ঢাকামুখী ঢল, বাড়বে আরও ঝুঁকি

0
76
করোনা ভাইরাস

করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ সামাল দিতে গত এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে বিধিনিষেধ চলছে। সংক্রমণ-মৃত্যুও কমে এসেছে। বেড়েছে সুস্থতারও হার। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিধিনিষেধ আগামী ২৩ মে মধ্যরাত পর্যন্ত বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি এর সুফল পাওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ঈদকেন্দ্রিক কেনাকাটা, গ্রামে যাওয়া ও ফিরে আসার যে ভিড় দেখা যাচ্ছে, তাতে তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। এ ছাড়া আড়াই মাস পর ঈদুল আজহা। তখনও একই পরিস্থিতি হলে আবার করোনার নতুন ঢেউ দেখা দেবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) এক গবেষণাতে একই রকম তথ্য উঠে এসেছে। এতে দেখা গেছে, দ্বিতীয় ঢেউয়ে আক্রান্তদের ৬১ শতাংশ বাজারে গেছেন অথবা গণপরিবহন ব্যবহার করেছেন। এ দুটি স্থানই করোনার সংক্রমণের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষজ্ঞ অনেকের মতে, চলতি মাসের শেষ অথবা জুনের প্রথম দিকে সংক্রমণের আরেকটি ঢেউ আসতে পারে। এরই মধ্যে দেশে করোনার ভারতীয় ধরন শনাক্ত হয়েছে। এটি ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে।

সরকার আরোপিত বিধিনিষেধের সমালোচনা করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সরকার আরোপিত বিধিনিষেধ যথাযথ হয়নি। দূরপাল্লার পরিবহন বন্ধ রেখে আন্তঃজেলা পরিবহন চালু করা হলো। এতে ভেঙে ভেঙে আরও বেশি গাদাগাদি করে মানুষ গ্রামে গেছেন। আবার কয়েক গুণ ভাড়া দিয়ে মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, অ্যাম্বুলেন্স ও পিকআপে গাদাগাদি করে মানুষ ঢাকায় ফিরতে শুরু করেছেন। এতে সংক্রমণ বাড়বে।

সংক্রমণ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি বছর মার্চ থেকে শুরু হওয়া করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে নিম্নমুখী হতে শুরু করে। ১৬ এপ্রিল থেকে প্রতিদিন ধারাবাহিকভাবে রোগী শনাক্তের হার কমতে থাকে। গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার ৬ দশমিক ৬৯ শতাংশে নেমে এসেছে। রোগতাত্ত্বিক পর্যালোচনা বলছে, গত এক সপ্তাহে আগের সপ্তাহের তুলনায় শনাক্তের হার ৩৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। মৃত্যু কমেছে ৩৩ দশমিক ১৫ শতাংশ।

আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর বলেন, ঈদের কেনাকাটার জন্য শপিংমল ও বিপণিবিতানে উপচেপড়া ভিড় ছিল। আবার লাখ লাখ মানুষ ঢাকাসহ বিভিন্ন নগরী থেকে গাদাগাদি করে গ্রামে গেছেন। তারা কর্মস্থলে ফিরে আসতে শুরু করেছেন। এতে স্বাস্থ্যবিধি মানা হয়নি। সামাজিক দূরত্বও উপেক্ষিত। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বলা যায়, সংক্রমণ আবারও বাড়বে। এর মধ্যে দেশে করোনার ভারতীয় ধরন শনাক্ত হয়েছে। এটি ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন: চলমান বিধিনিষেধের মধ্যেই ভিড় করে ঢাকার বাইরে যাওয়া এবং আবার গাদাগাদি করে ফিরে আসার যে সুযোগ রাখা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। ঈদে মানুষের যাতায়াত ঠেকাতে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ অবৈজ্ঞানিক বলে মনে করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, যেভাবে ভেঙে ভেঙে বিকল্প পথে লাখ লাখ মানুষ গ্রামে গেছেন; তাদের আটকাতে সরকার পদক্ষেপ নিতে পারত, কিন্তু নেয়নি। একইভাবে এসব মানুষ ঢাকাসহ বিভিন্ন নগরীতে ফিরতে শুরু করেছেন। আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু সরকার এ বিষয়টি বিবেচনায় নেয়নি।

অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, বিধিনিষেধ এক সপ্তাহ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু গ্রামে যাওয়া মানুষ ফিরে আসবেন কিনা- সে সম্পর্কে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। সরকারের নির্দেশনা হওয়া উচিত ছিল- যারা গ্রামে গেছেন, পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত তারা যেন নিজ নিজ অবস্থানে থাকেন। এ ক্ষেত্রে চাকরিজীবীরা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে না পারলেও তাদের বিরুদ্ধে যেন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়। তাহলে হয়তো ঢাকাসহ নগরীমুখী ভিড় আটকানো যেত। এতে সংক্রমণ ঝুঁকিও কমে আসত। কিন্তু সেটি করা হয়নি।

বিএমএর সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব বলেন, সরকারি পদক্ষেপ হাস্যকর। মানুষের গ্রামে যাওয়া আটকে রাখতে যেমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি; আবার এসব মানুষের ফেরা আটকে দিতেও কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। অথচ বিধিনিষেধের মেয়াদ আরও এক সপ্তাহ বাড়ানো হলো। এটি তাহলে কী ধরনের বিধিনিষেধ! যেভাবে প্রায় কোটি মানুষ গ্রামে গেলেন, তারা দ্রুতই ফিরে আসবেন। অর্থাৎ করোনা সংক্রমণের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মাধ্যম হচ্ছে গণপরিবহন। কিন্তু সেটি বন্ধ। এর ফলে আরও বেশি গাদাগাদি করে মানুষ যাতায়াত করছেন। এতে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হলো। এর দায় তো সরকারকেই নিতে হবে। কারণ তাদের অবৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তে করোনার সংক্রমণ বাড়লে সে জন্য সরকারই দায়ী থাকবে- এটি বলা যায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, ঈদ উৎসবকে কেন্দ্র করে জনসমাগম ও মানুষের চলাচল যেভাবে বেড়েছে, তাতে আমরা শঙ্কিত। মানুষের এমন বেপরোয়া যাতায়াতের কারণে দ্বিতীয় ঢেউ কমিয়ে আনতে আনতে তৃতীয় ঢেউ শুরু হয়ে যাবে। আবার তৃতীয় ঢেউ যখন কমে আসবে, তখন ঈদুল আজহা চলে আসবে। তখন আবারও মানুষের চলাচল ও জনসমাগম বাড়বে। এভাবে চলাচল ও জনসমাগম হতে থাকলে করোনার সংক্রমণ শেষ হবে না। বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ উদ্বিগ্ন। কারণ এই ভাইরাসটি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সেটি কঠিন হয়ে পড়ছে। সরকার চেষ্টা করছে, কিন্তু জনগণের সাড়া মিলতে হবে। তাহলেই এ ভাইরাস থেকে মুক্তি মিলবে।

রাজবংশী রায়

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে