কৃষ্ণার হাহাকার-বাকি জীবন কীভাবে কাটাব

0
455
কৃষ্ণা রানী চৌধুরীর

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) মায়ের শয্যাপাশে ছেলে কৌশিক চৌধুরী আর মেয়ে ঐশ্বরিয়া চৌধুরী ঈশিতা দাঁড়িয়ে।

তাদের ছলছল চোখ বারবারই চলে যাচ্ছিল মা কৃষ্ণা রানী চৌধুরীর বিচ্ছিন্ন পায়ের দিকে। পা হারানো কৃষ্ণা রানীকে ঘিরে স্বজনের আহাজারি থেমে থেমেই শোনা যাচ্ছিল। বিকেলের দিকে কিছুটা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরেই কৃষ্ণা রানী বুঝতে শুরু করেন কী নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে গেছেন তিনি! জেনে যান বাঁ পা কেটে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে তার শরীর থেকে।

৫২ বছর বয়সী কৃষ্ণা রানী বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) অর্থ বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক। গত মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর বাংলামটরে অফিসের উল্টোপাশের সড়কের ফুটপাত দিয়ে হাঁটছিলেন তিনি। ওই সময় ট্রাস্ট পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস বেপরোয়া গতিতে ফুটপাতে উঠে ধাক্কা দেয় তাকে। এতে বাসের সামনের অংশে তার বাঁ পা আটকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পঙ্গু হাসপাতালে ওই দিনই হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলেন চিকিৎসকরা।

গতকাল বুধবার সন্ধ্যার দিকে সাংবাদিকদের কাছে কৃষ্ণা রানী সেই দুর্ঘটনার রোমহর্ষক বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি জানান, অফিস শেষ করে সন্তানদের জন্য কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে টাকা তোলার জন্য বাংলামটরে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের শাখায় যাচ্ছিলেন। ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সময় ট্রাস্ট ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসের একটি বাস ব্রেক ফেল করে ফুটপাতে উঠে যায়। এ সময় তিনি নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেও তার পায়ের ওপর বাসের চাকা উঠে যায়। এ সময় অনেক রক্তক্ষরণ হতে থাকে। পথচারীরা হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাকে অর্থোপেডিক হাসপাতালে আনা হয়।

আক্ষেপ করে কৃষ্ণা রানী জানান, পা হারিয়ে তার সব স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেছে। জীবনের সব কিছু নষ্ট হয়ে গেছে। আর কখনও তিনি অফিসে যেতে পারবেন না- এমন আশঙ্কার কথা বলছিলেন বারবার। হাহাকারের সুরে কৃষ্ণা বলেন, ‘বাকি জীবন আমি কীভাবে কাটাব, কীভাবে চলাফেরা করব?’ এসব বলতে বলতে ব্যথায় আর্তনাদ করতে থাকেন তিনি।

এদিকে গতকাল কৃষ্ণা রানীকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন ট্রাস্ট ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসের মালিক সমিতির প্রতিনিধিরা। তারা পা হারানোর ক্ষতিপূরণ বাবদ তাকে দুই লাখ টাকা চিকিৎসা খরচ দিতে চেয়েছিলেন। তবে তার অফিস কর্তৃপক্ষ আর স্বজনরা সেই ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বুধবার রাজধানীর হাতিরঝিল থানায় মামলা করেছেন। বিআইডব্লিউটিসির পক্ষ থেকে দায়ের করা ওই মামলায় বাসমালিক, চালক ও হেলপারকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারে কারও নাম না থাকলেও জানা গেছে, দুর্ঘটনার সময় বাসটি চালাচ্ছিলেন মোরশেদ নামের এক চালক।

বিআইডব্লিউটিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম মিশা বলেন, তাদের একজন কর্মকর্তা নিরাপদ ফুটপাত দিয়ে হাঁটছিলেন। সেখানে বাস উঠিয়ে চাকায় পিষ্ট করে পা কেড়ে নেওয়া হলো। একদিন পর বাসমালিকদের প্রতিনিধিরা ক্ষতিপূরণ দিতে দুই লাখ টাকার প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন। বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান প্রণয় কান্তি বিশ্বাস সেটা প্রত্যাখ্যান করে হাতিরঝিল থানায় মামলার নির্দেশ দিয়েছেন।

কৃষ্ণা রানীর স্বামী অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক রাধে শ্যাম চৌধুরী বলেন, ‘আমার স্ত্রীর এমন পরিস্থিতিতে সন্তানদের সঙ্গে আমিও উদ্বিগ্ন। যে বাস কৃষ্ণার পা কেড়ে নিয়ে পঙ্গু করে দিল, সেই হারানো পায়ের মূল্য তারা দুই লাখ টাকা নির্ধারণ করেছে! এতে আমরা কষ্ট পেয়েছি। বিষয়টি বিআইডব্লিউটিসির ওপর ছেড়ে দিয়েছি।’

রাধে শ্যাম বলেন, ‘স্ত্রীর পায়ের দিকে তাকালে কান্না চেপে রাখতে পারি না। যে মানুষটা সকালে (মঙ্গলবার) চোখের সামনেই হেঁটে গোপীবাগের বাসা থেকে বের হলো, আর ওইদিনই তার একটি পা নেই! আমার স্ত্রীর তো কোনো দোষ ছিল না। ফুটপাত দিয়ে নিরাপদেই হাঁটছিল। এরপরও পা হারাতে হলো!’

কৃষ্ণার ছেলে কৌশিক চৌধুরী বেসরকারি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বিবিএ শেষ না করেই নারায়ণগঞ্জে গার্মেন্ট পণ্যের ব্যবসা শুরু করেছেন। মেয়ে ঈশিতা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে হিসাববিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে পড়েন।

কৌশিক চৌধুরী বলেন, ‘মায়ের পা নেই, পঙ্গু হয়ে গেছে, এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে আমাদের।’ তিনি জানান, পা কেটে ফেলার পর তার মায়ের জ্ঞান ছিল না।

বিআইডব্লিউটিসির প্রধান চিকিৎসক খন্দকার মাসুম হাসান জানান, পঙ্গু হাসপাতালের দোতলায় নারী ওয়ার্ডে ৪৭ নম্বর শয্যায় কৃষ্ণা রানীর চিকিৎসা চলছে। এমআরআই রিপোর্টে দেখা গেছে, মাথার আঘাত গুরুতর নয়। তবে বাঁ পায়ের বিচ্ছিন্ন অংশে প্রচণ্ড ব্যথা রয়েছে। চিকিৎসকরা তাকে সারিয়ে তোলার চেষ্টা করছেন।

এদিকে হাতিরঝিল থানার ওসি আবদুর রশিদ জানিয়েছেন, গতকাল বিকেলে বিআইডব্লিউটিসির উপসচিব বিপুল চন্দ্র বিশ্বাস বাদী হয়ে বাসমালিক, চালক ও হেলপারকে আসামি করে মামলা করেছেন। জনপথে বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে গুরুতর আঘাত ও অবহেলার ধারায় এই মামলা হয়েছে। তবে এজাহারে আসামিদের নাম না থাকায় তাদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। এ জন্য ট্রাস্ট ট্রান্সপোর্ট থেকে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হবে।

ওসি বলেন, ঘটনার দিনই বাসটি জব্দ করেছি আমরা। এর রেজিস্ট্রেশন নম্বর থেকেও মালিক ও চালককে শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

এদিকে ট্রাস্ট ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসের এক সুপারভাইজার আক্তার হোসেন বলেন, তাদের অফিসে চালক বা হেলপারের বায়োডাটা রয়েছে। পুলিশকে সব ধরনের সহায়তা করা হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে