করোনাকালে বিজ্ঞান গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ুক

0
85
ভ্যাকসিন তৈরিতে কাজ করছেন গবেষকেরা। ছবি: রয়টার্স

ইম্পিরিয়াল কলেজের অনেকগুলো ক্যাম্পাস। লন্ডনে, লন্ডনের বাইরে। আমার কাজের জায়গা ছিল হ্যামারস্মিথ হাসপাতালে। মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের গবেষণা প্রতিষ্ঠান। প্রায় দিনই কাজ শেষ হতে রাত ৯টা বেজে যেত। অনেকের তখনো শেষ হতো না। প্রতিটি ফ্লোরে একটা বসার জায়গা; সঙ্গে বেশ কয়েকটি সোফা। একটু সকালে অফিসে গেলে প্রায়ই দেখা যেত, সোফাটা বেড হয়ে গেছে। শুয়ে আছে দু-একজন। সারা রাত কাজ করে।

বিশ্বের অধিকাংশ গবেষণাগারের চিত্রটা একই রকম। শীতের রাত, চারদিকে বরফ। ল্যাবগুলোর লাইট নেভে না। দিন ও রাতের পার্থক্য নেই। অনেক ক্ষেত্রেই ল্যাবগুলো হয়ে যায় বাড়ি। এখানে প্রতিনিয়ত চলে লড়াই। তত্ত্বের সঙ্গে তথ্য-উপাত্তের। তথ্য ও উপাত্তই শেষ কথা। আরেকটি পরীক্ষা চলে প্রতিনিয়ত—নিজের সঙ্গে, ধৈর্য আর অধ্যবসায়ের সঙ্গে।

করোনাভাইরাসের বিশ্বব্যাপী প্রাদুর্ভাবে বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীদের প্রতি মানুষের অশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অধ্যাপক সারা গিলবার্ট, ড. অ্যান্থনি ফাউচি এখন ঘরে ঘরে পরিচিত নাম। মহামারি ও মহাযুদ্ধের সময় বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীদের নিয়ে আগ্রহ তৈরি হওয়া নতুন নয়। জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা জন্য বিজ্ঞানের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। সংকটের সময় এই সত্য সমাজের মনে পড়ে, মনে পড়ে দেশনায়কদের। সংকট কেটে গেলে কমতে শুরু করে গুরুত্ব।

বিজ্ঞানকে যাঁরা এগিয়ে নিয়ে যান, সেই বিজ্ঞানীরা এক দিনে তৈরি হন না। স্নাতক, স্নাতকোত্তর, পিএইচডি; অর্থাৎ প্রায় ২২ বছরের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিতে হয়। অধিকাংশ দেশেই প্রথাগত গবেষণা করার জন্য এই যোগ্যতাগুলো অপরিহার্য। কী ভাবছেন? এতগুলো ডিগ্রি, বড় বেতনের চাকরি নিশ্চয়ই নিশ্চিত? নিশ্চিত, তবে মেয়াদ মাত্র তিন বছর; বড় জোর পাঁচ বছর। গবেষণার বেশির ভাগ কাজ হয় বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারি গবেষণাগারে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে চলে গবেষণাগুলো। সাধারণত তিন বা পাঁচ বছর মেয়াদি এই বরাদ্দগুলো দেওয়া হয় প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানীদের। আমেরিকা ও ইউরোপে খুব ছোট মাপের গবেষণা বরাদ্দের জন্যও তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। একটি গবেষণা বরাদ্দের প্রস্তাব তৈরি করতে লাগে কয়েক মাস। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই না পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

নামকরা বিজ্ঞানী আপনি। জগৎজোড়া আপনার নাম। গবেষণা বরাদ্দের জন্য আপনাকেও এই একই পথ অবলম্বন করতে হবে। অধিকাংশ গবেষণাগারের প্রধান বিজ্ঞানী ও তাঁর সহযোগীরা বছরের একটি বড় সময় ব্যয় করেন গবেষণা বরাদ্দের আবেদনের পেছনে। এই বরাদ্দগুলো থেকে পাওয়া অর্থে নিয়োগ দেওয়া হয় গবেষকদের, কেনা হয় গবেষণা সরঞ্জাম। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই নিয়োগের মেয়াদ তিন থেকে পাঁচ বছর। এই নিয়োগের মাধ্যমেই পিএইচডি করা গবেষকেরা শুরু করেন তাঁদের একাডেমিক ক্যারিয়ার বা জীবনযুদ্ধ। বেতন কেমন? যোগ্যতা অনুযায়ী অনেক কম।

তিন বা পাঁচ বছরের মধ্যে এই গবেষকদের গবেষণা শেষ করতে হয়। এর মধ্যেই এক বা একাধিক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করতে হয় নামকরা বিজ্ঞান সাময়িকীগুলোতে। যত নামকরা সাময়িকীতে প্রকাশ করা যাবে প্রবন্ধ, ক্যারিয়ারের জন্য ততই মঙ্গল। বলে রাখি, নামকরা সাময়িকীতে গবেষণাপত্র প্রত্যাখ্যানের সম্ভাবনা ৯৯ শতাংশ।

তরুণ এই গবেষকদের এর মধ্যেই শুরু করতে হয় পরবর্তী চাকরি খোঁজার কাজ। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী চাকরি বা নিজের গবেষণার অর্থায়নের জন্য আবেদন চালিয়ে যেতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পছন্দ করে যাঁদের নামকরা বিজ্ঞান সাময়িকীতে একাধিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে বা আছে নিজের গবেষণা বরাদ্দ, তাঁদের।

প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানীদের উপরও থাকে একই ধরনের চাপ। বিজ্ঞান গবেষণাগুলোতে দরকার বড় ধরনের নিরবচ্ছিন্ন অর্থায়ন। বিশ্বের প্রায় সব দেশে বিজ্ঞান গবেষণায় গত ২০ বছর ধরে বরাদ্দ কমেছে। তৈরি হয়েছে তীব্র প্রতিযোগিতা। করোনা–পরবর্তী বিশ্বে এই খাতে বরাদ্দ বাড়বে বলেই মনে হয়। আর্থিক মন্দা ও ভবিষ্যতে মহামারি, জীবননাশী রোগ মোকাবিলায় নিবিড় বৈজ্ঞানিক গবেষণা ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই।

ধারণা করা হচ্ছে, জীববিজ্ঞান আর শরীরতত্ত্বের গবেষণায় উন্নত দেশগুলো গুরুত্ব দেবে আগামী দিনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যেমন বিনিয়োগ হয়েছিল মহাকাশবিজ্ঞানে, ঠিক তেমনি। জার্মানি ইতিমধ্যেই ১৮ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত গবেষণা বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছে। আমেরিকায় এর পরিমাণ চার বিলিয়ন ডলার।

আমেরিকার কয়েকজন আইনপ্রণেতা প্রস্তাব করেছেন, আগামী পাঁচ বছর বিজ্ঞান গবেষণায় বরাদ্দ ৮ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ১০০ বিলিয়ন ডলার করার। আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যয় বছরে প্রায় ৭২১ বিলিয়ন ডলার। ব্রিটিশ সরকার গবেষণা বরাদ্দ বছরে ১১ বিলিয়ন থেকে বাড়িয়ে ২০২৪ সাল নাগাদ ২৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বলে রাখা দরকার ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা ব্যয় বছরে ৫০ বিলিয়ন ডলার।

এখন এই যে নতুন করে গবেষণা বরাদ্দের কথা বলা হচ্ছে, এর একটা বড় অংশ ব্যয় হবে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ রোগের গবেষণায়। ফলে ক্যানসার বা অ্যালঝেইমার বা পারকিনসন্সের মতো রোগ নিয়ে গবেষণার বরাদ্দ কমে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের সাবেক প্রধান ইলিয়াস যারহোনি।

অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, ইম্পিরিয়াল, হার্ভার্ড বা এমআইটির মতো নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা বরাদ্দের ক্ষেত্রে অলিখিত সুবিধা পেয়ে থাকে। করোনার ভ্যাকসিন তৈরিতে এগিয়ে রয়েছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ইম্পিরিয়াল কলেজ। এই ধারা হয়তো অব্যাহত থাকবে। মৌলিক ও ব্যবহারিক বিজ্ঞানের সব ক্ষেত্রেই গবেষণা বরাদ্দ জরুরি। গবেষণাক্ষেত্রে অর্থায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বৈশ্বিক মহামারির এই সংকটের মুহূর্তে এই নিয়ে সবার মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীদের নিয়ে এই উৎসাহ, এই আগ্রহ অব্যাহত থাকুক করোনা-পরবর্তী বিশ্বেও; নিশ্চিত হোক নিরবচ্ছিন্ন বিজ্ঞান বরাদ্দ।

লেখক: ড. সুব্রত বোস, প্রবাসী বাংলাদেশি ও বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালস অ্যানালাইটিকসের গ্লোবাল প্রধান
subratabose01@yahoo.com

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে