দেখে অস্বস্তিতে পড়ে যান। হেলপার সেজে থাকা বাস ডাকাতরা তাদের আশ্বস্ত করে বলে, সবাই ঘুমাচ্ছে বলে আলো নেভানো। আর কিছু যাত্রী পথে উঠবে। এর পর তারাও চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করছিলেন। চলন্ত বাসটি কামারপাড়া পার হওয়ার কিছু পরই বেরিয়ে আসে ডাকাতদের আসল চেহারা। ঘুমভাঙা চোখে ছুরি-পিস্তলসহ তাদের মারমুখী চেহারা দেখে দুই বন্ধু ভড়কে যান। তখনই শুরু হয় মারধর। হাত-পা-চোখ বেঁধে ফেলা হয়।

তিনি কোনো বাধা দিতে যাননি, বরং শুরুতেই বলেছেন, যা আছে নিয়ে নাও, আমাদের ছেড়ে দাও। তবে রেহাই মেলেনি। টাকা ও ফোন নেওয়ার পাশাপাশি তারা এটিএম কার্ড ও বিকাশের পাসওয়ার্ড জেনে সেসব অ্যাকাউন্ট থেকেও টাকা তুলে নেয়।

ডা. শফিকুল বলেন, ডাকাতরা মূলত বুঝতে চাইছিল- আমার ব্যাংকে কী পরিমাণ টাকা আছে। অনেক টাকা-পয়সাঅলা হলে হয়তো আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় করত। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, সারারাত ধরে বাসটি ঢাকার বিভিন্ন সড়কে ঘুরেছে, অথচ কোথাও তাদের কোনো চেকপোস্টে থামতে হয়নি। আমরা খুব ভয়ে ছিলাম। কারণ কাশি দিলে বা সামান্য শব্দ করলেও তারা মারধর করছিল। বেঁচে ফিরতে পারব কিনা, তা নিয়ে সংশয়ে ছিলাম। পরে জেনেছি, বাসের পেছনের দিকের আসনেও কয়েকজনকে বেঁধে রাখা হয়েছিল। পথের বিভিন্ন জায়গায় অপর যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়া হয় বা ধাক্কা দিয়ে ফেলা হয়। তার বন্ধুকে ফেলে দেওয়া হয় কবিরপুর এলাকায়।

তিনি জানান, সারারাত অগণিত চড়-থাপ্পড় খেয়ে তিনি চুপচাপ মাথা নিচু করে ছিলেন। বাস কোথা থেকে কোথায় গেছে, পুরোপুরি বুঝতে পারেননি। এর পর সকালে এক জায়গায় বাস থামল। তখন একজন তার বাঁধন খুলে দিয়ে জানায়, সে বাসটির হেলপার। চালকসহ সে-ও ডাকাতের খপ্পরে পড়েছিল। পরে জানতে পারেন, জায়গাটির নাম চিটাগাং রোড। শেষে তিনি যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইলের মা ও শিশুস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে যান যাত্রাবাড়ী থানায়।

যাত্রাবাড়ী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইয়ামীন কবির বলেন, ডাকাতির অভিযোগ নিয়ে একজন এসেছিলেন। কিন্তু তিনি ডাকাতের খপ্পরে পড়েন আবদুল্লাহপুর এলাকায়। এ কারণে তাকে সংশ্নিষ্ট থানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়।

ডা. শফিকুল জানান, যাত্রাবাড়ী থানার পরামর্শ অনুযায়ী তিনি উত্তরা-পশ্চিম থানায় ফোন করেন। তখন সেখান থেকে বলা হয়, যেহেতু তাকে যাত্রাবাড়ী এলাকায় নামিয়ে দিয়েছে, তাই সেখানেই অভিযোগ করতে হবে। উত্তরা-পশ্চিম থানার ওসি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বলেন, এ রকম কোনো অভিযোগ তারা পাননি। ঘটনাস্থল কোনটি, সেটা পরের কথা। অভিযোগ পেলেই প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে