কাশ্মীরে পুলিশের অভিনব নিষেধাজ্ঞা

0
160
হত্যার ঘটনার প্রতিবাদে সাম্প্রতিক সময়ে কাশ্মীরে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশের ছবি। রয়টার্স ফাইল ছবি

কাশ্মীরে স্বাভাবিকতা ফেরা ও তৈলাক্ত বাঁশে বাঁদরের ওঠানামার অঙ্ক প্রায় সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদ্বিগ্ন প্রশাসন তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, স্বাভাবিকতা না ফেরা পর্যন্ত উপত্যকার কোথাও কোনো রকমের সমাবেশ, ধরনা, শান্তিপূর্ণ অবস্থান অথবা বিক্ষোভ দেখানো যাবে না। উপত্যকার পুলিশ এই নির্দেশ জারি করেছে।

এই অভিনব নিষেধাজ্ঞা জারির কারণ উপত্যকার এক দল নারীর বিক্ষোভ সমাবেশ। শ্রীনগরের প্রাণকেন্দ্র লাল চকের অদূরে প্রতাপনগরে গত মঙ্গলবার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লার স্ত্রী ও বোন এবং রাজ্যের প্রধান বিচারপতি বশির আহমেদ খানের স্ত্রী হাওয়া বশিরসহ সমাজের প্রতিষ্ঠিত নারীরা রাজ্যের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার ও খণ্ডিতকরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। শান্তিপূর্ণ ওই প্রতিবাদের সময় তাঁদের হাতে ছিল সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে লেখা পোস্টার। পুলিশ কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁদের গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যান। সেখান থেকে জেলখানায়। পরে মুচলেকা লিখিয়ে তাঁদের ব্যক্তিগত জামিনে ছেড়ে দেওয়া হয়। ওই বিক্ষোভ ও গ্রেপ্তারির খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। উপত্যকার পরিস্থিতি যে স্বাভাবিক নয় এবং সরকারি সিদ্ধান্ত যে সেখানকার শান্তিপ্রিয় মানুষ অনুমোদন করছেন না, ওই বিক্ষোভে তা আরও একবার প্রমাণিত হয়। সরকারের দাবি যে অসাড়, প্রমাণিত হয় তাও।

জম্মু-কাশ্মীর পুলিশের মহাপরিচালক দিলবাগ সিং সংবাদ সংস্থা এনডিটিভি-কে জানিয়েছেন, এই ধরনের বিক্ষোভ সমাবেশের অনুমতি দেওয়ার আগে আমরা চাই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক করে তুলতে। তার আগে কোথাও কাউকে আর কোনো রকমের বিক্ষোভ বা প্রতিবাদ করতে দেওয়া হবে না। তা সে শান্তিপূর্ণ ধরনা বা অবস্থান যাই হোক না কেন। দিলবাগ বলেন, নারী বিক্ষোভকারীদের হাতে এমন কিছু পোস্টার ছিল যা আপত্তিজনক। প্ররোচনামূলক। তাঁর ব্যাখ্যা, মানুষ শুধু ভাষণেই প্ররোচিত হয় না, পোস্টার প্ল্যাকার্ড দেখে-পড়েও হতে পারে। তাই এই সাবধানতা।

নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা অবরুদ্ধ কাশ্মীর উপত্যকার বয়স প্রায় ৮০ দিন হতে চলল। এখনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক নেতারা বন্দী। ধরপাকড় চলছে নিত্য। স্বাভাবিকতা ফেরাতে ধীরে ধীরে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলেও পরিস্থিতি যে কে সেই। স্কুল-কলেজ খুলেছে, পড়ুয়াদের দেখা নেই। বাধ্য হয়ে পরীক্ষার দিন ঘোষণা হয়েছে। কিন্তু বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে মা-বাবারা রাজি নন। কেউই নিরাপদ মনে করছেন না। নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে দোকান-বাজার খোলা রাখতে কেউ সাহস পাচ্ছেন না। পর্যটকদের আসতে বলা হচ্ছে। বড় বড় বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। পর্যটকের সংখ্যা কিন্তু হাতে গোনা। ফোনের ল্যান্ড লাইন প্রথমে চালু হয়। তার পর পোস্ট-পেইড মোবাইল পরিষেবা। অবস্থা তাও স্বাভাবিকতার ধারেকাছে পৌঁছায়নি। এখন গাছে গাছে লাল আপেল। ব্যবসায়ীরা রপ্তানির প্রতীক্ষায়। অথচ তাঁরা আতঙ্কে। তিন ট্রাক চালক খুন হয়েছেন। বাইরে থেকে ট্রাক আসতে চাইছে না। চালকদের নিরাপত্তার জন্য সাম্প্রতিকতম দাওয়াই, বড় ট্রাক মূল সড়কে থাকবে। গ্রাম থেকে ছোট ছোট গাড়িতে আপেল এনে বড় রাস্তায় ট্রাক বোঝাই করা হবে। পুলিশি নিরাপত্তায় সেগুলো উপত্যকার বাইরে নিয়ে যাওয়া হবে। বাইরের রাজ্যের শ্রমিকদেরও সন্ত্রাসবাদীরা খুন করেছে। প্রশাসনও সন্ত্রাসবাদীদের হত্যার কথা জানাচ্ছে। ছোট-বড় যে কোনো ঘটনা এক একটা অঞ্চলকে মুড়ে দিচ্ছে নিরাপত্তার ঘেরাটোপে। আজ যে এলাকা শান্ত, কাল যে তা অশান্ত হয়ে উঠবে না তার নিশ্চয়তা নেই।

অবরুদ্ধ উপত্যকার বয়স ৮০ হতে চলেছে। অথচ পরিস্থিতি সেই অতি পরিচিত তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে বাঁদরের ওঠা নামার অঙ্কের মতো।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে