ক্যাপাসিটি চার্জে লাগাম চায় অর্থ মন্ত্রণালয়

0
73
বিদ্যুৎ বিভাগ

বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এ খাতে লোকসানের লাগাম টানতে ক্যাপাসিটি চার্জ কমানো ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগকে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি নবায়ন বা নতুন চুক্তির আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেওয়ারও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগকে লেখা এক চিঠিতে ভর্তুকি ছাড়ের শর্ত হিসেবে এসব নির্দেশনা দিয়েছে অর্থ বিভাগ। বিদ্যুৎ খাতের ক্রমবর্ধমান লোকসান নিয়ে সমালোচনা ও উৎকণ্ঠার মধ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হলো।

এদিকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) লোকসান দিন দিন বাড়ছে। চাহিদার চেয়ে উৎপাদন সক্ষমতা বেশি হওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা বাড়তি খরচ হচ্ছে। এই ক্ষতি পোষাতে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়কে। কিন্তু লোকসান এত বেশি হচ্ছে যে বাজেটে বরাদ্দ ভর্তুকির চেয়ে বেশি অর্থ দিতে হচ্ছে পিডিবিকে। গত ১২ অর্থবছরে (২০১০-১১ থেকে ২০২১-২২) বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। এদিক লোকসান সামলাতে বারবার বাড়ানো হচ্ছে বিদ্যুতের দাম। কয়েক দিনের মধ্যে আবারও বিদ্যুতের পাইকারি মূল্য ১৮-২৫ শতাংশ বাড়তে পারে। এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভোক্তা পর্যায়েও দাম বাড়বে।

বাড়ছে লোকসান ও ভর্তুকি: গত এক দশকে দেশে বিদ্যুতের উৎপাদনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লোকসানও বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৬ হাজার ৬৩৯ মেগাওয়াট, এ বছরে পিডিবির আর্থিক ক্ষতি হয় ৪ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। তখন সরকার ভর্তুকি দেয় চার হাজার কোটি টাকা। ২০১১-১২ অর্থবছর উৎপাদন ক্ষমতা বেড়ে হয় ৮ হাজার ১০০ মেগাওয়াট, পিডিবির লোকসান হয় ৬ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা। সরকার ভর্তুকি দেয় ৬ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা। এভাবে ২০২০-২১-এ বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা বেড়ে হয় ২১ হাজার ২৮০ মেগাওয়াট, ওই সময় পিডিবির ক্ষতি হয় ১১ হাজার ৭১৬ কোটি টাকা। ভর্তুকি দেওয়া হয় ১১ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকা। সর্বশেষ গত অর্থবছরে উৎপাদন ক্ষমতা হয়েছিল ২১ হাজার ৬৮০ মেগাওয়াট। এই অর্থবছরে পিডিবির রেকর্ড পরিমাণ ২৯ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা লোকসান হয়। এই ভর্তুকির পুরোটা এখনও পায়নি পিডিবি।

বাড়ছে ক্যাপাসিটি চার্জও: বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও সে অনুসারে চাহিদা বাড়েনি। এ ছাড়া রয়েছে জ্বালানি সংকট। তাই সক্ষমতার একটা বড় অংশের বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে থাকে না। বিদ্যুৎ না কিনলেও উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের বিপরীতে কেন্দ্র ভাড়া হিসেবে একটি অর্থ পরিশোধ করতে হয় পিডিবিকে, যা ক্যাপাসিটি চার্জ নামে পরিচিত।

বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২১ হাজার ৭১২ মেগাওয়াট। উৎপাদন হচ্ছে গড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট। এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল ১৪ হাজার ৭৮২ মেগাওয়াট। সর্বোচ্চ উৎপাদনের চেয়েও বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩২ শতাংশ বেশি। ২০১০-১১ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত ১২ বছরে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর পেছনে ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে প্রায় ৮৬ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা দিতে হয়েছে সরকারকে।

২০১০-১১ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ৩১৬২ মেগাওয়াট। সক্ষমতার ৫৪ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহূত হয়েছে। সে সময় ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ২৭৮৩ কোটি টাকা দিয়েছে পিডিবি। ২০১১-১২ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে সক্ষমতা ছিল ৩ হাজার ৫৮৩ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহূত হয়েছে ৫৮ শতাংশ। সে বছর ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। এভাবে প্রশি বছর ক্যাপাসিটি চার্জ বাড়তে থাকে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাঁচ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার ৫৩ শতাংশ উৎপাদনে ছিল। ক্যাপাসিটি চার্জে পিডিবির ব্যয় ছিল ৫ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকা। ২০২০-২১-এ বেসরকারি খাতের সক্ষমতা ছিল ৯ হাজার ৭৩৪ মেগাওয়াট। উৎপাদনে ছিল ৪৬ শতাংশ। ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে উদ্যোক্তাদের ১৩ হাজার ২১ কোটি টাকা দিয়েছে পিডিবি। এরপর গত অর্থবছরে বেসরকারি খাতের সক্ষমতা বেড়ে হয় ১১ হাজার ৫৩৪ মেগাওয়াট। উৎপাদনে ব্যবহূত হয় ৪৫ শতাংশ। এ সময়ে ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে পিডিবির খরচ হয়েছে ১৪ হাজার ৩৬ কোটি টাকা।

তবে প্রভাবশালীদের চাপে অর্থ মন্ত্রণালয় ক্যাপাসিটি চার্জ কমানোর সিদ্ধান্তে অনড় থাকতে পারবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

চাহিদা না থাকলেও বাড়ছে উৎপাদন সক্ষমতা: পরিকল্পনা অনুসারে চাহিদা না বাড়লেও বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পিডিবির তথ্যমতে, নির্মাণাধীন ২০ কেন্দ্র থেকে আগামী কয়েক বছরে নতুন ১৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে আরও সাড়ে ১০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার ১২টি বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, রক্ষণাবেক্ষণ ও পিক টাইমের লোড ব্যবস্থাপনার জন্য চাহিদার চেয়ে ১৫-২০ শতাংশ উৎপাদন সক্ষমতা বেশি থাকা উচিত। অবশ্য বিদ্যুৎ বিভাগের মতে, চাহিদার চেয়ে উৎপাদন ক্ষমতা ৩০ শতাংশ বেশি হওয়া উচিত। তবে পরিকল্পনা অনুসারে প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে চাহিদার চেয়ে উৎপাদন সক্ষমতা ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ বেশি হবে বলে মনে করছেন খাত-সংশ্নিষ্টরা। এতে এ খাতে আর্থিক চাপ আরও বাড়বে।

বিদ্যুতের দাম বাড়ছে: আগামী সপ্তাহের মধ্যে বিদ্যুতের পাইকারি দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দেবে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। সূত্র জানিয়েছে, ভর্তুকির ওপর নির্ভর করে এই দাম ১৮ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। যদিও পিডিবি পাইকারি পর্যায়ে দাম গড়ে ৬৬ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল।

এ প্রস্তাবনার ওপর গত ১৮ মে শুনানি করেছে বিইআরসি। শুনানির ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে আদেশ ঘোষণার আইনি বাধ্যবাধকতা আছে। এ বিষয়ে বিইআরসির চেয়ারম্যান আবদুল জলিল বলেন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঘোষণা আসবে। সূত্র জানায়, বিদ্যুতে ভর্তুকির পরিমাণ এখনও নির্ধারিত হয়নি। এ বিষয়ে সরকারের উচ্চ মহলের নির্দেশনা অনুসারে দাম বৃদ্ধির ঘোষণা আসবে। পাইকারি দাম বাড়লে ভোক্তা পর্যায়েও দাম বাড়াতে হবে বিইআরসিকে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য নির্দেশনা: বিদ্যুৎ বিভাগকে লেখা চিঠিতে আইপিপি, রেন্টাল এবং কুইক রেন্টাল কেন্দ্রের মাসভিত্তিক আর্থিক ক্ষতির বিবরণী পৃথকভাবে পরের মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে অর্থ বিভাগে প্রেরণ করতে বলা হয়েছে। এ অর্থ ভবিষ্যতে অডিটের মাধ্যমে নিরূপিত মোট প্রদেয় অর্থের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।

সুষ্ঠু ভর্তুকি ব্যবস্থাপনার স্বার্থে পিডিবি, অধীন প্রতিষ্ঠান ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিটগুলোতে রিয়েল টাইম ডাটানির্ভর ইআরপি সফটওয়্যার দ্রুত বসাতে হবে। আর্থিক শৃঙ্খলা ও জাতীয় বাজেট ব্যবস্থাপনার স্বার্থে বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি নবায়ন অথবা নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের চুক্তি বিবেচনার জন্য অর্থ বিভাগে প্রেরণ করতে হবে।

জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়কে ভর্তুকি দিতে হয়। তারা জবাবদিহি চাইতেই পারে। বিদ্যুৎ খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন তিনি। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ সচিব হাবিবুর রহমান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

হাসনাইন ইমতিয়াজ

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.