দেশে পাঁচ বছরে ইটভাটা বেড়েছে ৫৯%

0
215
২০১৩ সালে সারা দেশে ৪ হাজার ৯৫৯টি ইটভাটা ছিল। ২০১৮ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৭ হাজার ৯০২ টি। ফাইল ছবি
ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জ ও মানিকগঞ্জ জেলার অবৈধ ইটভাটা ১৫ দিনের মধ্যে বন্ধের নির্দেশ হাইকোর্টের।

রাজধানীর বায়ুদূষণ কমাতে ঢাকা ও এর পাশের চারটি জেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে অবৈধ সব ইটভাটা ১৫ দিনের মধ্যে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। গতকাল মঙ্গলবার আদালতের এমন নির্দেশনা আসার সময়ও বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরের তালিকার প্রথম দিকেই ছিল ঢাকা শহর। রাজধানীর বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা চেয়ে করা এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এ নির্দেশ দেন। পাশাপাশি বায়ুদূষণ ও দূষণরোধে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির মাধ্যমে অভিন্ন একটি নীতিমালাও করতে বলা হয়েছে।

বায়ুদূষণের উৎসসংক্রান্ত পরিবেশ অধিদপ্তরের গত মার্চের প্রতিবেদন বলছে, সারা দেশে গত পাঁচ বছরে ইটভাটার সংখ্যা প্রায় ৫৯ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৩ সালে সারা দেশে ৪ হাজার ৯৫৯টি ইটভাটা ছিল। আর ২০১৮ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৭ হাজার ৯০২টি। এর মধ্যে ঢাকা ও এর পাশের গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জ জেলায় মোট ১ হাজার ৩০২টি ইটভাটা আছে। শুধু ঢাকা জেলাতেই ইটভাটা আছে ৪৮৭টি। ঢাকার বায়ুদূষণের ৫৮ শতাংশের উৎস ইটভাটা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। তবে অবৈধ ইটভাটার সুনির্দিষ্ট তথ্য কারও কাছে পাওয়া যায়নি। তবে ঢাকা ও ঢাকার আশপাশ ঘুরে বসতবাড়ির খুব কাছে ও আবাদি জমিতে অনেক ইটভাটা দেখা গেছে।

ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন (সংশোধিত) বলছে, আবাসিক, সংরক্ষিত ও বাণিজ্যিক এলাকা, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা উপজেলা সদর ও কৃষিজমিতে ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। ইটভাটা হতে হবে এসব এলাকা থেকে অন্তত এক কিলোমিটার দূরে।

গতকাল সাভারের ভাকুর্তা, আমিনবাজার ও পৌর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, তিনফসলি জমিতেও ইটভাটা আছে। এসব ভাটার কারণে পাশের জমিতেও ফলন হয় না বলে স্থানীয় ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। আবার প্রশাসনের মাধ্যমে অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করে দেওয়ার পর সেগুলো আবার চালু হওয়ার নজিরও আছে। গতকাল আশুলিয়ার তুরাগ নদের তীরে রাজু ব্রিকসে ইট পোড়াতে দেখা গেছে। পাশেই আল আশরাফ ব্রিকসসহ আরও কয়েকটি ভাটায় ইট পোড়ানোর প্রস্তুতি চলছিল। লাইসেন্স ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না থাকায় গত বছর পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে এসব ভাটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

জানতে চাইলে রাজু ব্রিকসের মালিক রাজু আহমেদ বলেন, তাঁর ভাটার জেলা প্রশাসনের লাইসেন্স ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই। তবে তিনি লাইসেন্স ও ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেছেন। লাইসেন্স ও ছাড়পত্র দেখাতে পারেননি আল আশরাফ ব্রিকসের ব্যবস্থাপক আবদুল জলিল। তিনি বলেন,‘সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেই আপাতত শুরু করেছি। পরে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার বক্তাবলী এলাকায় ধলেশ্বরী ও বুড়িগঙ্গা নদীর উভয় তীরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে ইটভাটা। সেখানে কাজ করছেন নারীসহ শ্রমিকেরা। শ্রমিকেরা ভাটাগুলোতে কয়লা দিচ্ছেন আগুনের তাপে বাড়াতে। ইটভাটাগুলোর উঁচু চিমনি থেকে অবিরত নির্গত হচ্ছে কালো ধোঁয়া। সেই ধোঁয়ার সঙ্গে ছাই ছড়িয়ে পড়ছে নদীসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে। বাড়িঘরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার স্থাপনাসহ গাছপালায় ধুলার আস্তরণ পড়ে আছে।

স্থানীয় বাসিন্দা জুয়েল হোসেন বলেন, ইটভাটার নির্গত কালো ধোঁয়ার কারণে পরিবেশের মারাত্মক দূষণ হচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যে বাড়ির টিন নষ্ট হয়ে যায়। বাড়িঘর ধুলাবালিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঢাকা ও এর আশপাশের বৈধ ইটভাটাগুলোর আধুনিকায়ন করতে হবে। পাশাপাশি অবৈধ ইটভাটাগুলো বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। আর তা না হলে ঢাকার বায়ুমানের উন্নতি হবে না।

বৈশ্বিকভাবে বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান এয়ারভিজ্যুয়ালের ‘বিশ্ব বায়ুমান প্রতিবেদন-২০১৮ অনুযায়ী’ বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় ঢাকা ছিল দ্বিতীয়। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে প্রতি ঘণ্টায় বিশ্বের বিভিন্ন শহরের বায়ুমানের তথ্য উপস্থাপন করা হয়। গত রোববার দিনের বেশির ভাগ সময় ঢাকার অবস্থান ছিল প্রথম। আর গতকাল রাত পৌনে নয়টায় ঢাকার অবস্থান ছিল ১০।

 ধুলা, ময়লা ও বর্জ্য অপসারণ করতে হবে
গত ২১ জানুয়ারি প্রথম আলোতে ‘ঢাকার বাতাসে নতুন বিপদ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল। এটি যুক্ত করে পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) পক্ষে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২৮ জানুয়ারি বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ আদেশ দেন। এর ধারাবাহিকতায় রাজধানীতে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা চেয়ে গত সপ্তাহে সম্পূরক ওই আবেদন করে এইচআরপিবি।

গতকাল সম্পূরক আবেদনের শুনানি নিয়ে হাইকোর্টের একই বেঞ্চ ঢাকা শহর ও আশপাশের এলাকায় বায়ুদূষণ এবং দূষণ কার্যক্রম রোধে অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়নের জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি কমিটি গঠন করতে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জ ও মানিকগঞ্জ জেলার অবৈধ ইটভাটা ১৫ দিনের মধ্যে বন্ধে ব্যবস্থা নিতে বিবাদীদের নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া রাজধানীর রাস্তা ও ফুটপাতে ধুলাবালি, ময়লা ও বর্জ্য অপসারণ করতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানিয়ে আগামী ৫ জানুয়ারির মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

আদালত বলেছেন, পরিবেশসচিবের নেতৃত্বে কমিটিতে দুই সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানিসহ (ডেসকো) সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং প্রয়োজন হলে একজন বিশেষজ্ঞ রাখা যাবে।

 আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষে আইনজীবী সাঈদ আহমেদ ও উত্তরের পক্ষে আইনজীবী তৌফিক ইনাম শুনানিতে ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার।

শুনানিতে সাঈদ আহমেদ দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমের কথা বলেন। আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ঢাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা উদ্বেগজনক। দুই সিটি করপোরেশন বলছে, দূষণ নিয়ন্ত্রণে পানি ছিটাচ্ছে। তবে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। দূষণ নিয়ন্ত্রণে পাঁচ দফা নির্দেশনা দেওয়ার আরজি জানান তিনি। শুনানিকালে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ঢাকার বায়ুদূষণের জন্য অন্যতম কারণ হিসেবে আশপাশের অবৈধ ইটভাটা খবরে এসেছে।

উত্তর সিটি করপোরেশনের আইনজীবী তৌফিক ইনাম বলেন, আন্তমন্ত্রণালয়ের সভায় মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ ও বিআরটিএকে প্রকল্প এলাকায় নিজ উদ্যোগে ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে বায়ুদূষণের মাত্রা অনেকটাই কমে আসবে।

আদেশের পর আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, প্রয়োজনে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ করে রাস্তা, ফুটপাত, ফ্লাইওভার ও ওয়াকওয়ের যেসব জায়গায় ধুলাবালি, ময়লা বা বর্জ্য-আবর্জনা জমিয়ে রাখা হয় বা জমে থাকে, সেসব সাত দিনের মধ্যে অপসারণ করতে দুই সিটি করপোরেশনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাস্তা নির্মাণের জন্য খোঁড়াখুঁড়ির কাজ সপ্তাহে দুদিন বন্ধ রাখাসহ পাঁচটি নির্দেশনা চাওয়া হয়েছিল। আদালত ওই তিনটি নির্দেশনা দিয়েছেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে