করোনাকালে একটি ফোনকলেই ওরা হাজির

0
203
রোগীকে বাসা থেকে এনে হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থাসহ চিকিৎসা সেবা পেতে সহায়তা করে যাচ্ছে ইউএইচডিপি। ছবি : সংগৃহীত

শর্মী মাহমুদের বাবা-মা নারায়ণগঞ্জে থাকেন। সঙ্গে থাকে ভাইয়ের বউ ও সন্তান। দিন ১৫ আগে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তাঁর বাবা। শরীরে করোনাভাইরাসের কিছু উপসর্গ ছিল। ভাই দেশের বাইরে, আরেক বোনও বিদেশে এবং ঢাকায় থাকেন শর্মী মাহমুদ। বাবাকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার মতো কেউ ছিল না। তখন শর্মীর পরিবার যোগাযোগ করে ইউনাইটেড হেলথ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (ইউএইচডিপি) ওসমান জামালের সঙ্গে। এই সংগঠনের সহায়তায় শর্মীর বাবা ও মা হাসপাতালে ভর্তি হন, চিকিৎসা পান। ওসমান জামাল জানান, ০১৮৭৭৯৭৭১০০ নম্বরে ফোন করেই করোনা আক্রান্তসহ সব ধরনের রোগীকে স্বাস্থ্য সেবা পেতে সহায়তা করবে ইউএইচডিপি।

চার মাসের বেশি সময় ধরে বিশ্বে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ শুরু হয়েছে। সারা বিশ্বই এ ভাইরাসের আক্রমণে পর্যুদস্ত। বাংলাদেশে এর প্রথম সংক্রমণের খবর সরকার জানায় ৮ মার্চ। আজ শুক্রবার পর্যন্ত শনাক্ত হয়েছেন ১ হাজার ৮৩৮ জন এবং মারা গেছেন ৭৫ জন। আক্রান্ত কারও সংস্পর্শে এলেই এ ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। তাই ন্যূনতম কোনো উপসর্গ থাকলে ওই মানুষগুলোর ধারেকাছে কেউ ঘেঁষতে চায় না। নির্দিষ্ট হাসপাতাল বাদে অন্য কোথাও চিকিৎসাও মেলে না। আবার অনেকে সঠিকভাবে জানেও না কীভাবে কী করতে হবে। এ জন্য অনেককেই ভোগান্তি পোহাতে হয়।

এই চিকিৎসা সেবাটুকু পেতে সহায়তার জন্য কাজ করে যাচ্ছে ইউনাইটেড হেলথ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (ইউএইচডিপি)। স্বেচ্ছাসেবাভিত্তিক এ প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা ওসমান জামাল। তাঁর সঙ্গে আছেন আরও ১১ জন।

ওসমান জামাল বলেন, ‘বাসায় অসুস্থ কেউ হলে অনেক সময় দেখা যায় হাসপাতালে নেওয়ার কেউ থাকে না বা স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার জন্য বিভিন্ন সহায়তার দরকার পড়ে। কারও যদি হাসপাতালে যেতে হয়, কিন্তু পারছে না, বা নিয়ে যাওয়ার কেউ নেই। আমরা সেই ব্যবস্থাটা করে দিই। আমাদের হটলাইনে ফোন করলে ওই ব্যক্তির আশপাশে আমাদের যে স্বেচ্ছাসেবী আছেন তিনি তাঁকে সহায়তা করবেন।’

২০১৯ সালের শেষ থেকেই স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা করতে থাকেন ওসমান জামাল। এর মধ্যেই করোনাভাইরাস চলে এলো। ওসমান জামাল জানান, এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠনটি চালু করতে পারেননি। তবে কাজ শুরু হয়ে গেছে।

ইউএইচডিপির সঙ্গে যোগাযোগ করার ঠিকানা।ইউএইচডিপির সঙ্গে যোগাযোগ করার ঠিকানা।

ইউএইচডিপি স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিতে চলে। কেউ এর স্বেচ্ছাসেবক হতে চাইলে ফেসবুক পেজে যোগাযোগ করলে কথা বলে বাছাই করা হয়। এ ছাড়া তিনজন চিকিৎসকও রয়েছেন যাঁরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ফোনে পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

এই সংগঠন থেকে সেবা পাওয়া শর্মী মাহমুদের বাবা-মা দুজনেই সুস্থ আছেন। তিনি শোনান কীভাবে ইউএইচডিপি তাঁদের সহায়তা করেছে। শর্মী মাহমুদ বলেন, ‘ওরা নারায়ণগঞ্জ থেকে আব্বাকে কুয়েত-মৈত্রীতে নিয়ে যায়। সেখানে টেস্ট করানোর পর রেজাল্ট নেগেটিভ আসে। যেহেতু আব্বা অসুস্থ ছিল, ওরা বারডেমে নিয়ে ভর্তি করে দেয়। বাবা সুস্থ হলে তাঁকে বাসায় দিয়ে আসে। কিন্তু আমার মায়ের পজিটিভ হয়। কিছুদিন পড়ে আবার টেস্ট করলে মায়েরও নেগেটিভ আসে। ওরা আম্মাকে বাসায় দিয়ে আসে।’

শর্মী মাহমুদ বলেন, ‘গত ১৫ দিন আমাদের ওপর দিয়ে যে কী গেছে, তা বোঝাতে পারব না, ওরা পাশে এসে না দাঁড়ালে কী করতাম জানি না। কোনো স্বজন পাশে পাইনি। চারদিকে নানান গুজব রটে যায়। এলাকা থেকেও মানুষের ভালো আচরণ পাইনি। আমার বাবা পল্লি চিকিৎসক। বাবা অনেককে সাহায্য করেছেন। কিন্তু একজন মানুষও পাইনি পাশে দাঁড়ানোর। একটা স্যালাইন দেওয়ার লোক পাইনি। পড়ে ওরাই একজনকে ঠিক করে দেয়।’

রাজধানীর লালবাগে একজনের করোনাভাইরাসের লক্ষণ দেখা দিলে তাঁর ভাগনের পরিবার করোনা টেস্ট করানোর জন্য নানান দিকে যোগাযোগ করতে থাকেন। কিন্তু কোথাও থেকে সাহায্য পাননি। পরে ওই ব্যক্তির ভাগনে বউ ফেসবুকে ইউএইচডিপির কথা জানতে পারেন। তাঁদের সঙ্গে ০১৮৭৭৯৭৭১০০ নম্বরে যোগাযোগ করলে তাঁরা তাঁর মামা শ্বশুরকে হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করে দেয়। ওই ব্যক্তির পরীক্ষায় করোনা নেগেটিভ আসে। তাঁর ভাগনে বউ ইউএইচডিপির কাজে মুগ্ধতা প্রকাশ করে বলেন, ‘যখন কোথাও থেকে কোনো সাহায্য পাচ্ছিলাম না তখন ওরা পাশে দাঁড়িয়েছে । শুধু আনুষঙ্গিক খরচের টাকা বাদে একটি পয়সাও নেয়নি।’

ইউএইচডিপির উদ্যোক্তা ওসমান জামাল জানান, তাঁরা বিনা মূল্যে এই সেবা দিয়ে থাকেন। শুধু আর্থিকভাবে সচ্ছল হলে অ্যাম্বুলেন্স খরচটা নেন। তাদের স্বেচ্ছাসেবক আছেন ৪৫০ জন। এদের প্রাথমিক বিষয়ে ধারণা দেওয়া হয়। মাঠে গেলে প্রত্যেককে নিরাপত্তা সুরক্ষা সামগ্রী দেওয়া হয়। তবে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব কমলে তাঁরা সবাইকে ভালোভাবে প্রশিক্ষণ দেবেন বলে জানান ওসমান।

ওসমান জামাল বলেন, তাঁরা বিভিন্ন ধরনের রোগীর কাছ থেকে ফোন পেয়ে থাকেন। দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় এর উপসর্গ থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকেও প্রচুর ফোন পান। এসব ব্যক্তিকেও তাঁরা সেবা দিয়েছেন।

স্বেচ্ছাসেবাভিত্তিক এই সংগঠনের একজন স্বেচ্ছাসেবক। ছবি : সংগৃহীতস্বেচ্ছাসেবাভিত্তিক এই সংগঠনের একজন স্বেচ্ছাসেবক। ছবি : সংগৃহীত

ইউএইচডিপির প্রজেক্ট ডিরেক্টর সাজ্জাদ মিঠু অনেক রোগীর বাসায় গিয়ে হাসপাতালে আনা-নেওয়ার কাজ করেছেন। তিনি বলেন, ‘কিছুদিন আগে বকশীবাজার থেকে কল পাই। ওই পরিবারের একজন আক্রান্ত ছিলেন। কিন্তু কোথাও ভর্তি হতে পারছিলেন না, কীভাবে ভর্তি হবেন সেটাও জানতেন না। আর এই অবস্থায় আশপাশের মানুষ তাদের অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। তাঁরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। সেখান থেকে রোগীকে নিয়ে কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভর্তি করি।’

তেজকুনিপাড়া থেকে একটি ফোন পেয়েছেন বলে জানিয়ে সাজ্জাদ বলেন, ‘সেখানে একটি বাসার চারজন আক্রান্ত। আর ওই পরিবার যেখানে থাকেন সেখানে একই ফ্লোরে আটটি পরিবার থাকে যাদের একটা রান্নাঘর এবং দুটি টয়লেট। আক্রান্ত চারজন শারীরিকভাবে সুস্থ আছেন, তাই তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়নি। তবে তাদের ওই ফ্লোরে আরও যে পরিবার আছে তাঁরা ঝুঁকিতে আছেন। এখন তাঁদের নিয়ে কী করব সেটা কালকে দেখব।’

করোনাভাইরাস ছাড়াও অনেককে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসক দেখানোর কাজও করেছেন সাজ্জাদ মিঠু। তিন বলেন, ‘বসুন্ধরা আবাসিক থেকে একজন যোগাযোগ করে। তাঁকে বাসা থেকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসক দেখানো, টেস্ট করিয়ে বাসায় পৌঁছে দেওয়া এবং পরে তাঁর টেস্টের রেজাল্ট তাঁকে পৌঁছে দিয়েছি। আরও একটি কেস পাই। একজনকে নিয়মিত ইনজেকশন নিতে হয়। এ ছাড়া দীর্ঘদিনের শ্বাসকষ্টের রোগী এবং কিন্তু শ্বাসকষ্ট থাকায় কেউ ভয়ে ইনজেকশন দিয়ে দিচ্ছিল না। আমরা গিয়ে তাঁদের হাসপাতালে নিয়ে সে ব্যবস্থা করি।’

ইউএইচডিপির কাছে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০০ ফোন এসেছে। যার মধ্যে প্রায় ৩০০ ফোন ছিল যেখানে তাঁরা সরাসরি গিয়ে সেবা দিয়েছেন। এ ছাড়া অনেককে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওসমান জামাল জানান, সারা দেশেই তাঁদের স্বেচ্ছাসেবক আছে। তবে এখন ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে বেশি ফোন পাচ্ছেন। তাঁরা বেশ কিছু অ্যাম্বুলেন্স সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে রেখেছেন, যাতে প্রয়োজনে পাওয়া যায়। সংগঠনের যে খরচ সেটা বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে অনুদান থেকে চলে বলে জানান তিনি।

যেসব হাসপাতাল করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসা দিচ্ছে সেখানে প্রথমদিকে রোগী নিয়ে গেলে ভর্তি করানো, টেস্ট করানোতে সমস্যা হলেও, এখন ইউএইচডিপি পরিচিত, যথেষ্ট সহায়তা পায়।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে