কোনো বাধা মানবো না, শুনুন দোলার গল্প

0
220

বাবা চেয়েছিলেন একটি ছেলে। জন্মাল মেয়ে। ছেলে হয়ে জন্ম না নেওয়ায় নিয়তিমাখা অপরাধে(!) বাবার মুখে ‘মা’ ডাক শোনেনি মেয়েটি আজ অবধি। কথাও বলেন না তার সঙ্গে। এমনকি বাড়িতে বন্ধুরা এলে সবার সঙ্গে আনন্দঘন মুহূর্ত কাটান। তারা চলে গেলেই বাবার বিষণ্ণ মুখ, চারপাশ জড়িয়ে ধরা নিকষ অন্ধকার।

সদ্য পনেরো ছোঁয়া সেই দোলা আক্তার রেবা এখন বিদেশি মঞ্চে। সুদৃশ্য পডিয়ামের ওপরে লেখা- ‘দোলা, ইয়ং লিডার’। লেখাটার ঠিক সামনেই লম্বা মাইক্রোফোন। সে আলতো স্পর্শে সেটা ধরে সামনে উপবিষ্ট সবাইকে বলল- হ্যালো। কণ্ঠে বলিষ্ঠতা, চোখে দৃপ্ততা, অকুতোভয় স্বরে শুরু হলো তার বক্তৃতা। ঝরে পড়ল আগামী নেতৃত্বের দৃঢ়তা, বর্ণময় উজ্জ্বল প্রকাশ।

দোলারা চার বোন। সবার ছোট সে। এক ছেলের আশায় পরপর চার কন্যা। বাবার ভুল অভিমান।

কথা বলেন না তিনি অন্য তিন মেয়ের সঙ্গেও।

দোলার কষ্ট তাই শিশুকাল থেকেই। ধীরে ধীরে সয়ে গেছে তা। তবে সেই কষ্ট বদল হয়েছে প্রতিবাদী সত্তায়, নিজের মাঝে জেগেছে রুখে দাঁড়ানোর রূপ। এগিয়ে চলেছে সে, দেশ থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে।

বাবা মোহাম্মদ আলেক ও মা রীনা বেগমের সঙ্গে দোলা থাকে মোহাম্মদপুরের কাটাসুর ২ নম্বর গলির ভাড়াবাড়িতে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় শুরু করে বিভিন্ন সেবামূলক কাজ। সেইসঙ্গে অর্জন করে সাংগঠনিক দক্ষতাও। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে গত ৮ থেকে ১৪ অক্টোবর সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে ওয়ার্ল্ড ভিশন গ্লোবালের আয়োজনে অনুষ্ঠিত সাত দিনব্যাপী ‘শিশুরা কীভাবে শিশুবিবাহ বন্ধে ভূমিকা রাখতে পারে’, অর্থাৎ ‘হাউ চিলড্রেন আর পার্টিসিপেটিং অব কন্ট্রিবিউটিং টু এন্ড চাইল্ড ম্যারেজ’ শিরোনামে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে সে। আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এ সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে শিশু ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অংশ নেন। বাংলাদেশ থেকে শিশুদের প্রতিনিধিত্ব করতে কেবল দোলাই অংশ নেয় সে সম্মেলনে। এ ক্ষেত্রে তাকে সহযোগিতা দিয়েছে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ। সংস্থার অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড জাস্টিস ফর চিলড্রেনের উপপরিচালক সাবিরা নূপুর সঙ্গে ছিলেন দোলার। পুরো সম্মেলনে দোলার স্বতঃস্ম্ফূর্ত অংশগ্রহণ- সবাই অবাক, বিমোহিত।

দোলা তার স্বপ্নের কথা জানায়। জানায় তার সাহসিকতার গল্পও।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখত দোলা, প্রতিদিন। কথা বলত নিজের সঙ্গেই। এমনকি তার শখের উপস্থাপনাও চলত ওই আয়নাতেই। মাঝেমধ্যে নির্দিষ্ট একটি বিষয় নিয়ে ওই আয়নাতেই চলত যুক্তিতর্কও। কারণ, এটা তার স্বপ্ন।

বড় হয়ে সাংবাদিক হবে দোলা- এ স্বপ্নও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় প্রতিদিন। প্রতিদিনের খবরের কাগজ পড়া তাই তার রুটিনের অংশ। সেই অনুভূতি থেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতেই যুক্ত হয় বাংলাদেশ জাতীয় শিশু ফোরামের সঙ্গে। সামাজিক দায়িত্ববোধ তাকে অনুপ্রাণিত করে সেবামূলক কাজে। পাশের এলাকায় ১২ বছর বয়সী এক মেয়ের বাল্যবিয়ে বন্ধ করেছে সে ও তার বন্ধুরা। এ বিষয়ে তরুণদের সচেতন করতে গত দু’বছর বিভিন্ন জেলায় ঘুরেও বেড়িয়েছে এই ছোট্ট মেয়েটি।

দোলা বলে, ‘আমার জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার হচ্ছে এবারের জেনেভা সফর। এ সম্মেলনে অংশগ্রহণের বাছাই প্রক্রিয়ায় অনেক সুবক্তা ও মেধাবীর ভিড় ছিল। তাদের ঠেলে আমি নির্বাচিত হয়েছি।’ রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ফিরোজা বাশার আইডিয়াল কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষের এই দোলার চোখে এখন সাফল্যের দীপ্তি।

‘ভয় করেনি?’

‘আমার মধ্যে ভয় কাজ করে না। প্রথম বক্তা ছিলাম। এমনকি আমার চারপাশে যারা বসে ছিলেন, সবাই আমার চেয়ে বয়সে বড়। ভিনদেশিও। তাদের দেখে আমার সাহস বেড়ে যায়। তাই বলিষ্ঠ কণ্ঠে কথা বলি, বলতে পেরেছি।’

‘সবাই অবাক হয়েছিল, না?’

দোলা একটু থামে, ‘স্কুলজীবন পার করে এখন পা রেখেছি কলেজে। প্রতিদিন দেখেছি, সবার বাবা তাদের সন্তানদের স্কুলে নিয়ে এসেছেন। অথচ আমার বাবা কোনোদিনই স্কুলে যাননি, কোনো খবর নেননি।’

‘মন খারাপ হতো খুব?’

‘ব্যাপারটা আমাকে আঘাত করত, প্রচণ্ড। জেনেভায় গিয়েছিলাম, আমার বন্ধুর বাবারা কল দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। খোঁজখবর নিয়েছেন। অথচ আমার বাবা কল দেননি। এমনকি দেশে ফিরে শরীরের অবস্থা জানতে চেয়েছিলাম। উত্তর পাইনি তারও।’ গলা ধরে আসে দোলার, ‘আমার মা আমার বড় সাহস। চলার শক্তি। মা বলেন, একসময় আমি অনেক বড় হবো। এটাই আমার সাহসের মূল শক্তি, আমার চলার পথ।’

দোলা বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় শিশু ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক। দোলা জানায়, জাতীয় শিশু ফোরাম শিশুদের একটি সংগঠন। যারা লেখাপড়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রায় ৩২টি জেলা, ৫৬টি উপজেলা এবং ১৬৮টি ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন এলাকায় শিশুর প্রতি সব ধরনের শারীরিক সহিংসতা প্রতিরোধ, শিশুবিয়ে প্রতিরোধ, শিশুশ্রম, শিশু নির্যাতন বন্ধে শিশু, অভিভাবক, দায়িত্ববাহক ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। এর সদস্যরা অন্যান্য শিশু এবং কমিউনিটির জনগণকে এসডিজিবিষয়ক সচেতনতা এবং শিশু সুরক্ষাবিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৮৮ হাজার শিশু জাতীয় শিশু ফোরামের সদস্য। ওয়ার্ল্ড ভিশন এই সংগঠনকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করছে। বাংলাদেশের মানসম্মত শিক্ষার অন্তরায় হিসেবে যা দৃষ্টিগোচর হয়েছে, সেগুলো হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনও শারীরিক ও অপমানজনক শাস্তি বিদ্যমান, বিদ্যালয়ের নোংরা পরিবেশ, টয়লেট সমস্যা, খাবার পানির সমস্যা, মেয়েদের মাসিক ব্যবস্থাপনা নেই (অথচ প্রতি মাসে মেয়েদের মাসিক হওয়ার সময় নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, দীর্ঘ সময় ক্লাস করতে হয় মাসিক অবস্থায়), সেখানে শিশুদের প্রতিনিধিত্বের অভাব, স্কুলের বিজ্ঞানাগার ও লাইব্রেরির সমস্যা, বিনোদন ও খেলাধুলার সমস্যা, ক্লাস চলাকালীন শিক্ষকদের মোবাইল ব্যবহার ও অমনোযোগিতা, কোচিংয়ে বাধ্যতামূলক পড়ানোর চাপ, হাওর এলাকায় বন্যার সময় দুই থেকে তিন মাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা, শিক্ষকদের শিশু সুরক্ষা বিষয় প্রশিক্ষণ না থাকা ইত্যাদি।

দোলার ব্যাপারে জানতে চাইলে সাবিরা নূপুর বলেন, ‘দোলা কর্মঠ একজন মেয়ে। তার মধ্যে লিডারশিপ আছে। অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে এবং ভোটাভুটির মাধ্যমে সে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়।’

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে