‘নাগরিকত্ব আইন নয়,‘আমরা ঐক্যবদ্ধ ভারত চাই’

0
664
নতুন নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদে গতকাল মুম্বাইয়ে বিক্ষোভের সময় স্লোগান দেন এক নারী। ছবি: এএফপি

ভারতে পত্রিকায় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে সরকার জানায়, ‘এই আইন কারও নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নেবে না। মুসলমানদের বিরুদ্ধেও নয়।’ রাজ্যে রাজ্যে জারি করা হয় ১৪৪ ধারা। বন্ধ করে দেওয়া হয় মেট্রো স্টেশন, বাস চলাচল। বন্ধ করা হয় মুঠোফোনের ইন্টারনেট ও এসএমএস পরিষেবাও।

নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে মানুষ যাতে রাস্তায় নামতে না পারে, সে জন্য সব ব্যবস্থাই নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সব বাধা উপেক্ষা করে গতকাল বৃহস্পতিবার রাস্তায় নেমেছিল হাজার হাজার মানুষ। কর্ণাটকের বেঙ্গালুরু ও মেঙ্গালুরু, দিল্লি, মুম্বাই, চণ্ডীগড়, কেরালা, উত্তর প্রদেশ ও জম্মু থেকে কলকাতা—মিছিল–স্লোগান সবখানে। তাদের স্লোগান ‘১৪৪ ধারা তোমার, সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদ আমাদের, ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হবে না’। এমন আরও অনেক স্লোগানে উত্তাল হয় ভারতের এক শহর থেকে আরেক শহর, এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্য। সর্বত্র দাবি একটাই, ‘অসাংবিধানিক নাগরিকত্ব আইন বাতিল করো।’

অধিকাংশ জায়গায় বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও উত্তর প্রদেশের কিছু এলাকায় হিংসা ছড়ায়। রাজধানী লক্ষ্ণৌর কিছু এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ বাধে। সম্ভল জেলায় একটি থানা আক্রান্ত হয়। আগুন লাগানো হয় পুলিশের গাড়িতে, সরকারি বাস, মোটরবাইকসহ কিছু দোকানেও। আক্রান্ত হয় সংবাদমাধ্যমও। কর্ণাটকের মেঙ্গালুরুতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন দুজন। আর উত্তর প্রদেশের রাজধানী লক্ষ্ণৌতে নিহত হয়েছেন একজন।

বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ যখন মহাত্মা গান্ধীর ছবি হাতে নিয়ে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলছিলেন, নাগরিকত্ব আইন ও নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে কথা বলছিলেন, বেঙ্গালুরু পুলিশ তখন তাঁকে টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। দিল্লিতে আটক করা হয় সিপিএম নেতা সীতারাম ইয়েচুরি, প্রকাশ কারাত, বৃন্দা কারাত, নীলোৎপল বসু, সিপিআই নেতা ডি রাজা, কংগ্রেস নেতা সন্দীপ দীক্ষিত, অজয় মাকেন, স্বরাজ পার্টির নেতা যোগেন্দ্র যাদবকে।

ক্ষুব্ধ রামচন্দ্র গুহ বলেছেন, ‘গণতান্ত্রিক দেশে আমরা শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলাম। কিন্তু সরকার তা–ও করতে দিতে চায় না। এটা স্বৈরতন্ত্রেরই লক্ষণ।’

সকাল থেকে থমথমে ছিল রাজধানী দিল্লি। বিক্ষোভকারীদের রুখতে রাজধানী দিল্লির জায়গায় জায়গায় রাতারাতি ১৪৪ ধারা জারি করে দেওয়া হয়। মেট্রো রেলের ১৯টি স্টেশনও বন্ধ করে দেওয়া হয়, যাতে কেউ ওই স্টেশনগুলো থেকে বিক্ষোভস্থলে যেতে ও আসতে না পারে। সকাল থেকে রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্ধ করে দেওয়া হয় ইন্টারনেট পরিষেবাও। বন্ধ রাখা হয় দিল্লি ও গুরুগ্রামের বহু রাস্তা। গোটা উত্তর প্রদেশেই জারি করা হয় ওই নিষেধাজ্ঞা। একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি করে বিজেপিশাসিত কর্ণাটক সরকারও। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মানুষ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। রামচন্দ্র গুহকে আটকের মধ্য দিয়ে দিন শুরু হয়। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে দেশের অন্যত্র।

এনআরসির বিরোধিতায় ইতিমধ্যে একজোট সাতটি রাজনৈতিক দল। তাদের মধ্যে রয়েছে কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, বিজেডি, জেডিইউ, সিপিআই, সিপিএম, আম আদমি পার্টি এবং টিআরএস। এই সাত দল ১১ রাজ্যে ক্ষমতায় রয়েছে। রাজ্যগুলো হলো পাঞ্জাব, রাজস্থান, ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ, পদুচেরি, পশ্চিমবঙ্গ, ওডিশা, বিহার, কেরালা, দিল্লি ও তেলেঙ্গানা।

প্রয়োজনে গণভোট করা হোক: মমতা

কলকাতা থেকে জানান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং বিশিষ্টজনদের প্রতিবাদী মিছিলে গতকাল কার্যত অচল হয়ে পড়ে শহর। সব মিছিল থেকে একই দাবি ওঠে, ‘নাগরিকত্ব আইন নয়, এনআরসি নয়। আমরা ঐক্যবদ্ধ ভারত চাই’। বিশিষ্টজনদের মিছিলে নেতৃত্ব দেন প্রখ্যাত অভিনেত্রী ও চলচ্চিত্র পরিচালক অপর্ণা সেন এবং নাট্যব্যক্তিত্ব কৌশিক সেন।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সমাবেশ করেন ধর্মতলার রানি রাসমণি অ্যাভিনিউতে। তিনি বলেন, এনআরসি ও নাগরিকত্ব আইনের পক্ষে দেশের কত মানুষ রয়েছেন, তা দেখতে একটা গণভোট করা হোক। জাতিসংঘ বা মানবাধিকার রক্ষা কমিশনের মতো নিরপেক্ষ কোনো সংগঠন সেই গণভোটের আয়োজন করুক।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে