নদের বুকে পুলিশ ফাঁড়ি

0
226
ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলায় কুমার নদ দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে ভবানীপুর পুলিশ ফাঁড়ি

দখল, দূষণ আর নাব্য সংকটে ধুঁকছে দেশের অধিকাংশ নদনদী। দখলমুক্ত করতে অভিযান চললেও তা কাজে আসছে না। অভিযানের পরই আবার দখল হয়ে যাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রবহমান নদী ৪০৩টি। নদী রক্ষা কমিশন বলছে, এর সবগুলোই এখন দখল-দূষণের কবলে। কমিশন এরই মধ্যে ৫৯ জেলায় ৪৫ হাজারেরও বেশি নদী দখলদার ব্যক্তি, রাজনীতিক ও প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করেছে। সবচেয়ে অবাক করার বিষয়, অনেক স্থানে নদী দখল করে আছে খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠানই! তাদের উচ্ছেদে কার্যকর কোনো ভূমিকা নেই।

বৃহত্তর কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ জেলার মাঝ দিয়ে এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে কুমার নদ। কালের পরিক্রমায় চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার হাট বোয়ালিয়া গ্রামে প্রবহমান মাথাভাঙ্গা নদী থেকে উৎপত্তি হওয়া নদটি এখন মৃতপ্রায়। ১২৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের কুমার জুড়েই রয়েছে দখলের থাবা। দুই ধারে পড়ে থাকা চর এখন আবাদি জমি। আর ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার ভবানীপুর অংশে নদটি দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে পুলিশ ফাঁড়ি। এর সীমানাপ্রাচীরটি ঠিক নদীর মাঝখানে নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ওই অংশে নদীর অস্তিত্বই হুমকির মুখে। কুমার নদ সংরক্ষণ কমিটির নেতারা বলছেন, মাঝখানে ফাঁড়ির সীমানাপ্রাচীর দিয়ে কুমারকে একপ্রকার মেরে ফেলা হয়েছে। তাই তারা দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। তবে আজও ভবানীপুর পুলিশ ফাঁড়ি অন্যত্র স্থানান্তর হয়নি।

জানা যায়, ১৯৯০ সালের পর ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু, চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া সদর উপজেলা চরমপন্থি-সর্বহারা অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে বিশেষ পরিচিতি লাভ করে। এই তিন উপজেলার মানুষ চরমপন্থিদের ভয়ে সবসময় তটস্থ থাকত। ওই সময় শুধু হরিণাকুণ্ডুতেই দিনে-দুপুরে একাধিক হত্যার ঘটনা ঘটে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ১৯৯৬ সালে ভবানীপুরসহ বেশ কয়েকটি স্থানে স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়। তবে ভূমি অধিগ্রহণ বা বন্দোবস্ত ছাড়াই শুধু খাজনা দিয়ে সরকারি এক নম্বর খাস খতিয়ানের কুমার নদের ওপর ভবানীপুর ফাঁড়িটি করা হয়।

স্থানীয়রা জানান, কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার চরপাড়া, রাধানগর, বলরামপুর এবং হরিণাকুণ্ডুর কামারখালী ও নতিডাঙ্গা হয়ে কুমার নদের উৎসমুখ আলমডাঙ্গার দিকে যেতে ভবানীপুর অংশে নদীর ওপর পুলিশ ফাঁড়িটি স্থাপন করা হয়েছে। ভবানীপুর-বলরামপুর ব্রিজের পাশেই এর অবস্থান। বর্তমানে দখল করে জমির পরিমাণ আরও বাড়ানো হয়েছে।

হরিণাকুণ্ডুর তাহেরহুদা ইউনিয়ন ভূমি অফিস সূত্র জানায়, ইউনিয়নের ৯ নম্বর ভবানীপুর মৌজার ২৪১২/১২১৪ নম্বরের (বাটা দাগ) ১ একর ৬০ শতক জমির ওপর ফাঁড়িটি স্থাপিত। অধিগ্রহণ বা বন্দোবস্ত নেওয়া না থাকলেও প্রতি বছর ২১ নম্বর হোল্ডিংয়ের মাধ্যমে ফাঁড়ির নামে খাজনা দেওয়া হয়।

কুমার নদ সংরক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক হরিণাকুণ্ডু উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ মারুফ বলেন, বিভিন্ন সময় আলোচনা সভায় ফাঁড়ির বিষয়টি উপস্থাপন করে প্রতিবাদ করেছি। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে সচিত্র প্রতিবেদনও উপস্থাপন করা হয়েছিল। তিনি ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও কাজ হয়নি। আগে তীরের ওপর পুলিশ ফাঁড়ির জন্য পাকাঘর নির্মাণ করা ছিল। আর এখন নদীর মাঝখানে সীমানাপ্রাচীর দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, পুলিশ ফাঁড়ি হওয়ায় স্থানীয়রা কথা বলার সাহস পায় না। তবে আমরা সোচ্চার আছি। ওই এলাকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ ফাঁড়ি লাগবে। তাই আমরা চাই, নদী দখলমুক্ত করে ফাঁড়িটি অন্য জায়গায় স্থানান্তর করা হোক।

কুমার নদের বর্তমান অবস্থা নিয়ে জরিপ করেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও রিভারাইন পিপলের পরিচালক আলতাব হোসেন রাসেল। তিনি বলেন, কুমার নদের উৎসমুখ থেকে শুরু করে পুরোটাই দখলের কবলে। আর ভবানীপুর অংশে যা হয়েছে তা ভয়াবহ। সরকার নদী দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। প্রতিনিয়ত অভিযান চালানো হচ্ছে। অথচ ভবানীপুরে নদী দখল করে আছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিতরাই। রিভারাইন পিপলের পক্ষে নদী রক্ষা কমিশনকে বিষয়টি জানিয়েছি। কমিশন চেয়ারম্যান ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথাও বলেছেন। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। আমরা বিভিন্নভাবে বিষয়টি সামনে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার হাসানুজ্জামান বলেন, সন্ত্রাসকবলিত ওই এলাকায় মানুষের জানমালের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ ফাঁড়িটি স্থাপন করা হয়েছিল। এর সুফল সবাই পাচ্ছে। যদি জায়গাটি অধিগ্রহণ বা বন্দোবস্ত না নেওয়া হয়, তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে চলতি বছরের প্রথম দিকে অবৈধ দখলদারদের তালিকা প্রণয়ন ও নদীর বুকে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন থেকে মাঠ পর্যায়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

কুমার নদ দখলমুক্ত করা প্রসঙ্গে হরিণাকুণ্ডু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনারের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সৈয়দা নাফিস সুলতানা বলেন, কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে দেখা হবে। অবৈধভাবে নদীর জায়গা দখল করা হলে দখলমুক্ত করা হবে।

ঝিনাইদহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আরিফ-উজ-জামান বলেন, তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.