চা-শ্রমিকদের একাংশের ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা

১৪৫ টাকা মজুরি প্রত্যাখান

0
56
চা-শ্রমিকদের একাংশের ধর্মঘট

১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা মজুরির দাবিতে সারাদেশের ১৬৭টি চা বাগানের শ্রমিকরা অষ্টম দিনের মতো শনিবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত ধর্মঘট পালন করেছেন। তাদের মজুরি বৃদ্ধির বিষয়ে এর আগে শ্রীমঙ্গলে শ্রম দপ্তরে ও ঢাকায় দু’দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা মজুরির প্রস্তাব দেওয়া হলেও চা শ্রমিকরা তা প্রত্যাখান করেন। পরে তৃতীয় দফায় চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির বিষয়ে শনিবার বিকেলে শ্রীমঙ্গলের শ্রম দপ্তরে চা শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে সরকার পক্ষের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের প্রেক্ষিতে ২৫ টাকা বাড়িয়ে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১৪৫ টাকা নির্ধারিত হয়। এরপর ধর্মঘট স্থগিতের ঘোষণা দেন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রিয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নিপেন পাল।

তবে এর কিছু সময় পরেই বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের মনু-ধলই ভ্যালি কমিটির সভাপতি ধনা বাউরী ও চা ছাত্র যুবনেতা মোহন রবিদাসের নেতৃত্বে শ্রমিকদের একটি পক্ষ এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

ধনা বাউরী ও মোহন রবিদাস শনিবার সন্ধ্যায় বলেন, ‘শনিবার সভা শুরুর আগে থেকেই পুলিশ আমাদের ব্যারিকেড দিয়ে রাখে। পরে পুলিশ আমাদের টর্চার করেছে। চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রিয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নিপেন পালকে দিয়ে ১৪৫ টাকা মজুরি মেনে ধর্মঘট স্থগিতের ঘোষণা দেন। আমরা এই সিদ্ধান্ত মানবো না। ৩০০ টাকা মজুরি নির্ধারিত না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট চলবে।’

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের মনু-ধলই ভ্যালি কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্মল দাশ পাইনকা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে আমাদের দৈনিক মজুরি ১৪৫ টাকা মেনে নিতে এবং ধর্মঘট স্থগিত করতে। সেই প্রেক্ষিতে আপাতত ১৪৫ টাকা মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে আমাদের একটি পক্ষ এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছে না।’

শনিবার বিভাগীয় শ্রম দপ্তর কার্যালয়ে বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খালেদ মামুন চৌধুরী, মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য উপাধ্যক্ষ ড. মো. আব্দুস শহীদসহ মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট ও চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি এবং চা শ্রমিকদের পক্ষে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রিয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে বিকেল ৩টা পর্যন্ত টানা অষ্টম দিনের মতো ৩০০ টাকা মজুরিসহ বিভিন্ন দাবিতে চা শ্রমিকরা ধর্মঘট করেন।

সভা শুরুর আগে তৃতীয় দফায় আজকের বৈঠকে চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির বিষয়ে সমঝোতার আশাবাদ ব্যক্ত করে শ্রীমঙ্গলস্থ বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ নাহিদুল ইসলাম। তিনি মোবাইল ফোনে সমকালকে জানান, ‘চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন নিয়ে সর্ব্বোচ্চ পর্যায়েও কথা চলছে। তবে আজ শ্রীমঙ্গলস্থ শ্রম দপ্তরে চা শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।’

এদিকে গত আট দিন যাবত চা বাগাগুলোতে প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে ও সেকশনে গজানো হাজার হাজার কেজি কাঁচা চা বিনষ্ট হচ্ছে। ফলে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার ক্ষতি গুনতে হচ্ছে বলে চা বাগান ম্যানেজমেন্টের পক্ষে অভিযোগ উঠেছে। অপরদিকে গত অট দিন কোনো মজুরি না পেয়ে চা বাগান শ্রমিকরাও মানবেতর জীবন যাপন করছেন বলে চা শ্রমিকরা দাবি করেছেন।

সীতারাম বীন, দয়াশংকরসহ কয়েকজন চা-শ্রমিক নেতা বলেন, ‘পরিবারে শিশু সন্তান নিয়ে চা শ্রমিক পরিবার সদস্যরা অনেক কষ্ট ভোগ করছেন। শ্রমিকরাও চা বাগানের ক্ষতি হোক তা চায় না। তবে বর্তমানে জিনিসপত্রের যে পরিমাণ দামবৃদ্ধি পেয়েছে তাতে স্বল্প এই মজুরিতে এক লিটার সয়াবিন তেলও কেনা যাবে না।’

ন্যাশনাল টি কোম্পানির পাত্রখোলা চা বাগান ব্যবস্থাপক শামসুল ইসলাম বলেন, ‘চায়ের ভরা মৌসুমে শ্রমিকদের আন্দোলনের ব্যাপক প্রভাব পড়বে। আমার বাগানের সেকশনে যেসব পাতা বড় হয়েছে সেগুলোর কোয়ালিটি বিনষ্ট হয়ে গেছে। এখন সেগুলো কেটে ফেলা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তাছাড়া দৈনিক মজুরির সঙ্গে চা শ্রমিকরা রেশন, চিকিৎসা, গৃহ সুবিধাসহ আরও নানা ধরনের সুবিধা ভোগ করছেন।’ সেসব বিষয়গুলোও আলোচনায় উঠে আসা উচিত বলে তিনি দাবি করেন।

এদিকে ১৪৫ টাকা মজুরি মেনে মেনে চা শ্রমিকদের ডাকা ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়েছে- বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলে কমলগঞ্জ উপজেলার আলীনগর. শমশেরনগর, মৃর্ত্তিঙ্গা চা বাগানসহ বিভিন্ন চা বাগানের বিক্ষুদ্ধ শ্রমিকরা বিক্ষোভ মিছিল করেন। তারা রোববার থেকে ফের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।

এর আগে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে চা-শ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণ করা হয়। এদিন বিকেল তিনটায় চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসে শ্রম অধিদপ্তর। এই বৈঠক শেষে নিপেন পাল অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন।

প্রসঙ্গত, দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করার দাবিতে গত ৯ আগস্ট থেকে কাজ বন্ধ রেখে আন্দোলন করছে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন। গত আট দিনে সরকার ও মালিকপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠকে বসেও মজুরি নিয়ে কোনো সমাধান না হওয়ায় চা-শ্রমিকরা নিজ নিজ এলাকায় সভা-সমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিল করে যাচ্ছিলেন। এরই প্রেক্ষিতে দাবি আদায়ে অষ্টম দিনের মতো ধর্মঘট করছিলেন দেশের সব চা-বাগানের শ্রমিকরা। ধর্মঘটের অষ্টম দিন আবারও চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসে সরকার।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.