তিন কন্যার ‘পারফর্মার’

0
225
ডানে হতে মৌটুসী বিশ্বাস, তাসমিয়াহ্ আফরিন আর সাদিয়া জাহান প্রভার

ফেসবুকে পরিচয়ের জায়গায় ছোট্ট করে লিখেছেন দুটো শব্দ, ‘লেখক ও পরিচালক’। মেরিল–প্রথম আলো ফেইম ফ্যাক্টরির উদ্যোগে ‘আগামীর নির্মাতা’ আয়োজনের বিজয়ী, কবি স্বামীর মৃত্যুর পর আমার জবানবন্দীখ্যাত পরিচালক তাসমিয়াহ্ আফরিন। প্রথমে নায়িকার একরাত। তারপর পারফর্মার। এগুলো আগামীর নির্মাতা প্রকল্পের অধীনে বানানো তাঁর দুটো স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের নাম। কথা হলো এই পরিচালক আর তাঁর প্রধান অভিনয়শিল্পী মৌটুসী বিশ্বাস আর সাদিয়া জাহান প্রভার সঙ্গে।

‘নায়িকার একরাত’ 

 ‘আমি কি কেবলই একটা পুতুল?’—এই সংলাপের মাধ্যমে শুরু হয় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নায়িকার একরাত। সে রাতে নায়িকা মৌটুসীর একটা জায়গায় দাওয়াত ছিল। কিন্তু নায়িকাদের কি আর দাওয়াত খেলে চলে? তিনি যেন সবার থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো সত্তা। তাই সোজা বাসায় ঢুকে সালাদ খেলেন। স্বপ্নে দেখলেন সামনে কত খাবার। কিন্তু হাত বাঁধা। একটা মাত্র চরিত্র নিয়ে এক রাতে শুটিং করা নায়িকার এক রাতের মূল উপজীব্য বার্বি ডলের রাজনীতি। প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ও পুঁজিবাদী বাজারব্যবস্থায় একজন নারী নায়িকা হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় তাঁর সব স্বাধীনতা হারান। দিন শেষে যেন পুতুলের মতোই একটা পণ্য হয়ে ঘুমাতে যান। তাই সিনেমা শেষ হয়ে গেলেও ওই একটা সংলাপই মনের গভীর থেকে চিৎকার করে হৃদয়কে পৌনঃপুনিক আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করতে চায়, নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে দর্শককে।

‘পারফর্মার’ 

মেরিল–প্রথম আলো ফেইম ফ্যাক্টরির প্রযোজনায় তাসমিয়াহ্​ আফরিন আরেকটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন, যার নাম পারফর্মার। সম্প্রতি এই ছবির দৃশ্যধারণের কাজ শেষ হয়েছে। চলছে সম্পাদনা আর শব্দসংযোজনের কাজ। ছবির কেন্দ্রে রয়েছেন দুজন। অভিনয়শিল্পী শায়লা চরিত্রে সাদিয়া জাহান প্রভা। আর যৌনকর্মী মঞ্জুরি চরিত্র জীবন্ত হয়েছে মৌটুসী বিশ্বাসের অভিনয়ে। আর আছে শায়লার স্বামী ও মঞ্জুরির প্রেমিক। পারফর্মার–এর গল্পে দেখা যাবে, যৌনকর্মীর চরিত্রকে ভালোভাবে বোঝার জন্য, নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য অভিনেত্রী শায়লা দৌলতদিয়ার এক যৌনপল্লিতে যায়। সেখানে যৌনকর্মী মঞ্জুরিকে দেখে তার কি খানিক ঈর্ষাই হয়? কারণ, যৌনকর্মী হয়েও তো মঞ্জুরি তার চেয়ে বেশি স্বাধীনতা ভোগ করছে। ‘না’ বলার অধিকার রাখে সে। প্রেমিকের ওপর তার কত প্রভাব! ‘সামাজিকভাবে’ মঞ্জুরির চেয়ে ‘উঁচু’ অবস্থানে থাকার পরও শায়লা কি পারছে মঞ্জুরির মতো নিজের মত প্রকাশ করতে? নিজের অজান্তেই তাই শায়লার মুখ থেকে বের হয়ে আসে, ‘তুমি তো অনেক স্বাধীন!’ ক্যামেরার সামনে যৌনকর্মী হয়ে উঠতে গিয়ে শায়লার হঠাৎ মনে হয়, সে কি মঞ্জুরি হয়ে উঠছে? শায়লা কোনো চরিত্র থেকেই ঠিক বের হতে পারে না। তার ভেতর কি তবে থেকে যাবে মঞ্জুরির ছাপ? এসব দেখা যাবে পারফর্মার–এর গল্পে।

দৌলতদিয়া যৌনপল্লিতে তিন দিন, তিন রাত 

পরিচালক আর তাঁর অভিনয়শিল্পীদের কাছে অভিজ্ঞতা জানতে চাওয়া হলো। ঢাকার অংশের শুটিং শেষ করে পুরো ইউনিট ছুটেছে দৌলতদিয়ার যৌনপল্লিতে। তাসমিয়াহ্​ আফরিন মুঠোফোনে দেখালেন একটা ছবি। এক যৌনকর্মীর ঘরের দেয়ালে আঁকা চিত্রশিল্প। একটা গ্রাম, গেরস্ত বাড়ি, বাড়ির উঠোনে খোলা চুলের বউ, বাচ্চা, স্বামী। সেই দেয়ালের ওপরে লেখা, ‘ক্ষণিকের নীড়’। এভাবেই বোধ হয় তাঁদের স্বপ্নটা হৃদয়ের গভীর থেকে মাঝেমধ্যে ঘরের দেয়ালে উঠে আসে। অভিনেত্রী মৌটুসী জানালেন, শুটিংয়ের এক দুপুরে যৌনকর্মীদের একজন তাঁদেরকে ম্যাঙ্গো আইসক্রিম খেতে দেন আর বলেন যে ‘কাস্টমার আসছে, এখনই যেতে হবে।’ সেই আইসক্রিম পরিচালক আর অভিনয়শিল্পীদের প্রচণ্ড গরমে যে স্বস্তি জুগিয়েছিল, তা বলাই বাহুল্য।

পরিচালককে কত নম্বর দিলেন মৌটুসী আর প্রভা? 

দুজনেই বললেন, তাঁরা নাকি এই পরিচালকের ‘ফ্যান’। প্রভা বললেন, ‘আপু খুব সুন্দর করে চরিত্র, দৃশ্য বোঝাতে পারেন যে তিনি কী চাচ্ছেন। ভুল ধরিয়ে দেন। অনেক পরিচালক শুধু বলেন, হচ্ছে না। কেন হচ্ছে না, সেটা আর বলতে পারেন না। আপু সেটা পারেন।’ অন্য ‘নায়িকা’ বললেন, ‘পরিচালক তাসমিয়াহ্​ আফরিনের সবচেয়ে বড় গুণ হলো, তিনি অনেক “পেইন” নিতে পারেন।’ কী রকম? মৌটুসী জানালেন, তাসমিয়াহ্​র নাকি অনেক ধৈর্য। শান্তভাবে অনেক যন্ত্রণা নিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে পারেন। আর অভিনয়শিল্পীকে ধরে চরিত্রের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে পারেন। মোদ্দা কথা, অভিনয়শিল্পীরা এই পরিচালককে শুধু পাস নম্বরই দেননি, দিয়েছেন স্টার মার্ক। এখন দর্শকেরা ছবি আর ছবির অভিনয়শিল্পীদের কত নম্বর দেন, সেটিই দেখার বিষয়। পারফর্মার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের জন্য পাঠানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের একটি টেলিভিশনে ‘বাংলাদেশ প্রিমিয়ার’ হবে।

জিনাত শারমিন

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে