ছয় প্রকৌশলীর আইওটির সংগ্রাম

0
163
ইনভেইস টেকনোলজিসের উদ্যোক্তা ছয় বন্ধুর পাঁচজন।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের কাছে (প্রয়াত) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী এক অন্য রকম ভালোবাসার নাম। খুব ভোরবেলায় ক্যাম্পাসে চলে আসা, শিক্ষার্থীদের নানা বিষয়ে সাহায্য করা এবং চমৎকার করে কঠিন বিষয় বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি ক্যাম্পাসে ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। এসবের পাশাপাশি তিনি প্রায়ই বলতেন সম্পদ কম হলেও সমস্যা সমাধানে তা কখনো বাধা হতে পারে না।

 ‘মোহাম্মদ আলী স্যারের অন্য অনেক শিক্ষার্থীর মতো আমিও স্যারের এই কথাটা মানতে পারতাম না। ভাবতাম, কম সম্পদে কেমনে একটা কঠিন সমস্যার সমাধান হবে।’ এলিফ্যান্ট রোডে ইনভেইস টেকনোলজিস-এর অফিসে বলছিলেন এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর মিনহাজ খান। ‘কিন্তু ২০১২ সালে কর্মস্থল বেইজিং হওয়ার পর সেখানে দেখতে পেলাম মানুষ কত অল্প রিসোর্স দিয়েও কাজকর্ম করে, কত কিছু বানাচ্ছে। তখনই মনে হলো, আমাদের দেশে হার্ডওয়্যার শিল্পেও কাজ করা সম্ভব।’

কাজে শুরু হলো নানামুখী পরীক্ষা-নিরীক্ষা। বুয়েটের আহসানউল্লা হলের ৩১১ নম্বর রুমে থাকত ইরতিসাম খান (উৎস)। তার রুমেই যত পরিকল্পপনা, চেষ্টা। সমস্যা অনেক। ইলেকট্রনিক ডিভাইসের প্রাণ হলো প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড (পিসিবি)। ডিজাইন করার পর সেটি পাঠাতে হয় চীনে, কারণ দেশে বহুস্তরের পিসিবি বানানো যায় না। যন্ত্রাংশও পাওয়া যায় না। আরও একটা সমস্যা হলো, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের নিশ্চয়তা। ‘এত সব নেগেটিভিটির মধ্যে ভালো দিক হলো, সারা দেশে কমপক্ষে মোবাইল ও ২-জি ইন্টারনেট সেবা। সেটা নিয়ে কাজ করতে মনস্থির করি’-বললেন মিনহাজ।

সে সময় ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ইস্ট এশিয়ার পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয় একটি ডিজিটাল হাজিরা সিস্টেমের, যা কিনা সার্বক্ষণিকভাবে ক্লাউডে উপাত্ত পাঠাবে। ‘ডিজাইন করার সময় আমরা মাথায় রাখলাম দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা আমরা সব সময় পাবই না।’ জানালেন মোহাম্মদ মুনিরুল আলম। শেষমেশ হলো ‘টিপসই’। বাংলাদেশের প্রথম জিপিআরএস ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহৃত ডিজিটাল হাজিরা যন্ত্র। এই নামটা মিনহাজের দেওয়া। প্রথম ভার্সনের নাম টিপসই ২১। ‘২১ যেমন বাঙালির ভাষার আন্দোলন, এই যন্ত্র তেমনি ফিঙ্গার প্রিন্টের ভাষা বোঝার যন্ত্র।’

ওই প্রজেক্ট শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখে নাই কিন্তু মানুষগুলো দমে যায়নি। এই যন্ত্র প্রথমে বসে গাজী গ্রুপে। এটা দেওয়ার পর অনেকেই একই অনুরোধ নিয়ে আসতে থাকে। এর মধ্যে বুয়েটের তৎকালীন ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক সত্য প্রসাদ মজুমদার নিজ অফিসে এই সিস্টেম ব্যবহার করতে শুরু করেন।

প্রথম ১০০ ডিভাইস বানানোর পর মনে হলো এটিকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে। ছয় প্রকৌশলী—মিনহাজ খান, মোহাম্মদ মুনিরুল আলম, রিয়াজ মোর্শেদ মাসুদ, মোহাম্মদ আমিনুর রশিদ (আসিফ), ইরতিসাম খান (উৎস) এবং ইকরাম শিমুল তাঁদের প্রতিষ্ঠান করার সাহস খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন। সব শুনে এগিয়ে এলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা প্রশাসন ইনস্টিটিউটের শিক্ষক প্রকৌশলী মোশতাক আহমেদ। এলিফ্যান্ট রোডে তাঁর পৈতৃক বাড়ির তৃতীয়তলার একটি কক্ষে যাত্রা শুরু করল ‘ইনভেইস টেকনোলজিস’। বর্তমানে ৪০ জনের বেশি কর্মী কাজ করছেন ইনভেইসের সদর দপ্তরে।

২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে গ্রামীণফোনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার চেষ্টা শুরু এবং ২০১৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ইনভেইসের। ‘গ্রামীণফোন কোম্পানির সঙ্গে কো-ব্যান্ডেড প্রোডাক্ট হিসেবে, তাদের ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেল ইউজ করে এই ‘টিপসই’এখন প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে।’

তবে, টিপসই নিয়ে সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষকদের হাজিরার হিসাব সব সময় সরকারের জন্য একটি দুশ্চিন্তার বিষয়। ‘প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলায় ১০৮টি স্কুলে আমাদের ডিভাইসটি মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে সম্পূর্ণ উপজেলাকে ডিজিটাল সিস্টেমের আওতায় নিয়ে আসে টিপসই।’ জানালেন মিনহাজ।

তাদের মডেল অনুসরণ করে এখন ক্রমান্বয়ে সারা দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো ডিজিটাল হাজিরার আওতায় আনা হচ্ছে। ২০১৭ সালেও মাসে ১০টি ডিভাইস তৈরি করতে পারত না মিনহাজ ও তাঁর দল। এখন মাসে এক হাজার ‘টিপসই’ তৈরি করে তা বাজারজাত করতে পারে। প্রয়োজনে আরও সক্ষমতা বাড়ানোর ইচ্ছে রয়েছে তাদের।

তবে কেবল টিপসই-এর মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেনি ইনভেইস। এরই মধ্যে বেশ কিছু পণ্য ও সেবা তাদের তৈরি হয়েছে। কম গতির ইন্টারনেটের সাহায্যে বিক্রয়কর্মীদের জন্য বানানো সফটওয়্যার জাতীয় স্বীকৃতিও পেয়েছে। বানানো হয়েছে আইওটি (ইন্টারনেট অব থিংস) ভিত্তিক পণ্য উৎপাদন ব্যবস্থাপনা। এর মাধ্যমে উৎপাদক যন্ত্র কত সময় চালু থাকে, কী কারণে বন্ধ হয় তার সবই একটি ড্যাশবোর্ডে পাওয়া যায়। একাধিক অফিসের হাজিরা ব্যবস্থাপনা এবং তা থেকে বাড়তি মজুরি হিসাব করারও পদ্ধতি তাদের রয়েছে।

‘আমরা ব্যবসা করছি সেটি সত্যি, ব্যবসা করার জন্য মুনাফা অর্জন করতে চাই সেটিও সত্যি, কিন্তু সবচেয়ে বেশি আমরা যেটি করতে চাই তা হচ্ছে দেশের কোনো সমস্যা সত্যিকার অর্থে সমাধান করা। আমাদের স্বপ্ন যেন বাস্তবে পরিণত করতে পারি সে জন্য সবার কাছে আমরা দোয়াপ্রার্থী।’

ইনভেইস ও এর নেপথ্যের কারিগরদের জন্য শুভ কামনা।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে