টিআইবির নির্বাহী পরিচালকের মন্তব্য অনভিপ্রেত: বেক্সিমকো

0
330
বেক্সিমকো

বেক্সিমকো গ্রুপের ঋণ পুনঃতফসিল নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির বিবৃতিতে গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানকে উদ্দেশ্য করে আপত্তিকর, ইঙ্গিতপূর্ণ ও অনভিপ্রেত মন্তব্য করা হয়েছে উল্লেখ করে সংস্থাটির চেয়ারপারসনকে চিঠি দিয়েছেন এই শিল্পগোষ্ঠীর চেয়ারম্যান সোহেল এফ রহমান।

রোববার টিআইবির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারপারসন সুলতানা কামালের কাছে পাঠানো চিঠিতে এও বলা হয় যে, টিআইবির নির্বাহী পরিচালকের মন্তব্য সংস্থাটির জন্যও অমর্যাদাকর।

বেক্সিমকোর চেয়ারম্যান চিঠিতে উল্লেখ করেন, গত ১৩ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমে টিআইবির দেওয়া বিবৃতি ও গত ১৪ সেপ্টেম্বর দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালকের একটি বক্তব্য তাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। বেশ কিছু আপত্তিকর অভিযোগের পাশাপাশি ডেইলি স্টারে টিআইবি নির্বাহী পরিচালকের একটি উদ্ধৃতি প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে– ঋণ পুনঃতফশিলিকরণের সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে একদল লুটেরা আইনপ্রণেতা হওয়ার সুযোগ পেয়ে গেছে।

টিআইবির বিবৃতিতে যেহেতু বেক্সিমকো গ্রুপের অনুকূলে ঋণ পুনঃতফশিলিকরণের একটি ঘটনা প্রাধান্য পেয়েছে, সেহেতু এটি মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, নির্বাহী পরিচালক ওই মন্তব্য করেছেন গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান ফজলুর রহমানকে উদ্দেশ্য করে, যিনি গত নির্বাচনে ঢাকা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। টিআইবির বোর্ড সদস্যদের সঙ্গে বেক্সিমকো গ্রুপের দীর্ঘ সোহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। সুতরাং টিআইবির নির্বাহী পরিচালকের এ ধরনের আপত্তিকর ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য অনভিপ্রেত এবং টিআইবি ও সংস্থাটির বর্ণিত মূল্যবোধের জন্য অমর্যাদাকর।

এতে বলা হয়, বেক্সিমকোর ভাইস চেয়ারম্যান দীর্ঘদিন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ কারণে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ও সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বেক্সিমকো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চরম বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হয়। ওই সময় এ গ্রুপে ঋণ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সালমান রহমানকে দুর্নীতির অভিযোগে আটক করা হয়, আদালতে যা পরবর্তী সময়ে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।

এটি একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উদ্দেশ্য ছিল, দেশে অরাজনীতিকরণ কায়েম করা। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই সফল ব্যবসায়ীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয় এবং জীবন ও ব্যবসা রক্ষার বিনিময়ে বিপুল অঙ্কের চাঁদার অর্থ পরিশোধে বাধ্য করা হয়। বেক্সিমকোর চেয়ারম্যান জানতে চেয়েছেন, টিআইবি কি কখনই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় কতিপয় ক্ষমতাসীন ব্যক্তির এ ধরনের অবৈধ চাঁদাবাজির সমালোচনা করেছে?

চিঠিতে বলা হয়, বেক্সিমকোর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এসব নেতিবাচক পদক্ষেপ (যেমন, যথেষ্ট নগদ অর্থের প্রবাহ থাকা সত্ত্বেও ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে না দেওয়া) এই কোম্পানিকে নিদারূণভাবে আক্রান্ত করে ও অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করে। এ কারণে তখন একটি সফল কোম্পানি হয়েও বেক্সিমকো মারাত্মক আর্থিক বিপর্যয় ও ভাবমূর্তি সংকটে পড়ে যায়। বেক্সিমকো গ্রুপে আর্থিক প্রবাহ বন্ধ করা ছাড়াও কোম্পানির ফার্মাসিউটিক্যাল শাখাকে কোনো কারণ দেখানো ছাড়া প্রায় দুই বছর ধরে এলসি পর্যন্ত খুলতে দেওয়া হয়নি।

বিএনপি ও তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে টানা ৭ বছর ধরে বেক্সিমকোর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক বৈষম্যমূলক আচরণের ফলে কোম্পানির মধ্যে তারল্য সংকট দেখা দেয়। যার ফলে কোম্পানি সময়মতো ব্যাংকের অর্থ পরিশোধ করতে সমর্থ ছিল না। একটি বড় কোম্পানির জন্য এই পরিস্থিতি এতটাই মারাত্মক ছিল যে, এখনও সেখান থেকে পুরোপুরি সেরে উঠতে পারেনি। এত ভয়ানকভাবে আক্রান্ত হওয়ার পরও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এই ১১ বছরে বেক্সিমকো বিভিন্ন ব্যাংকে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার মতো অর্থ পরিশোধ করেছে। এ কারণেই বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা অ্যাকাউন্ট এখন নিয়মিত ও অশ্রেণিভুক্ত অবস্থায় আছে। সুতরাং টিআইবির বিবৃতিতে বেক্সিমকোকে ‘শীর্ষ ঋণখেলাপি’ হিসেবে আখ্যা দেওয়ায় তারা ভীষণ বিস্মিত হয়েছেন।

সোহেল এফ রহমান চিঠিতে আরও জানান, সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনকে উদ্ধৃত করে টিআইবির বিবৃতিতে বেক্সিমকো গ্রুপের অনুকূলে একটি ঋণ পুনঃতফশিলিকরণের বিষয় তুলে ধরা হয়। প্রথম যখন এই পুনঃতফশিল করার অনুমোদন দেওয়া হয়, তার আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ভবিষ্যতে সম্ভাব্য অর্থ প্রবাহ কেমন হতে পারে তা যাচাই করতে বেক্সিমকো একটি স্বাধীন ও কেন্দ্রীয় ব্যাকে অনুমোদিত অডিট প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেয়।

পুরো ঋণ পরিশোধ করতে ১২ বছর সময় প্রয়োজন হবে মর্মে সুপারিশ করে ওই অডিট প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক এ ঋণকে দু’ভাগে ভাগ করে: মেয়াদি ঋণ ও কার্যকরী মূলধন ঋণ। কার্যকরী মূলধন ঋণ পরিশোধের জন্য ৬ বছরের সময় দেওয়া হয়। তবে ওই সময়ই ব্যাংককে তারা জানিয়েছিলেন, ছয় বছরের মধ্যে ওই ঋণ পরিশোধ করা কোম্পানির আর্থিক প্রবাহ অনুযায়ী সম্ভব না-ও হতে পারে।

তিনি উল্লেখ করেন, বিদ্যমান আর্থিক প্রবাহ অনুযায়ী নিয়মমাফিক কিস্তি পরিশোধে বিঘ্ন ঘটতে পারে অনুমান করে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রথম পুনঃতফশিলিকরণের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করে স্বাধীন অডিট প্রতিষ্ঠানের মূল সুপারিশ পালন করার জন্য অনুরোধ করে বেক্সিমকো গ্রুপ। এ ব্যাপারে ব্যাংকের নির্বাহী বিভাগ কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। বেক্সিমকোর আবেদন ব্যাংকের বোর্ড সভায় উত্থাপন করা হয়।

বেক্সিমকো যদিও শুধুমাত্র নিজের ঋণ পর্যালোচনার আবেদন করেছিল, তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ড নিয়মিত অ্যাকাউন্টধারী অন্যান্য ঋণগ্রহীতার ক্ষেত্রেও একই পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা মনে করেন, কোনো সমস্যায় পড়লে তা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অবহিত করা একটি বৃহৎ কোম্পানি হিসেবে তাদের অধিকারের মধ্যে পড়ে। বিশ্বজুড়েই এটি সাধারণ যে, যদি কোনো বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান আর্থিক জটিলতার সম্মুখীন হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক হস্তক্ষেপ করে ও সহায়তা করে।

চিঠিতে বলা হয়, বেক্সিমকো চলমান ও কার্যকরভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে। এ দেশের বেসরকারি খাতে করপোরেট সংস্কৃতি চালু করা প্রথম প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বেক্সিমকো অন্যতম। বিভিন্ন খাতে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের জন্য বহুল পরিচিত। এই গ্রুপে প্রায় ৬০ হাজারের মতো দক্ষ কর্মী সরাসরি নিয়োজিত এবং প্রায় ২ লাখের মতো মানুষ পরোক্ষভাবে জড়িত। গত ১১ বছরে দেশের বাজারের বিভিন্ন খাতে ব্যপক অবদান রাখা ছাড়াও ৩০০ কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে বেক্সিমকো।

১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত বেক্সিমকো গ্রুপ ওষুধ থেকে শুরু করে তৈরি পোশাক ও বস্ত্রখাতসহ বাংলাদেশে যেসব বৃহৎ শিল্প বিকশিত হয়েছে, প্রায় সবগুলোতেই অবদান রেখেছে। পণ্যের মান ও ব্যবসা চর্চার ক্ষেত্রে বেক্সিমকো বৈশ্বিক মানদণ্ড বজায় রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসএফডিএ অনুমোদিত প্রথম বাংলাদেশি কোম্পানি হলো বেক্সিমকো ফার্মা। যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধ রপ্তানিকারী একমাত্র বাংলাদেশি কোম্পানিও বেক্সিমকো। গ্রুপের পোশাক কারখানা নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যের দিক থেকে অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের মানদণ্ড অনুসরণ করে। শাইনপুকুর সিরামিকস বিশ্বের ৭টি প্রতিষ্ঠানের একটি, যা ‘বোন চায়না’ সিরামিকস উৎপাদন ও রপ্তানি করে।

বেক্সিমকোর চেয়ারম্যান বলেন, “টিআইবির নির্বাহী পরিচালক যখন আমাদেরকে ‘লুটেরা’ বলে সম্বোধন করেন, তখন আমরা অত্যন্ত অপমান বোধ করি। এই মন্তব্য শুধু আমাদের ভাইস চেয়ারম্যানের জন্যই মর্যাদাহানিকর নয়, বরং সংসদ সদস্যদের মধ্যে যারা ঋণ পুনঃতফশিল করেছেন তাদের জন্য এবং আমাদের গ্রুপের ৬০ হাজার কঠোর পরিশ্রমী কর্মীর জন্যও অবমাননাকর। টিআইবি দাবি করে, তারা দেশে স্বচ্ছতা আনয়ন ও আইনের শাসনের পক্ষে কাজ করে।

কিন্তু মতামত-নির্ভর প্রতিবেদনের বরাতে যে বিবৃতি টিআইবি দিয়েছে ও নির্বাহী পরিচালক বেক্সিমকোর ভাইস চেয়ারম্যান সালমান ফজলুর রহমান এমপিসহ সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে যে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন, তা শুধু হতাশাজনকই নয়, তা টিআইবির জন্যও অমর্যাদাজনক।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে