ডলারের অভিন্ন দরে রেমিট্যান্সে টান

0
64
ডলার, ছবি: সংগৃহীত

রপ্তানি বিল নগদায়নে প্রতি ডলারে ৯৯ টাকা দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। অন্যদিকে বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউসের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ১০৭ টাকা ৫০ পয়সায় কিনলেও বিদেশে নিজেদের শাখা ও এক্সচেঞ্জ হাউস ৯৯ টাকার বেশি দরে রেমিট্যান্সের দর দিতে পারছে না। ব্যাংকগুলো সিদ্ধান্ত নিয়ে এভাবে ডলারের অভিন্ন দর নির্ধারণের পর থেকে কমছে প্রবাসী আয়। এর কিছুদিন আগে রেমিট্যান্সের সুবিধাভোগীরা প্রতি ডলারে ১১০ টাকার বেশিও পেয়েছে। রপ্তানিতে পতনের পেছনেও ডলারের দর বেঁধে দেওয়ার প্রভাব রয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যস্থতায় ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবি ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী ব্যাংকগুলোর সংগঠন বাফেদা গত ১১ সেপ্টেম্বর সব পর্যায়ে ডলারের সর্বোচ্চ দর নির্ধারণ করে। মূলত আমদানিতে ডলারের দর কমাতে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়। এখন রপ্তানি বিল নগদায়ন ও রেমিট্যান্স কেনার গড় দরের ভিত্তিতে ব্যাংকগুলো আমদানি বিল নিষ্পত্তি করছে। এতে করে ১১২ টাকার ওপরে উঠে যাওয়া আমদানি বিল নিষ্পত্তি হচ্ছে এখন ১০৮ টাকার কম দরে। খোলাবাজারে এখনও নগদ ডলার বিক্রি হচ্ছে ১১৫ টাকার বেশি দরে।

ব্যাংকাররা জানান, ডলারের দর নির্ধারণের পর আমদানিতে কিছুটা কমলেও ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স কমছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছিল। প্রবাসীরা দুই মাসে ৪১৩ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠান। সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে রেমিট্যান্সের প্রবাহ দেখে আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হয়। তবে দর নির্ধারণের পর থেকে কমতে থাকে। সেপ্টেম্বরে এসেছে ১৫৪ কোটি ডলার, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ১০ দশমিক ৮৪ শতাংশ কম। আগের মাসের তুলনায় কমেছে ২৪ দশমিক ৪২ শতাংশ।

বেসরকারি একটি ব্যাংকের সংশ্নিষ্ট একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংকগুলো বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউস থেকে ১০৭ টাকা ৫০ পয়সা দরে ডলার কিনলেও প্রবাসীরা এর কাছাকাছি দর পাচ্ছেন না। বরং ব্যাংকের ৯৯ টাকা দরের সঙ্গে তুলনা করে বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউসগুলো প্রবাসীদের দর কম দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। আবার এক্সচেঞ্জ হাউসের মাধ্যমে অর্থ পাঠাতে ব্যাংকের চেয়ে খরচ বেশি হয়। একই সময়ে হুন্ডিতে কেউ অর্থ পাঠালে দর পাচ্ছেন অনেক বেশি। গতকাল খোলাবাজারে প্রতি ডলার ১১৫ টাকা ৪০ পয়সা পর্যন্ত দরে বিক্রি হয়েছে। সাধারণত খোলাবাজারের দরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে হুন্ডিতে ডলারের দর নির্ধারিত হয়। ফলে এভাবে দর নির্ধারণ করে রেমিট্যান্স বাড়ানো কঠিন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ডলারের দর নির্ধারণের আগে ১ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং চ্যানেলে ৫৯ কোটি ৫৯ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এর মানে দৈনিক গড়ে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ৭ কোটি ৪৪ লাখ ডলার। এ হারে রেমিট্যান্স এলে সেপ্টেম্বর মাসে ২২০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স আসতো। তবে দর নির্ধারণের পর ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ৯ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রেমিট্যান্স এসেছে ৪১ কোটি ২৮ লাখ ডলার। এরপর ১৬ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর ২৫ কোটি ৬৭ লাখ এবং ২৩ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর এসেছে ২৭ কোটি ৪১ লাখ ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বাইরে তিনটি ব্যাংকের ৭টি শাখা এবং বিভিন্ন ব্যাংকের ২৪টি এক্সচেঞ্জ হাউস রয়েছে। ফলে রেমিট্যান্স আহরণে ব্যাংকগুলোকে মানিগ্রাম, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মতো বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউসের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়। ব্যাংকের নিজস্ব উৎসের সঙ্গে ডলারের দরে বড় ব্যবধানের ফলে বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউসের বেশি মুনাফা করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হওয়ায় এমনিতেই চাপে রয়েছে ডলার বাজার। চাপ সামলাতে আমদানি ব্যয় কমানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এতে খুব একটা কাজ হচ্ছে না। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে আমদানিতে ব্যয় হয়েছে এক হাজার ২৬৯ কোটি ডলার। একই সময়ে রপ্তানি আয় হয়েছে ৮১৪ কোটি ডলার। এতে করে ৪৫৫ কোটি ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বাণিজ্যে বড় অঙ্কের ঘাটতির কারণে বহির্বিশ্বের সঙ্গে দেশের চলতি হিসাবেও ঘাটতি আগের চেয়ে বেড়েছে। বৈদেশিক লেনদেনের সামগ্রিক ভারসাম্যেও ঘাটতি বেড়েছে। এই ঘাটতি সংস্থানে চলতি অর্থবছরের এ পর্যন্ত ৩৫০ কোটি ডলারের মতো বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত অর্থবছর বিক্রি করা হয় ৭৬২ কোটি ১৭ লাখ ডলার। এভাবে ডলার বিক্রির ফলে গত বছরের আগস্টে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.