ক্রেতা কম, স্বাস্থ্যবিধিও মানছে না কেউ

ঈদ বাজার

0
190
করোনা প্রতিরোধে জনসচেতনতার অংশ হিসেবে পোশাক প্রদর্শনের পুতুলগুলোকেও পরানো হয়েছে মাস্ক। তারপরও যারা মার্কেটে আসছেন তারা সচেতন হচ্ছেন না। শুক্রবার ঢাকার একটি মার্কেট থেকে তোলা ছবি- এএফপি

করোনাকালের ঈদবাজারে ক্রেতা ও স্বাস্থ্যবিধি- এ দুয়েরই আকাল চলছে। সরকার অনুমতি দিলেও করোনাভাইরাসে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকায় রাজধানীর অধিকাংশ শপিংমল, বিপণিবিতান খোলেনি। অল্প কিছু মার্কেট খুললেও তার অধিকাংশতেই ক্রেতা নেই। আবার যেখানে ক্রেতা আছে, সেখানে স্বাস্থ্যবিধি নেই। ফুটপাতে তো সামাজিক দূরত্বের ছিটেফোঁটাও নেই। অতি ঘনবসতিপূর্ণ পুরান ঢাকায় অবশ্য সামাজিক দূরত্ব মেনে চলারও উপায় নেই। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মার্কেট, বিপণিবিতান ঘুরে এমন দৃশ্যই চোখে পড়েছে।

করোনার বিস্তার রোধে অন্য সবকিছুর মতো গত ২৫ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে শপিংমল, মার্কেট, দোকানপাট। ঈদ সামনে রেখে গত ১০ মে থেকে দূরত্ব বজায় রাখা, একই সময়ে একাধিক ক্রেতার ভিড় এড়ানোসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার শর্তে দোকান খোলার অনুমতি দিয়েছে সরকার। তবে যেসব দোকান খুলেছে, সেখানে এসব শর্ত মানা হচ্ছে না।

গতকাল ছিল রমজানের তৃতীয় শুক্রবার। অন্যান্য বছর রমজানের শুক্রবারে মার্কেটে পা ফেলার জায়গা পাওয়া যায় না। তবে এবার সব মার্কেট বন্ধ। যেগুলো খুলেছে, সেগুলোর সামনের ফুটপাত ও রাস্তা সংলগ্ন দোকানে ভিড় থাকলেও ভেতরের দিককার দোকানিরা ক্রেতার জন্য বসে ছিলেন তীর্থের কাকের মতো। মগবাজার, মৌচাক এলাকার বড় বিপণিবিতান না খুললেও খুলেছে সিদ্ধেশ্বরীর ‘আনারকলি’। গতকাল সেখানে গিয়ে দেখা যায়, মার্কেটের সামনে খোলা জায়গায় যারা বাক্সে রেখে জামাকাপড় বিক্রি করছেন, তাদের এখানে ক্রেতাসমাগম মোটামুটি। আর মার্কেটের ভেতরে ‘গড়ের ময়দান’!

কিশোরগঞ্জের মো. শাহজাহান ‘মায়ের দোয়া ফ্যাশন’-এর মালিক। তার দোকানটি ‘আনারকলি’র দ্বিতীয় তলায়। তিনি বিকেল সাড়ে ৪টায় জানালেন, ‘বউনি’ করতে পারেননি। সারাদিনে এক টাকার পণ্য বিক্রি হয়নি। অথচ গত বছর রোজার দিনগুলোতে দিনে ৩০-৩৫ হাজার টাকা বিক্রি হতো। শুক্রবার ৫০ হাজার ছাড়াত।

কিন্তু ভিন্ন চিত্র ‘আনারকলি’র সামনে রাস্তা ঘেঁষে দোকান ‘মনোলোভা’য়। সর্বোচ্চ ৫০ বর্গফুট আয়তনের দোকানটিতে তিনজন ক্রেতা ও দু’জন বিক্রেতা একই সময়ে জামাকাপড় ঘেঁটে দেখছিলেন। নিরাপদ কিংবা সামাজিক দূরত্ব তাদের মধ্যে ছিল না।

‘মনোলোভা’র মালিক মো. মহসীন বললেন, সারাদিনে এক হাজার ৬০০ টাকা বিক্রি করেছেন। বাসায় বাজার নিতে হবে, তাই ১০-২০ টাকা লাভে পণ্য বিক্রি করছেন। সারাদিনে ২০০ টাকা মুনাফা করতে পারেননি। সামাজিক দূরত্ব কীভাবে মানবেন! আর কীভাবে বা ক্রেতার জন্য জীবাণুনাশকের ব্যবস্থা করবেন! কে দেবে এসবের খরচ? তার তো নিজেরই পেট চলছে না।

নিউমার্কেট, গাউছিয়া, চাঁদনীচক বন্ধ। কিন্তু আগের দিনগুলোর মতো গতকালও গাউছিয়ার সামনের সড়কে ঈদের পোশাকের পসরা নিয়ে বসেছেন অন্তত ৩০ জন বিক্রেতা। ক্রেতারা গায়ে গা লাগিয়ে কেনাকাটা করছেন। সামাজিক দূরত্ব রক্ষার মতো জায়গাও অবশ্য নেই ফুটপাতের এসব দোকানে। এলিফ্যান্ট রোডের দুই পাশের মার্কেটগুলোতে কিছু দোকান খুলেছে। কিন্তু ধানমন্ডি এলাকায় সীমান্ত স্কয়ার, আলমাস, শংকর প্লাজাসহ কোনো মার্কেট খোলেনি। রাস্তার পাশে কয়েকটি শোরুম খুললেও সেখানে ক্রেতার আকাল। তবে এসব দোকানকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্রেতাকে দোকানে প্রবেশ করাতে দেখা গেছে।

গতকাল পুরান ঢাকার ইসলামপুর, ওয়ারী, লক্ষ্মীবাজার, নয়াবাজার, সূত্রাপুর, বংশাল, টিকাটুলি ঘুরে দেখা গেছে, ঈদের সপ্তাহখানেক যে ভিড় থাকে তার তুলনায় ক্রেতার সংখ্যা সামান্যই। কিন্তু পুরান ঢাকার সরু অলিগলি, ফুটপাতজুড়ে হকার এবং ছোট আয়তনের দোকানে কম ক্রেতা সমাগমেই করোনার ঝুঁকি রয়েছে। প্রায় সব এলাকায় দেখা গেছে, মানুষ একে অন্যের শরীর ঘেঁষেই কেনাকাটা করছেন। দোকানে প্রবেশের ক্ষেত্রে কোনো জীবাণুনাশক ছিটানো হচ্ছে না। হাত ধোয়ার ব্যবস্থা চোখেই পড়েনি।

গতকাল সকালে ওয়ারী ঘুরে দেখা যায়, সেইলর শোরুমে ক্রেতাদের প্রবেশের সময় তাপমাত্রা মাপা হচ্ছিল। জীবাণুনাশক ছিটানোর পাশাপাশি সবার মাস্ক নিশ্চিত করা হয়েছে। স্বপ্নর সামনে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। ভেতর থেকে একজন ক্রেতা বের হলেই বাইরে থেকে একজনকে ঢোকানো হয়। প্রায় সব ব্র্যান্ডের শোরুম রয়েছে ওয়ারীতে। অধিকাংশ শোরুম খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে ক্রেতা কম।

অন্য বছরের তুলনায় ভিড় কম হলেও করোনাকালের তুলনায় ইসলামপুরে ক্রেতাসমাগম অনেক। সকাল ১১টার দিকে ইসলামপুর সড়কে হাঁটতে ধাক্কা খেতে হয় পাশের ক্রেতার সঙ্গে। একটি দোকানেও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার দৃশ্য দেখা যায়নি।

ইসলামপুরের মানসুরা এন্টারপ্রাইজের বিক্রয়কর্মী আবু নাঈম বলেন, ‘৮ ফুট বাই ১২ ফুট দোকানে ডেকোরেশনের পর আর কতটুকু বাকি থাকে। এর মধ্যে প্রত্যেকের মধ্যে তিন ফুটের সামাজিক দূরত্ব কীভাবে বজায় রাখা সম্ভব। ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে দোকান বন্ধ রাখা সম্ভব হচ্ছে না। আবার এখানে ক্রেতার ভিড় সামাল দেওয়ার মতোও ব্যবস্থা নেই। যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করা হচ্ছে।

তাঁতীবাজার, ইংলিশ রোড, ধোলাইখাল, লক্ষ্মীবাজার হয়ে সূত্রাপুরের দিকে ঘুরে স্থানীয় বিভিন্ন দোকানপাট খোলা দেখা গেছে। বিভিন্ন সড়ক ঘিরে বিচ্ছিন্নভাবে আসবাবপত্র ও কাপড়ের দোকানে ঈদের কেনাকাটা শুরু হয়েছে। টিকাটুলী এলাকায় মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।

নবাবপুরে মার্কেট না খুললেও ফুটপাতে কেনাবেচা চলছে। গুলিস্তানের দিকেও ফুটপাতের ব্যবসা সচল। বঙ্গবাজারসহ এ এলাকার প্রায় সব মার্কেট বন্ধ রয়েছে। বংশাল, নাজিরাবাজার ও নাজিমউদ্দিন রোডে মানুষের আনাগোনা বেড়েছে। পুরান ঢাকার প্রায় সব এলাকাতেই দোকানপাটের আয়তন খুবই ছোট। এই আয়তনের দোকানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা কঠিন। আবার তা রক্ষার চেষ্টাও নেই ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে।

ঘনবসতিপূর্ণ মিরপুরে সড়কের দু’পাশের অধিকাংশ দোকানপাট খুলেছে। গতকাল সেখানে অন্য দিনের তুলানায় ক্রেতার ভিড় বেশি ছিল। তবে ছিল না স্বাস্থ্যবিধির প্রতি খেয়াল; ছিল না প্রশাসনের তদারকি। তবে মিরপুরের আড়ং, অ্যাপেক্স, বাটা ও বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যের ব্র্র্যান্ডের আউটলেটগুলোতে নিয়ম মেনে বেচাকেনা করতে দেখা যায়। ছিল জীবাণুমুক্ত করে ক্রেতাকে দোকানে প্রবেশ করতে দেওয়ার ব্যবস্থা। অনেক দোকানের সামনে বসানো হয়েছে জীবাণুমুক্ত করার টানেল।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে