দুধ-দই নিয়ে শফিউল ডিজিটাল গোয়ালা

0
408
গোয়ালার উদ্যোক্তা শফিউল আলম

দই খেতে অনেকেই পছন্দ করেন। বগুড়ার দই হলে তো কথাই নেই। কিন্তু ঢাকায় বসে ‘খাঁটি’ দই কোথায় পাবেন? উপায় আছে, শফিউল আলমের গোয়ালা। আশপাশের সুপারশপে তো মেলেই; অনলাইনে, ফেসবুকের মাধ্যমে কিংবা সরাসরি ফোন করেও দুধ, দই, ঘিসহ দুগ্ধজাত পণ্যের ফরমাশ দেওয়ার সুযোগ আছে গোয়ালাতে।

দেশে এখন স্টার্টআপ বা নতুন ধরনের ব্যবসার উদ্যোগ বেশ সাড়া ফেলছে। এরই একটি গোয়ালা। এটি মূলত দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য ই-কমার্স বা অনলাইনে সেবার মাধ্যমে ক্রেতার দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি দুধ ও দুধজাত পণ্য নিয়ে মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরিতে কাজ করে বলে দাবি প্রতিষ্ঠাতাদের।

শফিউল আলম গোয়ালার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সহপ্রতিষ্ঠাতা। ২০১৬ সালের ২১ নভেম্বরে বন্ধু রুবাইয়াত হোসেন ও রুহুল আমিনকে নিয়ে ফেসবুকে পেজ খুলে শুরু করেন অনলাইনে দই বিক্রি, নাম দেন গোয়ালা। সেই ডিজিটাল গোয়ালার নাম এখন অনেকের মুখে মুখে।

শুরু যেভাবে
শফিউল আলম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞানে পড়া শেষ করার পর পেশাজীবন শুরু করেন ফ্রিল্যান্সিং দিয়ে। শুরুতে নিজের একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়েছেন। এরপর নতুন উদ্যোগের চিন্তা করছিলেন তিনি। ২০১৬ সালের দিকে নিজের শিশুসন্তানের জন্য নিরাপদ খাবার খুঁজতে গিয়ে নতুন ব্যবসার ধারণা আসে তাঁর মাথায়।

শফিউলের বাড়ি বগুড়ায়। এ সুবিধা কাজে লাগিয়ে দই বিক্রির চিন্তা করেন তিনি। বগুড়ায় দইয়ের জনপ্রিয়তার কথা শফিউল জানতেন। কিন্তু বাজারে খাঁটি বগুড়ার দই খুঁজে বের করা কঠিন। এ চিন্তা থেকেই ঢাকার পান্থপথে ছোট একটি ঘর থেকে গোয়ালার যাত্রা শুরু হয়।

শুরুতে তিন বন্ধু একটি ফেসবুক পেজ খোলেন। ছয় মাসে ছয় হাজারের মধ্যে লাইক পায় পেজটি। শেরপুরের একটি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে দই বিক্রি শুরু করেন। তিন মাসের মধ্যে ক্রেতাদের কাছ থেকে বগুড়ার অন্য পণ্যের জন্য চাহিদা পেতে শুরু করেন। দইয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় ঘি। কিছুদিন পরে দুধের চাহিদাও আসতে শুরু করে। তাঁরা ২০১৭ সালে খাঁটি দুধ বিক্রি শুরু করেন।

কঠিন সময়
ব্যবসায় নেমে পড়লেই তো আর সফল হওয়া যায় না। শুরুতে ভালো সাড়া পাওয়া গেলেও গোয়ালার সুসময় বেশি দিন টেকেনি। তিন বন্ধুর পকেটের টাকায় টান পড়া শুরু হয়। লাভও হচ্ছিল না। বাড়তি বিনিয়োগ দরকার হয়। উপায় না দেখে একজনের ভবিষ্য তহবিলের (প্রভিডেন্ট ফান্ড) টাকা গোয়ালায় খাটানো হয়। তারপরও সংকট কাটেনি।

গোয়ালার অবস্থা খারাপ। সহপ্রতিষ্ঠাতা রুহুল আমিন গোয়ালা ছেড়ে দেন। পুঁজির অভাবে ব্যবসা করা যখন কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, তখন বিনিয়োগকারী হিসেবে সহযোগিতার হাত বাড়ান দুজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাঁরা মূলত ফ্রেন্ডস অ্যান্ড ফ্যামিলি বা এফএনএফ বিনিয়োগকারী হিসেবে গোয়ালার সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁদের সহযোগিতা আর নিজেদের কঠোর পরিশ্রমে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথ থেকে ঘুরে দাঁড়ায় গোয়ালা।

একসময় নিরাপদ খাবারের পাশাপাশি দইয়ের ঐতিহ্য ও স্বাদ অক্ষুণ্ন রেখে মানসম্মত প্যাকেজিংয়ের বিষয়টি মাথায় আসে শফিউলের। মিষ্টির পাশাপাশি সবাই যাতে দইকে উপহার হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন, সে লক্ষ্য নিয়ে এগোতে থাকেন। সাফল্য আসে।

মহাকাশে যাওয়া প্রথম আরব হাজ্জাজ আল-মানসুরি

গোয়ালা এখন
এখন গোয়ালা নিয়মিত ঢাকার ১০ হাজারের মতো ক্রেতাকে সরাসরি সেবা দেয়। এর বাইরে চালডাল, হারারু, অথবাসহ অন্যান্য ই–কমার্স প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে গোয়ালার পণ্য কিনছেন ক্রেতারা। প্রতি মাসে চার থেকে সাড়ে চার হাজার সরাসরি ফরমাশ পাচ্ছেন তাঁরা। সুপারশপের মধ্যে ইউনিমার্ট, মীনাবাজার, আস্থা, লাজ ফার্মা, হাইপারমার্টে গোয়ালার পণ্য পাওয়া যায়।

গোয়ালায় দুগ্ধজাত পণ্যের মধ্যে এখন আছে সরা দই, কাপ দই, ক্ষীরশা। এর পাশাপাশি ঘি, সন্দেশ, রসমালাইও বিক্রি করছে প্রতিষ্ঠানটি। সরিষার তেল পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদন করতে শুরু করেছে তারা।

রাজধানীর নিকেতনে গোয়ালার প্রধান কার্যালয়। নিজস্ব বাহক দিয়ে গ্রাহকের কাছে পণ্য পৌঁছে দেয় বলে গোয়ালার পণ্য নিয়ে অভিযোগ কম—দাবি শফিউলের। বর্তমানে ৩০ জনের মতো কর্মী রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। সম্প্রতি ইউনিভার্সাল ফিন্যান্সিয়াল সলিউশনস লিমিটেডের (ইউএফএস) কাছ থেকে তহবিল পেয়েছে গোয়ালা। এটা দিয়ে পাবনায় পাস্তুরিত দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে তারা।

শফিউল জানান, ফেসবুকের মাধ্যমে শুরু হলেও এখন গোয়ালা পণ্য পেতে ওয়েবভত্তিক ফরমাশ দেওয়া যায়। শিগগিরই অ্যাপেও এ সুযোগ আসবে।

লক্ষ্য বড় হওয়া
দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণে ডেইরি খাতে বড় কোম্পানি হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে কাজ করছে গোয়ালা। দেশের দুগ্ধজাত পণ্য খাতে বড় প্রতিষ্ঠান হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে প্রতিষ্ঠানটি।

শফিউল আলম বলেন, ‘দুধের নিয়মিত গ্রাহকভিত্তিক সরবরাহ বা সাবস্ক্রিপশন মডেল আমরা প্রথম চালু করতে যাচ্ছি। আমরা কাজ করছি মূলত ডেইরি টেক নিয়ে। এটি আমাদের দেশে নতুন শব্দ। খাঁটি দুধ ও দুধজাত পণ্য নিয়ে মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি করাই আমাদের কাজ।’

শফিউল আরও বলেন, দেশে দুধের চাহিদা আছে। এখন দুধ স্বাস্থ্যগত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে চাহিদা সত্ত্বেও খাঁটি দুধ নিয়ে বাজারে নানা কথা ওঠায় মানুষের আস্থা নড়বড়ে হয়েছে। বাজারে খাঁটি দুধের যে চাহিদা রয়েছে, সেটা ধরতেই কাজ করছে গোয়ালা।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে