কেন বাবাকে হত্যা করেছিলেন তিন মেয়ে?

0
293
বাবাকে হত্যায় অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় তিন মেয়েকে। ছবি: রয়টার্স

ক্রিস্টিনা, অ্যাঞ্জেলিনা ও মারিয়া তিন বোন। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে তাঁরা তিন বোন মিলে তাদের বাবাকে হত্যা করেন বলে অভিযোগ আছে। ঘটনার সময় বাবা মিখাইল খাচাতুরণ ঘুমিয়ে ছিলেন। তিন বোনের একজন হাতুড়ি, একজন ছুরি ও একজন পিপার স্প্রে নিয়ে তাঁর ওপর হামলা চালান। পরে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

বিবিসি অনলাইনের খবরে বলা হয়েছে, এমন ঘটনার পরও তিন বোনের প্রতি সমব্যথী রাশিয়ার মানুষ। তাদের মুক্তি চেয়ে ইতিমধ্যে প্রায় তিন লাখেরও বেশি স্বাক্ষর অনলাইনে জমা পড়েছে।

ঘটনাটি যখন ঘটে, তখন রাশিয়ায় ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল এটি। যে বিষয়টি মানুষকে বিস্মিত করে তা হলো—তিন বোন কেমন করে তাদের বাবাকে হত্যা করতে পারলেন? তবে তদন্তে বের হয়ে আসে ভেতরের কাহিনি। আর সেই কাহিনিটা মোটেও ভালো কিছু নয়।

ক্রিস্টিনা, অ্যাঞ্জেলিনা ও মারিয়া তাদের বাবার সঙ্গে থাকতেন। সবার ছোট ক্রিস্টিনার বয়স ছিল ১৭, অ্যাঞ্জেলিনার ১৮ ও মারিয়ার ১৯। ঘটনার দিন ২৭ জুলাই এক এক করে তিন মেয়েকেই নিজের ঘরে ডেকে নেন মিখাইল। ঘর কেন পরিষ্কার হয়নি কেন?—এ জন্য অনেক বকাঝকা করেন মেয়েদের। মারধরও করেন। এমনকি তাদের মুখে ‘পিপার স্প্রে’ নিক্ষেপ করেন। এরপর তিনি ঘুমিয়ে পড়লে মেয়েরা তাঁকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ও ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন। তাঁর শরীরে ৩০ বার ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে মেয়েরাই পুলিশ ডাকেন। তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

বাবার প্রতি মেয়েদের এত আক্রোশ কেন? কেবল ঘর পরিষ্কারের জন্য বকাঝকাই এই হত্যাকাণ্ডের কারণ? এমনটা ভাবতে পারছিল না পুলিশও। তদন্ত শুরু করে তারা। তদন্তে উঠে আসে এক ভয়াবহ পারিবারিক নির্যাতনের কাহিনি। তিন বছর ধরে নিয়মিত মেয়েদের পেটাতেন মিখাইল। এর আগে স্ত্রীকে নির্যাতন করে বাড়ি থেকে বের করে দেন তিনি। মায়ের সঙ্গে মেয়েদের যেতে দেননি। নানা ধরনের মানসিক নির্যাতন চলত মেয়েগুলোর ওপর। এমনকি তিন মেয়ের ওপরই যৌন নির্যাতন চালাতেন মিখাইল। এসব নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে মেয়েরা এই পথ বেছে নেন।

এই মর্মান্তিক ঘটনা জানার পর তাদের মুক্তির জন্য অনেকে এগিয়ে আসেন। মানবাধিকারকর্মীরা বলতে থাকেন, তাঁরা অপরাধী নন। ঘটনার শিকার এই তিন বোন। বাবার অত্যাচার থেকে বাঁচার কোনো পথ তাদের সামনে খোলা ছিল না। অন্যদিকে আইনের আশ্রয়ও তাঁরা নিতে পারেননি। কারণ রাশিয়াতে পারিবারিক সহিংসতা রোধে তেমন কোনো আইন নেই।

২০১৭ সালের আইন অনুযায়ী, পরিবারের সদস্যকে মারধর করেছেন, কিন্তু তাদের হাসপাতালে যাওয়ার মতো খারাপ অবস্থা করেননি—এমন অপরাধ প্রথম করলে তাঁর শাস্তি জরিমানা, সর্বোচ্চ দুই সপ্তাহ জেল হাজতে থাকা। রাশিয়ার পুলিশ সাধারণত পারিবারিক সহিংসতাকে ‘পারিবারিক বিষয়’ বলে চালিয়ে দেয়। বেশির ভাগ সময় নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি সাহায্যও পান না।

নিজের স্ত্রী অওরেলিয়া ডানডুককে মারধর করতেন মিখাইল। মারধর সহ্য করতে না পেরে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছিলেন অওরেলিয়া। তবে কোনো প্রমাণ না থাকায় পুলিশ তাঁকে কোনো সাহায্য করেনি। অওরেলিয়া ডানডুককে ২০১৫ সালে নিজের বাসা থেকে বের করে দেন মিখাইল। তিনি মেয়েদের নিতে চাইলেও তাঁকে দেওয়া হয়নি। মেয়েরা বাবার সঙ্গেই থাকতে থাকেন। তাঁরা নির্যাতনের কারণে মারাত্মক হতাশায় ভুগছিলেন।

এই মামলা খুব স্পর্শকাতর হওয়ায় খুবই ধীর গতিতে এর কার্যক্রম চলছে। মেয়েরা জেলে না থাকলেও কিছুটা নজরবন্দী অবস্থায় আছেন। কোনো সাংবাদিকের সঙ্গে তাদের কথা বলতে দেওয়া হয় না। অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ২০ বছরের সাজা হবে তাদের।

মেয়েদের আইনজীবী জানান, এই ঘটনা তাঁরা ঘটিয়েছেন আত্মরক্ষার্থেই। এটা বিবেচনায় নিয়ে তাদের মুক্তি দেওয়া উচিত। আইনজীবী আশা করছেন, তাঁরা মুক্তি পাবেন। কারণ তাদের বাবা যে তাদের ওপর নির্যাতন চালাতেন, সেটি প্রমাণ হয়েছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, মেয়ে তিনটি স্বেচ্ছায় তাদের বাবাকে হত্যা করেননি। বছরের পর বছর বাবার হাতে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে তাঁরা এমন পথ বেছে নেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.