ঘরে ধান জুড়ায় বুক, দাম শুনে কৃষকের মলিন মুখ

0
104
করোনার কারণে বাজারে ধানের ন্যায্যমূল্য না থাকায় সবার মলিন মুখ।

এবার হাওরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসেনি, পাকা ধান যথাসময়েই কেটে মাড়াই করে বাড়িতে তুলেছেন কৃষক। বিস্তীর্ণ হাওরের বাড়ি-ঘরসহ ধানের মোকামগুলোতে শুধু ধান আর ধান। এ যেন ‘ধানের সমুদ্র’। তবে কৃষকের মুখে হাসি নেই। করোনার কারণে বাজারে ধানের ন্যায্যমূল্য না থাকায় সবার মলিন মুখ।

এবার হাওরের ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম এবং নিকলী উপজেলাসহ কিশোরগঞ্জের ১৩ টি উপজেলায় ১ লাখ ৫৪ হাজার ৮৭৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ লাখ ৬৭ হাজার মেট্রিক টন। কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।

উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়ালে হাওরের কৃষকের তবু মাথায় হাত। কৃষকরা জানান, প্রতি মন ধান উৎপাদনে ব্যয় হয়েছে গড়ে ৭২০ টাকা। কিন্তু হাওরের চামড়া ঘাট, ভৈরবসহ বিভিন্ন বাজারে নতুন বোরো ধান ৬০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৬৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ বাজারদরে উৎপাদন খরচ উঠছে না তাদের। সুদ ও লগ্নির টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন এ নিয়ে ভাবনায় পড়েছে কৃষকরা।

পাইকাররা স্বীকার করেছেন, কৃষকের লোকসান গুণতে হচ্ছে। লকডাউনে পরিবহন ব্যবস্থা সহজ না হওয়ায় তাদের কিছু করার নেই।

ইটনা উপজেলার বড়িবাড়ী গ্রামের কৃষক মোতালিব মিয়া জানান, তার ৩ একর জমিতে ২৪০ মন ধান হয়েছে। সার, কীটনাশক, সেচ ও অন্যান্য খরচ নিয়ে প্রতিমন ধানে খরচ হয়েছে ৭২০ টাকার বেশি। বর্তমান বাজার মূল্যে বিক্রি করলে কয়েক হাজার টাকা লোকসান গুণতে হবে তাকে।

হাওর উপজেলা মিঠামইনের চারি গ্রামের কৃষক রঙ্গু মিয়া জানান, এবার বাম্পার ফলন হয়েছে। তার ৭ একর জমিতে ৬৫০ মন ধান হয়েছে। অথচ বাজারে ধানের ন্যায্য মূল্য নেই।

অষ্টগ্রাম উপজেলার পুর্ব অষ্টগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রঞ্জিত চক্রবর্তী জানান, এবার বাম্পার ফলন আর্শীবাদ হিসেবেই দেখছে হাওরবাসী। কৃষক আশাতীত ফলন পেয়েছে। তবে ধানের দাম বেশী কম হওয়ায় বর্গাচাষী ও সাধারণ পরিবারে দুর্ভাগ্য নেমে এসেছে। এক ফসলি জমির ওপর নির্ভরশীল কৃষক দাদনের টাকাই পরিশোধ করতে পারবে না। তিনি বলেন, সরকার উপযুক্ত মূল্য নির্ধারণ করেছে। প্রতি কেজি ২৬ টাকা দরে ধান কিনবে। কিন্তু এতে করে সার্বিকভাবে বর্গাচাষী, প্রান্তিক ও ছোট কৃষকের লাভ হবে না। কারণ তাদের কাছে থেকে সরাসরি ধান কেনার আয়োজন নেই।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মোহাম্মদ তানভীর হোসেন জানান, এবার পুরো জেলা থেকে ২২ হাজার ৬৯৮ মেট্রিক টন ধান কিনবে সরকার। তার মধ্যে হাওরের চার উপজেলায় ১১ হাজার মেট্রিক টনের মতো কেনা হবে। কারণ গোডাউনে এর বেশি জায়গা নেই।

সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট মায়া ভৌমিক বলেন, চলতি মওসুমে কিশোরগঞ্জে ১ লাখ ৫৪ হাজার হেক্টর জমিতে ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৬৭ হাজার মেট্রিক টন। সেখানে মাত্র ২২ হাজার ৬৯৮ মে. টন কিনবে সরকার।  যা উৎপাদনের মাত্র ৩.২৯%। এ তো মহাসমুদ্র থেকে এক ফোটা পানি নেওয়ার মতো। এতে প্রকৃত কৃষকের কোন স্বার্থ রক্ষা হবে না।

সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. ছাইফুল আলম বলেন, ৯৮% ভাগ ধান কেটে ফেলা হয়েছে। দামের বিষয়ে একটু অপেক্ষা করতে হবে। করোনা কিছুটা স্বাভাবিক হলে পরিবহন ব্যবস্থা চলমান হলে বাজার বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।

সাইফুল হক মোল্লা দুলু, কিশোরগঞ্জ

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে