ট্রেড লাইসেন্সের নিয়ন্ত্রক কারা?

0
316
ট্রেড লাইসেন্স

সিটি করপোরেশনের একজন লাইসেন্স সুপারভাইজারের দায়িত্ব হলো ট্রেড লাইসেন্সের আবেদনপত্র যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই ও সরেজমিন তদন্ত করে নতুন লাইসেন্সের অনুমোদন, লাইসেন্স নবায়ন, লাইসেন্সের ফি চালানের মাধ্যমে জমাদান প্রভৃতি। কিন্তু ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বেশির ভাগ লাইসেন্স সুপারভাইজারই নিজে কখনও এসব কাজ করেন না।

সুপারভাইজারদের প্রত্যেকের রয়েছে নিজস্ব বেতনভুক্ত পাঁচ থেকে দশজন বহিরাগত কর্মচারী। নিজের পকেট থেকেই তাদের দৈনিক ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বেতন দেন। তারা সিটি করপোরেশনের কেউ না হলেও তাদের দিয়েই ট্রেড লাইসেন্স সম্পর্কিত সব কাজ করান লাইসেন্স সুপারভাইজাররা।

ট্রেড লাইসেন্স-সংক্রান্ত সব উপরিও তাদের মাধ্যমে আদায় করা হয়। এ রকম শ’খানেক ‘ট্যান্ডল’ দিয়ে চলছে রাজধানীর ব্যবসা-বাণিজ্যের ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়নের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম।

সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, এসব বহিরাগতকে তারা ‘ট্যান্ডল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ফাইলে স্বাক্ষর ছাড়া সব কাজই তারা করে। নতুন ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু বা নবায়নের জন্য আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোতে গেলেই ট্যান্ডলদের দেখা মেলে। তারা লাইসেন্স সুপারভাইজারদের দালাল হিসেবেও কাজ করে। লাইসেন্স করে দেওয়ার শর্তে গ্রাহকের সঙ্গে চুক্তি করে। তাদের মাধ্যম ছাড়া কেউ ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন বা নতুন ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করতে গেলেই কাগজপত্রে ভুল ধরা হয়। অগত্যা বাধ্য হয়ে গ্রাহকরা ট্যান্ডলদের শরণাপন্ন হন। লাইসেন্স সুপারভাইজাররা টাকা-পয়সাও আদায় করেন এই ট্যান্ডলদের মাধ্যমে। প্রতিটি ট্রেড লাইসেন্স ইস্যুতে নির্ধারিত ফির বাইরে ১০ হাজার থেকে এক লাখ পর্যন্ত বেশি টাকা আদায় করা হয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কার্যালয়গুলোতে ট্যান্ডলদের দৌরাত্ম্য বেশি।

এ প্রসঙ্গে ডিএনসিসি মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব। এভাবে বহিরাগতদের দিয়ে কাজ চলতে পারে না। যারা বহিরাগতদের দিয়ে কাজ করাচ্ছেন, প্রয়োজনে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ডিএনসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আবদুল হামিদ মিয়া বলেন, ‘সম্প্রতি কারওয়ান বাজারে (অঞ্চল-৫) অভিযান চালিয়ে এ রকম আট-দশজন বহিরাগতকে জেল দিয়েছি। পরদিনই যদি আবার একই চিত্র তৈরি হয়, তাহলে তো নিয়ন্ত্রণ করা মুশকিল। কারণ, প্রতিদিন অভিযান চালানো সম্ভব নয়। আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা, উপপ্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ও কর কর্মকর্তাদেরও এটা দেখার দায়িত্ব। তারা শক্ত থাকলে এমনটা হয় না।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ইউসুফ আলী সরদার বলেন, ‘ডিএসসিসিতে এভাবে বহিরাগত কর্মীদের ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। তার পরও কেউ কেউ এটা করছেন। এ ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া আছে। এরপরও কেউ বহিরাগতদের ব্যবহার করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ডিএনসিসির উপপ্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মোহসীন আলী বলেন, ‘বহিরাগত কর্মীদের দিয়ে সিটি করপোরেশনের কাজ না করানোর জন্য প্রতিটি কার্যালয়ে প্রতি মাসে একটি করে চিঠি দিই। বহিরাগতদের দিয়ে কাজ না করানোর জন্য নগরভবন ও প্রতিটি আঞ্চলিক কার্যালয়ে ডিজিটাল ব্যানার টানিয়ে দেওয়া হয়েছে। গ্রাহকদেরও এ ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু আমার পক্ষে তো প্রতিদিন কার্যালয়গুলোতে গিয়ে এটা তদারক করা সম্ভব নয়।’

ডিএনসিসির অঞ্চল-৫-এর কর কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়নের বর্তমানে চাপ বেশি থাকায় লাইসেন্স সুপারভাইজারের রুমে ভিড় লেগেই থাকে। এর মধ্যে কে দালাল, কে বহিরাগত, কে কর্মচারী আর কে গ্রাহক- বোঝা মুশকিল। এদের ধরার জন্য মাঝেমধ্যেই অভিযান চলে। এ জন্য ওরা এখন দৌড়ের ওপর আছে। তবে আমার অধীনে যে দুইজন লাইসেন্স সুপারভাইজার আছে, তাদের সতর্ক করে দেব আমি।’

অভিযোগ আছে, এসব বহিরাগত কর্মীর মাধ্যমে লাইসেন্স সুপারভাইজাররা একটি সাধারণ ট্রেড লাইসেন্স করতেও নির্ধারিত ফির বাইরে ১০-১৫ হাজার টাকা বেশি আদায় করেন। এ ছাড়া হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, রেস্টুরেন্ট, আবাসিক হোটেলের ক্ষেত্রে নেওয়া হয় ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। ট্রেড লাইসেন্স ফির টাকাও ঠিকমতো ডিএনসিসির কোষাগারে জমা দেন না লাইসেন্স সুপারভাইজাররা।

নিয়ম অনুযায়ী কোনো আবাসিক প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়ন করা যাবে না। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হলেও বাড়িওয়ালার সঙ্গে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে চুক্তিপত্র থাকাসহ আরও বেশ কিছু নিয়ম মানতে হয় ট্রেড লাইসেন্স ইস্যুর ক্ষেত্রে। কিন্তু এসব বহিরাগত কর্মচারী গ্রাহকদের সবকিছু নকল তৈরি করে দেয়। বিনিময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ বিনিময় হয়। কিছু অসাধু কর কর্মকর্তাও এই অর্থের ভাগ পান। তারা দেখেও না দেখার ভান করেন। এভাবে আবাসিক প্রতিষ্ঠানে ট্রেড লাইসেন্স ইস্যুর কারণে পুরো রাজধানীর সর্বত্র প্রায় কমবেশি বাণিজ্যিক এলাকায় পরিণত হয়েছে।

ডিএনসিসির রাজস্ব বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে দুই সিটির ১০টি আঞ্চলিক কার্যালয়ে লাইসেন্স সুপারভাইজার পদে দায়িত্ব পালনকারীদের বেশির ভাগই লাইসেন্স সুপারভাইজার নন। জনবল সংকটের কারণে নিম্নমান সহকারী, লেজার কিপার, হিসাব সহকারী বা গ্রহণ-বিতরণ সহকারীকে এ দায়িত্ব দিয়ে রাখা হয়েছে।

কার কর্মচারী কে : অনুসন্ধানে জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি বহিরাগত কর্মচারী রয়েছে কারওয়ান বাজার কার্যালয়ে। এখানে লাইসেন্স সুপারভাইজার বজলুল মোহাইমেন বকুলের অধীনে কাজ করে বহিরাগত সুমন, জুয়েল, রিপন, তারেক, আনোয়ার, সাইফুল, জাকির, জামালসহ আরও কয়েকজন। কারওয়ান বাজার অঞ্চল বাণিজ্যিক হওয়ার কারণে ওই অঞ্চলে প্রচুর সংখ্যক ট্রেড লাইসেন্সের কাজ চলে। রাত ১০টা-১১টা পর্যন্তও এসব বহিরাগত দিয়ে কাজ করান লাইসেন্স সুপারভাইজার বজলুল মোহাইমেন বকুল। এ প্রসঙ্গে বজলুল মোহাইমেন বকুল বলেন, “তিন শতাংশ মালিক ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু বা নবায়নের জন্য আমাদের কাছে আসেন। বেশিরভাগ মালিকই না এসে প্রতিনিধিকে পাঠান। প্রতিনিধিরাই ‘মাধ্যম’ খোঁজেন। কিন্তু আমার নিজস্ব বেতনভুক্ত বহিরাগত কোনো কর্মচারী বা এ ধরনের দালাল নেই।” সম্প্রতি এ অঞ্চলে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মাসুদ আনোয়ারকে। তারও কয়েকজন বহিরাগত কর্মী রয়েছে বলে জানা গেছে।

অঞ্চল-৩ (মহাখালী-গুলশান) এলাকায় লাইসেন্স সুপারভাইজার রয়েছেন তিনজন। এর মধ্যে সোহেল রানার বহিরাগত কর্মচারী হিসেবে কাজ করে মোজাফফর, সিকদার, সেলিম, বাদল, মামুন ও তারেক। লাইসেন্স সুপারভাইজার আমির হোসেন খানের বহিরাগত কর্মচারী হিসেবে কাজ করে মঞ্জু, আতিকসহ আরও দু’জন। লাইসেন্স সুপারভাইজার সাইদুল ইসলাম চৌধুরীর বহিরাগত কর্মচারী হিসেবে কাজ করে বাপ্পি, তারেক, হাসানসহ আরও কয়েকজন। অঞ্চল-১-এর (উত্তরা এলাকা) লাইসেন্স সুপারভাইজার আওলাদ হোসেনের বহিরাগত কর্মী হিসেবে কাজ করে আক্তারুজ্জামান, মাসুদ ও আতোয়ার। লাইসেন্স সুপারভাইজার মোস্তাফিজুর রহমানের বহিরাগত কর্মী হিসেবে কাজ করে হাবিব, ফয়সালসহ আরও কয়েকজন। অঞ্চল-২-এর (মিরপুর-২) লাইসেন্স সুপারভাইজার বুলবুল আহমেদের সহযোগী হিসেবে কাজ করে মাসুদ ও বাবুল। অঞ্চল-৪-এর (মিরপুর-১০) লাইসেন্স সুপারভাইজার মো. গোলাম মোস্তফা ও মো. আকরামুজ্জামানেরও রয়েছে কয়েকজন করে বহিরাগত কর্মী।

এদিকে ডিএসসিসির অঞ্চল-১-এর (ধানমণ্ডি-আজিমপুর) লাইসেন্স সুপারভাইজার মাসুদুর রহমানের বহিরাগত কর্মচারী হিসেবে কাজ করে আতিকসহ কয়েকজন। ইফতেখারের বহিরাগত কর্মচারী আছে নজরুল, ফারুক, মোল্লাসহ কয়েকজন। মনিরুল ওরফে লিডার মনিরের বহিরাগত কর্মচারী হিসেবে কাজ করে নাসির, তুহিন ও আলী। এর মধ্যে আলী ডিএসসিসির বরখাস্ত অফিস সহকারী। আবদুল খালেকের বহিরাগত কর্মচারী হিসেবে কাজ করে হাফিজসহ কয়েকজন। আবদুল খালেকের অঞ্চল-৪-এর (পুরান ঢাকার পশ্চিমাঞ্চল) লাইসেন্স সুপারভাইজার কাউসারের বহিরাগত কর্মচারী হিসেবে কাজ করে সুমন, সানিসহ কয়েকজন। আবদুল মান্নানের বহিরাগত কর্মচারী হিসেবে কাজ করে রফিক, শাহ আলম, নাসিরসহ কয়েকজন। জিল্লার রহমানের বহিরাগত কর্মচারী হিসেবে কাজ করে অসীমসহ কয়েকজন। শহীদের বহিরাগত কর্মচারী হিসেবে কাজ করে কাজল, শওকতসহ কয়েকজন। সোহেল রানার বহিরাগত কর্মচারী আছে মামুনসহ কয়েকজন। এভাবে লাইসেন্স সুপারভাইজার অঞ্চল-২-এর (পল্টন-আরামবাগ) লাইসেন্স সুপারভাইজার রাসেল, সেলিম, রিয়াজ, দৌলাত, অঞ্চল-৫-এর (পুরান ঢাকার পূর্বাঞ্চল) সাইফুদ্দিন চৌধুরী, আতিক, নিজামউদ্দিন, ইকবাল আহমেদসহ প্রায় সব লাইসেন্স সুপারভাইজারের বহিরাগত কর্মী রয়েছে।

রসিদ বই নিতে ঘুষ তিন হাজার টাকা: লাইসেন্স সুপারভাইজারদের অভিযোগ, ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়নের ক্ষেত্রে ১০০ পৃষ্ঠার একেকটি রসিদ বই ডিএনসিসির রাজস্ব শাখা থেকে লাইসেন্স সুপারভাইজারদের সরবরাহ করা হয়। এটা ইস্যু হয় উপপ্রধান রাজস্ব কর্মকর্তাদের স্বাক্ষরে। একেকজন লাইসেন্স সুপারভাইজারের প্রতি সপ্তাহে ৫ থেকে ১০টি বই লাগে। প্রতিটি বইয়ের জন্য উপপ্রধান রাজস্ব কর্মকর্তাদের তিন হাজার করে টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে বই দেওয়া হয় না। এ প্রসঙ্গে উপপ্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান মৃধা বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। এ ধরনের কাজ আমি কখনোই করিনি। বই শেষ হয়ে গেলেই বই দেওয়া হয়।’ আরেকজন উপপ্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মোহসীন আলী বলেন, ‘রসিদ বই পেতে তিনটা ধাপ পেরোতে হয়। তাহলে সব দোষ কি উপপ্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার? এ ধরনের অভিযোগ ওঠার পর আমি বলেছিলাম রসিদ বই বরাদ্দের দায়িত্ব থেকে আমাদের বাদ দিতে।’

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে