গাইবান্ধা-৫ উপনির্বাচন :পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে কঠোর হলেন ইসি

0
74
গাইবান্ধা-৫ উপনির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে স্থাপন করা হয়েছিল সিসিটিভি ক্যামেরা, যা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল ঢাকার আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবন থেকে। সেখানে স্থাপিত কন্ট্রোল রুমের পর্দায় গতকালের বিশৃঙ্খলার চিত্র

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন বর্তমান ইসির এটাই ছিল প্রথম কোনো সংসদীয় আসনের নির্বাচন। আর প্রথম নির্বাচনেই ধাক্কা খেল ইসি। এই নির্বাচনে ১৪৫ কেন্দ্রের সব কটিতেই ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট গ্রহণের ব্যবস্থা ছিল।

নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, গতকাল সকাল আটটায় ভোট গ্রহণ শুরুর পর থেকেই ঢাকার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে সিসি ক্যামেরায় ভোট গ্রহণ পর্যবেক্ষণ করেন সিইসিসহ কমিশনের অন্য কর্মকর্তারা। ঢাকা থেকে ইসি অনিয়মের কারণে প্রথমে তিনটি কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ বন্ধ করে। এরপর দুই দফায় ১৬টি ও ১২টি কেন্দ্রের ভোট বন্ধ করে ইসি। দুপুর নাগাদ এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৫০-এ। এ ছাড়া রিটার্নিং কর্মকর্তা একটি ভোটকেন্দ্রের ভোট বন্ধ করেন। এরপর বেলা দুইটার দিকে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল তিন নির্বাচন কমিশনার—আহসান হাবিব খান, রাশেদা সুলতানা ও মো. আলমগীরকে নিয়ে বৈঠকে বসেন। এ সময় অপর নির্বাচন কমিশনার আনিছুর রহমান কমিশনে ছিলেন না। ওই বৈঠকে পুরো ভোট বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তার আগে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নানা অনিয়মের অভিযোগ এনে আওয়ামী লীগ–সমর্থিত প্রার্থী ছাড়া বাকি চার প্রার্থী ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। আর ভোট বন্ধ ঘোষণার পরপর নির্বাচনী এলাকায় বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা।

‘ভোট নিয়ন্ত্রণের বাইরে’

বেলা আড়াইটার দিকে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল ভোট বন্ধের সিদ্ধান্ত গণমাধ্যমকে জানান। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে মনে হয়েছে, ভোট গ্রহণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। কোনো একটি পক্ষ বা কোনো একজন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী প্রভাবিত করতে পারছেন। ফলে আমাদের দৃষ্টিতে মনে হয়েছে, ভোট গ্রহণ নিরপেক্ষ হচ্ছে না।’

নির্বাচনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেল কেন—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি, আপনারাও দেখতে পাচ্ছেন। গোপন কক্ষে অন্যরা ঢুকছে, ভোট সুশৃঙ্খলভাবে হচ্ছে না। তবে কেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল, তা আমরা এখনো বলতে পারব না।’ একই ধরনের প্রতীক দেওয়া গেঞ্জি পরে অনেককে ভোট দিতে দেখেছেন বলেও জানান সিইসি।

গোপন কক্ষে অনুপ্রবেশকারীরাই ভোটকেন্দ্রের ‘ডাকাত’ কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ‘এরাই ডাকাত। এরাই দুর্বৃত্ত। যারা আইন মানে না, তাদেরই আমরা ডাকাত বলতে পারি, দুর্বৃত্ত বলতে পারি। আমাদের সবাইকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। নির্বাচন কমিশন এখানে বসে সুন্দর নির্বাচন উপহার দিতে পারবে না।’

একটি আসনে ভোট করতে গিয়ে এই অবস্থা, ৩০০ আসনে ভোট হলে কী হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ‘এটা সময় বলে দেবে। এখন একটি আসনে সঠিক হচ্ছে না বলে ৩০০ আসনে হবে না, সেটি বলা সমীচীন হবে না। এই নির্বাচন থেকে আমরা কিছু সতর্কতা অবলম্বন করতে পারব।’

এই নির্বাচনের আবার তফসিল হবে কি না, সেটা স্পষ্ট করে বলেননি সিইসি। তিনি জানান, তাঁরা আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবেন। সেটা পরে জানিয়ে দেওয়া হবে।

এর আগে সর্বশেষ কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন কমিশন ২০১৫ সালের নরসিংদীর মাধবদী পৌরসভার ভোট বাতিল করেছিল।

একযোগে চার প্রার্থীর ভোট বর্জন

ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বীর মৃত্যুতে শূন্য হওয়া এই আসনের উপনির্বাচনে পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামেন। তাঁরা হলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী মাহমুদ হাসান, জাতীয় পার্টির (জাপা) এ এইচ এম গোলাম শহীদ, বিকল্পধারার জাহাঙ্গীর আলম এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী নাহিদুজ্জামান ও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।

আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছাড়া বাকি চার প্রার্থীর অভিযোগ, গতকাল সকাল আটটায় ভোট গ্রহণ শুরুর পর থেকেই নানা অনিয়ম শুরু হয়। এরপর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সাঘাটা উপজেলার বগেরভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোটকেন্দ্রে এই চার প্রার্থী একযোগে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন।

এই সময় জাপার প্রার্থী এ এইচ এম গোলাম শহীদ সাংবাদিকদের বলেন, ভোটকেন্দ্র থেকে তাঁর ও অন্যান্য প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি কর্মী-সমর্থকদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেন সরকারি দলের কর্মী-সমর্থকেরা। তাই তাঁরা একযোগে চার প্রার্থী ভোট বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বলেন, ভোটের আগের রাতে কর্মী-সমর্থকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি দেওয়া হয়েছে। পুলিশ দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে। জাপার ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। মারধর করা হয়েছে। ভোটারদের আঙুলের ছাপ নিয়ে ইভিএমে ভোট অন্যরা দিয়ে দিয়েছেন।

ভোট বর্জন করা বাকি তিন প্রার্থীও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন।

অভিযোগ অস্বীকার আ.লীগ প্রার্থীর

ভোট গ্রহণ নিয়ে অন্য প্রার্থীদের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী মাহমুদ হাসান। তিনি  বলেন, তাঁর কোনো কর্মী-সমর্থক অন্য প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দেননি, বাধাও দেননি। ভোটের আগের রাতেও কেউ হুমকি দেননি। তাঁর দাবি, উপনির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। ভোটাররা উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিয়েছেন।

প্রায় একই রকম ভাষ্য গাইবান্ধার পুলিশ সুপার মো. তৌহিদুল ইসলামেরও। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ তিনি ১০-১২টি কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। যেসব কেন্দ্র তিনি দেখেছেন, সেসব কেন্দ্রে ভোটের পরিবেশ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ছিল।

নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, উপনির্বাচনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৯৮ জন। ইভিএমের মাধ্যমে ১৪৫টি কেন্দ্রে ৯৫২টি বুথে ভোট গ্রহণ কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। নির্বাচনের দিন ভোটারদের নিরাপত্তা দিতে কয়েক প্লাটুন র‍্যাব, আনসার সদস্য ছাড়াও ১ হাজার ২৮৫ জন পুলিশ সদস্য দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সুষ্ঠুভাবে ভোট গ্রহণের পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়নি।

এ অবস্থায় নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার তাগিদ দিয়েছেন গাইবান্ধা নাগরিক মঞ্চের আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, নির্বাচনে অনিয়ম, কারচুপি হয়ে থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তা জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত। যাতে ভবিষ্যতে নির্বাচনব্যবস্থাকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করা যায়।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.