ছড়িয়ে পড়ছে লাম্পি স্কিন

0
211
ফেনীর সোনাগাজীতে লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত একটি খামারের গরু। গত শুক্রবার দুপুরে পৌরসভার মহেশ্চর এলাকার নাসির উদ্দিনের খামারে।

ফেনীর সোনাগাজীতে শহর ও গ্রামাঞ্চলের খামারগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে গরুর লাম্পি স্কিন রোগ (এলএসডি)। গত এক মাসে এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ২০ হাজার গরু। এর মধ্যে মারা গেছে পাঁচটি গরু। এ রোগের প্রতিষেধক ও সঠিক ওষুধ না থাকায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন খামারিরা।

চিকিৎসকেরা বলছেন, এটি ভাইরাসজনিত একটি রোগ। মশা-মাছি ও কীটপতঙ্গের মাধ্যমে গরুর শরীরের ছড়িয়ে পড়ে।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা জানান, উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় শতাধিক খামারি রয়েছেন। এসব খামারে প্রায় ৩০-৩৫ হাজার গরু আছে। এর মধ্যে প্রায় ১০-১২ হাজারের বেশি গরু লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত হয়েছে। তবে খামারিরা বলছেন, আক্রান্ত গরুর সংখ্যা এর মধ্যে ৩০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

গত শুক্রবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে গরুর খামারিদের সঙ্গে কথা হয়। পৌরসভার উত্তর চর চান্দিয়া এলাকার ইত্তেফাক ডেইরি খামারে কথা হয় খামারের মালিক নাসির উদ্দিনের সঙ্গে।

নাসির উদ্দিন বলেন, গত ৫ অক্টোবর শনিবার রাতে হঠাৎ তাঁর খামারের গরুগুলো বসা থেকে দাঁড়িয়ে খাওয়া বন্ধ করে দেয়। গরুগুলো কাঁপতে শুরু করে। তিনি আতঙ্কিত হয়ে খামারে ছুটে যান। মাত্র তিন মিনিটের মধ্যে একটি গরু আক্রান্ত হয়ে লুটিয়ে পড়ে মারা যায়।

নাসির উদ্দিন আরও বলেন, তাঁর খামারে মোট ৫৫টি গরু ছিল। এর মধ্যে লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত হয়ে পাঁচটি গরু মারা গেছে। এক মাসে তিনি গরুর জন্য দুই লাখ টাকার ওষুধ কিনেছেন। এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে দেখে তিনি ২২টি গরু কম দামে বিক্রি করে দিয়েছেন। বর্তমানে তাঁর খামারে ২৮টি গরু আছে। এর মধ্যেও কয়েকটি গরু লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত আছে বলে তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, ছয় মাস আগে এনাপ্লাজমাসিস রোগে ২৭টি গরু আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে খামারে ছয়টি গরু মারা যায়। তখন তাঁর প্রায় ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, মশা-মাছি ও পোকার মাধ্যমে ছড়ায় এ রোগ। এ রোগে আক্রান্ত গরুর শরীরের তাপমাত্রা ১০৩-১০৫ ডিগ্রিতে বেড়ে দাঁড়ায়। গরু খাওয়া বন্ধ করে দেয়। শরীরে প্রচণ্ড জ্বর আসে। পাশাপাশি গরুর শরীরের বসন্তের মতো গুটি গুটি চাকা দেখা দেয়। পরে সেখান থেকে পুঁজ জমে ফেটে গিয়ে মাংস খসে পড়ে। ফলে দুধ উৎপাদনও কমে যায়।

উপজেলার মতিগঞ্জ ইউনিয়নের ভাদাদিয়া এলাকার খামারি ওসমান গাজী চৌধুরী জানান, গত কয়েক দিনে তাঁর খামারেও বেশ কয়েকটি গরু এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে। তিনি আক্রান্ত হওয়া গরুগুলো আলাদা জায়গায় রেখে চিকিৎসা করাচ্ছেন। টাকা খরচ করেও সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ায় তিনি হতাশায় দিন পার করছেন।

উপজেলা দুগ্ধ উৎপাদন ও শীতলীকরণ কেন্দ্রের প্রাথমিক চিকিৎসক মো. আবদুল্লাহ বলেন, তাঁর মতে সোনাগাজীতে লাম্পি স্কিন রোগে প্রায় ৩০ হাজার গরু আক্রান্ত হয়েছে। তিনি গত শুক্রবার একদিনে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে প্রায় ১৫-২০টি গরুর চিকিৎসা করেছেন। তবে গরুর চিকিৎসা করতে গিয়ে তিনি লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত ১০টি মহিষও পেয়েছেন। তাঁর ধারণা, দ্রুত এ রোগের সঠিক চিকিৎসা না করা হলে প্রকোপ বাড়তে থাকবে।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কল্লোল বড়ুয়া বলেন, ‘উপজেলার প্রায় ২০ হাজারের বেশি গরু লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত হয়েছে। রোগটি শুধু সোনাগাজীতে নয়, সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এ রোগের টিকা আমাদের দেশে না থাকায় মাঠপর্যায়ে গিয়ে আমরা খামারিদের সচেতন করছি। আক্রান্ত গরুকে মশা-মাছি থেকে দূরে রাখতে হবে।’

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, খামারিদের থেকে তথ্য পেয়ে তিনি নিজে বিভিন্ন খামার পরিদর্শন করে একটি প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছেন। রোগটি সারতে একটু সময় লাগবে। প্রাণিসম্পদ বিভাগ রোগটি দমনে কাজ করে যাচ্ছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.