কলেজে আইসিটি বিষয় আছে, শিক্ষক নেই

0
233
ছবি: ডেইলি স্টারের সৌজন্যে

উচ্চমাধ্যমিকে তথ্য ও যোগাযোগ (আইসিটি) বিষয়টি চালু হয়েছে সাড়ে ছয় বছর আগে। আজ পর্যন্ত সরকারি কলেজগুলোতে এ বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগ করা হয়নি। বেসরকারি কলেজগুলোর অবস্থাও করুণ। অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষকেরা কম্পিউটারের মৌলিক বিষয়ে টুকটাক প্রশিক্ষণ নিয়ে যেনতেনভাবে পড়াচ্ছেন। ফলে হাতে–কলমে না শিখে এই বিষয়ের শিক্ষার্থীরা মুখস্থবিদ্যায় ঝুঁকছে।

সরকার ২০১৩ সালে তোড়জোড় করে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির সব শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে আইসিটি চালু করে। সরকারি কলেজের জন্য এ বিষয়ে পদ তৈরি করতেই প্রথম দুই বছর কেটে যায়। বেসরকারি কলেজে পদ তৈরি হয়েছে ২০১৮ সালে।

সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ২০১৬ সালে সরকারি কলেজে ২৫৫টি পদে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল। সেই নিয়োগপ্রক্রিয়াই শেষ হয়নি। তবে বেসরকারি কলেজে গত বছর কয়েক শ শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন। আইসিটি–সংশ্লিষ্ট ডিগ্রিধারীরা বলেছেন, পদ তৈরি ও নিয়োগে কচ্ছপগতির জন্য তাঁরা কলেজে পড়ানোর ব্যাপারে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় উপকমিটির হিসাবে, দেশে এখন ৬৩৪টি সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চমাধ্যমিক পড়ানো হয়। আর বেসরকারি পর্যায়ে উচ্চমাধ্যমিকের জন্য আছে প্রায় ৬ হাজার ৫৭৪ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মানবিক, বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখার একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে প্রায় ২৬ লাখ ছেলেমেয়ে পড়ছে। প্রত্যেককেই আইসিটি পড়তে হয়।

আইসিটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল ২০১২ সালের জাতীয় শিক্ষাক্রমে। সে সময় শিক্ষাক্রম উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগের তৎকালীন প্রধান সুরাইয়া পারভীন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কমিটিকে বলেছিল, শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে বিষয় চালু করবে। আরও কথা ছিল, তখনকার ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা একাদশ শ্রেণিতে উঠলে আইসিটি চালু হবে। তাঁর মতে, হুট করে বিষয়টি চালু করা ঠিক হয়নি।

কারা পড়াচ্ছেন আইসিটি

দেশের ৮ বিভাগের মোট ২০টি বড় সরকারি কলেজের অধ্যক্ষদের সঙ্গে কথা বলেছে। জানতে চেয়েছে, কলেজগুলোতে আইসিটি বিষয়টি কারা পড়াচ্ছেন। দেখা গেছে, মাত্র একটি কলেজে দুজন অতিথি শিক্ষক আছেন, যাঁরা এই বিষয়ে ডিগ্রিধারী। অন্যগুলোতে এমনকি বাংলা, ইংরেজি, দর্শন এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির শিক্ষকেরাও আইসিটি পড়াচ্ছেন। কিছু কলেজে পড়াচ্ছেন অর্থনীতি, হিসাববিজ্ঞান, ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা, রসায়ন, উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা, পদার্থবিজ্ঞান বা গণিতের শিক্ষকেরা।

এই শিক্ষকেরা কয়েক মাসের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। বগুড়া সরকারি শাহ সুলতান কলেজে পাঁচজন শিক্ষক আইসিটি পড়ান। তাঁদের দুজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক। বাকিরা অর্থনীতি, গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক। সিলেট এমসি কলেজে আইসিটি পড়ান বাংলা, দর্শন, অর্থনীতি, রসায়ন, উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যাসহ বিভিন্ন বিষয়ের ১১ জন শিক্ষক।

রংপুর কারমাইকেল কলেজে আইসিটি পড়ান হিসাববিজ্ঞান, অর্থনীতি, ব্যবস্থাপনা, পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতের শিক্ষকেরা। গোপালগঞ্জে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কলেজে আইসিটি পড়ান বাংলা, ইংরেজি, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, দর্শন আর জীববিজ্ঞানের শিক্ষকেরা।

ঝালকাঠি সরকারি কলেজে আইসিটি পড়ান রসায়নের শিক্ষক। ফেনী সরকারি কলেজে পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতের শিক্ষক আইসিটি পড়াচ্ছেন। কলেজগুলোর মধ্যে একমাত্র চট্টগ্রামের হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ আইসিটি পড়ানোর জন্য কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক দুজন অতিথি শিক্ষক নিয়েছে। অধ্যক্ষ অঞ্জন নন্দী বলেন, শিক্ষকের অভাবে কলেজগুলো শিক্ষার্থীদের মানসম্পন্ন শিক্ষা দিতে পারছে না। জরুরি ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া দরকার।

কানাই লাল সরকার খিলগাঁও মডেল কলেজের অধ্যক্ষ। তিনি বেসরকারি শিক্ষকদের সংগঠন বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতির (বাকশিস) একাংশের অতিরিক্ত মহাসচিব। তিনি বলেন, একে তো কলেজগুলোতে শিক্ষকের সংকট, তদুপরি অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের দিয়ে আইসিটি পড়াতে হচ্ছে। ফলে দায়সারাভাবে শিক্ষার্থীদের পড়ানো হচ্ছে।

উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষকদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুজন প্রশিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা বলেছেন, বেশির ভাগ প্রশিক্ষণার্থীরই কম্পিউটারের মৌলিক বিষয় সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা থাকে না। সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ নিয়ে শিক্ষার্থীদের তাঁরা প্রযুক্তির ব্যাকরণ শেখানোর যোগ্যতা অর্জন করতে পারছেন না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেনও বলেন, ‘বইয়ে যে বিষয়বস্তু দেখেছি, তা এভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে পড়ানো প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। এতে হিতে বিপরীত হবে।’

সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ

আইসিটি প্রভাষকের পদ তৈরি হলে নিয়োগের জন্য পিএসসি ২০১৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি ৩৮তম বিসিএসে দরখাস্ত আহ্বান করে। সেই প্রথম ও সেই শেষ। শিক্ষা ক্যাডারে আইসিটির জন্য পদের সংখ্যা ছিল ২৫৫।

পিএসসির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, সেবার খুব কম শিক্ষার্থী আবেদন করেছিলেন। প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় পাস করেন ৭২ জন। লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন ৬৬ জন। পাস করেন মাত্র ৫ জন। তাঁরা সদ্য মৌখিক পরীক্ষা দিয়েছেন।

তবে এ পাঁচজন সরকারি চাকরির সাধারণ ক্যাডারেও আবেদন করেছেন। তাই চূড়ান্ত পাস করলেও তাঁরা যে আইসিটি শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই।

৩৯তম বিশেষ বিসিএস ছিল শুধু স্বাস্থ্য ক্যাডারের জন্য। ২০১৮ সালে ৪০তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি দেয় পিএসসি। এতে সারা দেশের সাধারণ সরকারি কলেজ ও সরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজে বিভিন্ন বিষয়ে ৮৭০টি শূন্য পদ পূরণের বিজ্ঞপ্তি ছিল। তবে এর মধ্যে আইসিটির উল্লেখ ছিল না। গত বছর ৪১তম বিসিএসে শিক্ষকের পদ ছিল ৯০৫টি, এগুলোর ১টিও আইসিটির নয়।

প্রথম পাঁচ বছর বেসরকারি কলেজের জনবলকাঠামোতে আইসিটি প্রভাষকের বিষয়টি ছিল না। তবে আইসিটি পড়ানোর জন্য ন্যূনতম ছয় মাসের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ লাগত। ২০১৮ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বেসরকারি স্কুল ও কলেজের জনবলকাঠামো এবং এমপিও নীতিমালা করে। সেখানে প্রতি কলেজে একজন করে আইসিটি প্রভাষকের পদ যুক্ত করা হয়। পরের বছর সারা দেশে মোট ৪৬৫ জন আইসিটি প্রভাষক নিয়োগ দেওয়া হয়। অর্থাৎ এখন ৭ শতাংশ বেসরকারি কলেজে বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রাপ্ত শিক্ষক আছেন।

স্নাতকেরা আগ্রহী নন

দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শর বেশি সিএসই বা আইসিটি-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক পাস ছেলেমেয়ের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁরা কিন্তু কলেজে আইসিটি প্রভাষকের চাকরিতে আগ্রহী নন। তাঁদের ক্ষেত্রে দেশে–বিদেশে ভালো বেতন আর সুযোগ–সুবিধার চাকরি আছে। বেশির ভাগই সেগুলোর জন্য চেষ্টা করতে চান।

কেউ যদি–বা শিক্ষক হতে চান, সরকারি কলেজে নিয়োগের দীর্ঘসূত্রতার কারণে পিছিয়ে যান। সাধারণত একটি বিসিএস পরীক্ষার আবেদন থেকে শুরু করে চূড়ান্ত নিয়োগ পর্যন্ত প্রায় দুই বছর সময় লাগে। অথচ সিএসই স্নাতকেরা পাস করেই, কখনো পাসের আগেও সফটওয়্যার কোম্পানিতে চাকরি পেয়ে যান। কয়েকজন বলেছেন, সংকটের বিবেচনা থেকে এখন আলাদা করে পরীক্ষা নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগের ব্যবস্থা করতে পারে সরকার।

শিক্ষক নিয়োগ না দিয়ে বিষয় চালু করা এবং শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির বিষয়ে জানতে চাইলে মাউশির মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) শাহেদুল খবীর চৌধুরী বলেন, সরকারি কলেজে অনুমোদন সাপেক্ষে এ বিষয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক নেওয়ার সুযোগ আছে। তবে বিসিএস পরীক্ষা ছাড়া পুরোপুরি শিক্ষক নিয়োগের উপায় নেই। আইসিটিসহ অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগের জন্য বিশেষ বিসিএসের বিষয়ে আলোচনা চলছে।

ভোগান্তির নানা রূপ

বেশ কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জেনেছে, কলেজে ব্যবহারিক করানো হয় খুব কম। কিছু কলেজে কম্পিউটার ল্যাবই নেই। থাকলেও শিক্ষার্থী বেশি থাকায় সমস্যার কথা বলে নিয়মিত ক্লাস হয় না।

অভিজিৎ পাল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) সিএসই বিভাগে চতুর্থ বর্ষে পড়ছেন। কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ে দেশসেরা হয়ে গত বছর বিশ্ব আসরে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘কলেজে পড়ার সময় শিক্ষকদের বলতে শুনেছি, ইন্টারনেট নেই, তাই এইচটিএমএল বা প্রোগ্রামিং কোড করা যাবে না। অথচ এগুলো করতে ইন্টারনেট লাগে না।’

এনসিটিবির শিক্ষাক্রম বা পাঠ্যসূচি অনুযায়ী, আইসিটির ব্যবহারিক শিক্ষার নম্বর শিক্ষার্থীদের নিজ কলেজ দিয়ে থাকে। এরপর প্রাপ্ত গড় নম্বর এইচএসসি পরীক্ষার আগে সংশ্লিষ্ট কলেজ শিক্ষা বোর্ডে পাঠায়। তাই উচ্চমাধ্যমিকের সময় আলাদা করে এ বিষয়ে ব্যবহারিক পরীক্ষা দিতে হয় না। কয়েকজন শিক্ষার্থী আর অভিভাবক বলেছেন, কলেজের শিক্ষকেরা ব্যবহারিক পরীক্ষার খাতায় ভুল লিখলেও সঠিক গণ্য করে নম্বর দেন।

ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নামকরা সরকারি–বেসরকারি কলেজের ২০ জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে তাদের ব্যবহারিক খাতা সংগ্রহ করে দেখা গেছে, ভুল প্রোগ্রামকেও সঠিক দেখিয়ে শিক্ষকেরা স্বাক্ষর করেছেন।

এর উল্টো ঘটনাও ঘটতে দেখা যায়। একাদশ শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় সিলেট এমসি কলেজের অন্তত পাঁচ শিক্ষার্থীর সঠিক কম্পিউটার প্রোগ্রামকে ‘ভুল’ বলে শূন্য দিয়েছেন আইসিটি শিক্ষক। যদিও লেখা প্রোগ্রামটি সঠিক ছিল। বাংলার ওই শিক্ষক প্রশিক্ষণ নিয়ে আইসিটি পড়ান।

আইসিটির একটি প্রোগ্রাম বিভিন্নভাবে লেখা যায়। সৃজনশীলতার বিকাশে দুনিয়াজুড়ে শিক্ষার্থীদের তা করতে উৎসাহ দেওয়া হয়। এমসি কলেজের ওই পাঁচ ছাত্র কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পদকও পেয়েছেন। এমন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন উপায়ে প্রোগ্রাম করতে অভ্যস্ত।

জাতীয় প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় পদকজয়ী অন্তত পাঁচজন শিক্ষার্থী বলেছেন, অন্য বিষয় থেকে আসা শিক্ষকেরা প্রোগ্রামিং পড়েননি বা অনুশীলন করেননি। তাঁরা বইয়ের গতানুগতিক প্রোগ্রামকেই কেবল সঠিক মনে করেন। ফলে একদিকে ছেলেমেয়েরা পুরো বিষয়টি ভালোভাবে শিখতে পারছে না, অন্যদিকে যাঁরা সৃজনশীল, তাঁরা দমে যাচ্ছেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে