তামাকের জায়গা নিল আখ

0
167
আখ পরিষ্কার করছেন এক চাষি। সম্প্রতি পানছড়ির কংচারী পাড়ায়।

খাগড়াছড়ি সদরের সাতভাইয়াপাড়া এলাকার কৃষক রন্টু দেওয়ান। তাঁর এক একর পতিত জমি শুষ্ক মৌসুমে অনাবাদি পড়ে থাকত। এই জমিতে তিনি তিন বছর তামাক চাষ করেছেন। পরে কৌতূহলবশত ২০১১ সালে ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা নিয়ে আখ চাষ করা শুরু করেন। প্রথম বছর ঠিকভাবে পরিচর্চা করতে না পারায় ২০ হাজার টাকা খরচ করে মাত্র ৩০ হাজার টাকা পেয়েছেন। তবে পরের বছর থেকে তিনি লাভের মুখ দেখেন।

রন্টু দেওয়ান বলেন, গত বছর আখ চাষে ব্যয় হয়েছিল এক লাখ টাকা আর বিক্রি করেছেন দুই লাখ দশ হাজার টাকায়। লাভ হয়েছে এক লাখ টাকার ওপরে। এই বছর আরও বেশি দাম পাওয়ার আশা করছেন। এই আখ চাষই তাঁকে এনে দিয়েছে সচ্ছলতা। আখ চাষ করে কিনেছেন দুটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা।

শুধু রন্টু দেওয়ান নয়, খাগড়াছড়িতে বর্তমানে এক হাজারের বেশি কৃষক আখ চাষের সঙ্গে জড়িত। পতিত জমিতে তামাকের বদলে তাঁরা আখ চাষ করছেন।

খাগড়াছড়ি ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছরের তুলনায় এই বছর আখের আবাদ বেড়েছে। ২০১৭-২০১৮ সালে আবাদ করা হয় ৫২০ হেক্টর জমিতে। ২০১৮-২০১৯ সালে আবাদ হয়েছে ৫৪০ হেক্টরে। তার মধ্যে পতিত জমি ছিল প্রায় ২০০ হেক্টর। গত বছর আখ বিক্রি করে কৃষকেরা পেয়েছেন ১৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এ বছর ২৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকার আখ বিক্রি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

গত বছর আখ চাষ করে লাভ হয়েছে এক লাখ টাকার ওপরে
এই বছর আরও বেশি আশা করেন চাষি

খাগড়াছড়ি ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক দিবাকর চাকমা বলেন, বর্তমানে যে কৃষকেরা আখ চাষ করছেন তাঁদের দুই-তৃতীয়াংশই বেশি লাভের আশায় একসময় তামাক চাষ করতেন।তিনি বলেন, ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে কৃষকদের প্রণোদনা, প্রশিক্ষণসহ বিভিন্নভাবে সাহায্য করা হয়েছে। পতিত পাহাড়ি জমি এবং তামাকের জমিতে আখ চাষ করতে তাঁদের উদ্বুদ্ধ করা হয়। বর্তমানে আখ চাষে লাভবান হওয়ায় অনেক কৃষক তামাক ছেড়ে নিজেরাই আখ চাষ করছেন।

খাগড়াছড়ি পানছড়ি সড়কের ছোটনালা, শিবমন্দির, মুনিগ্রাম, দেওয়ানপাড়া, পাগুজ্জাছড়িসহ কয়েকটি এলাকায় সড়কের দুই পাশে, পতিত জমিতে সারি সারি আখ খেত। কয়েকটি খেত থেকে চাষিরা আখ কাটছিলেন। কথা হয় আখচাষি প্রীত রঞ্জন চাকমার সঙ্গে। তিনি বলেন, দুই একর পতিত জমিতে একসময় তামাক চাষ করতেন তিনি। বাজারে চাহিদা ভালো থাকায় আট বছর আগে আখ চাষ শুরু করেন তিনি। গত বছর আখ চাষে ব্যয় হয় প্রায় দুই লাখ টাকা। আর বিক্রি করেছেন তিন লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকায়। লাভ হয়েছে দেড় লাখ টাকার মতো। আখ বিক্রির টাকা দিয়ে পাকা ঘরও করেছেন। দুই লাখ টাকায় কিনেছেন একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা।

আখচাষিরা জানান, সাধারণত আখ রোপণ করা হয় দুই মেয়াদে। প্রথমবার রোপণ করা হয় সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এবং দ্বিতীয়বার ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের প্রথম সপ্তাহে। আখ কাটা হয় সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরে। অনেক কৃষক আবার ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল এই তিন মাসের যেকোনো সময় আখ কাটেন। আখের ফলন পেতে ১০ থেকে ১২ মাস সময় লাগে।

খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মর্ত্তুজ আলী বলেন, খাগড়াছড়ির পাহাড়ি মাটি আখ চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। বর্তমানে ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে পরিকল্পিতভাবে চাষ করার জন্য নতুন জাতের আখচাষিদের সরবরাহ করা হচ্ছে। এখানকার অনুকূল আবহাওয়া এবং রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ কম থাকায় আখের ফলন ভালো হওয়ায় আখচাষিরা লাভবান হচ্ছে।

জয়ন্তী দেওয়ান, খাগড়াছড়ি

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে