ওষুধের দোকানে এসব জিনিস ‘নাই’ কেন

0
166
জীবাণু রোধে ব্যবহার্য মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও হেক্সিসল বাজার থেকে প্রায় নাই হয়ে গেছে।

গতকাল রোববার বিকেলের দিকে কয়েকজন সহকর্মী জানান, কারওয়ান বাজারে হ্যান্ড স্যানিটাইজার নেই। রাত ১০টার পরে ধানমন্ডিতে প্রাথমিক চিকিৎসায় ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ ও হেক্সিসল কেনার জন্য একটি ফার্মেসিতে গেলে দোকানি জানান, হেক্সিসল বিকেলেই শেষ। জীবাণু রোধে ব্যবহার্য মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও হেক্সিসল বাজার থেকে প্রায় নাই হয়ে গেছে। ফার্মেসি, সুপারশপ, পাড়ার দোকান—সবখান থেকেই বলা হচ্ছে, পরে আসেন।

ধানমন্ডির একটি সুপারশপে এক নারী বড় দুটি স্যাভলনের বোতল নিলেন। সুপারশপের ম্যানেজার বললেন, ‘আপা, এত দিয়ে কী করবেন?’ সেই নারীর উত্তর, ‘বাজারে করোনো এসেছে।’

এর আগে বাজারে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির উত্তেজনায় মানুষ এগুলো বেশি করে কিনে জমিয়ে রেখেছে। দাম বাড়বে বলে গুজবে লবণের বেলায়ও এই ‘মজুত’–ধামাকা দেখা গেছে, যদিও তা ব্যাপক ছিল না। এবার করোনাভাইরাসের ভয়ে ওষুধের দোকান থেকে মাস্ক ও হেক্সিসলের মতো জীবাণুরোধী জিনিসের ওপর সাধারণ মানুষ যেন হামলে পড়েছে। এর মধ্যে মাস্কের দাম কয়েক গুণ বেড়ে গেছে, যদিও এ মুহূর্তে ওষুধের দোকানে মাস্ক বেশ দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে।

গত বছর এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু জ্বর ছড়িয়ে পড়ায় মানুষ হুমড়ি খেয়ে মশা মারার ও প্রতিরোধসামগ্রী কিনেছিল। ১৫০ টাকার জিনিস ৫০০ থেকে ৭০০ টাকার বেশিতেও বিক্রি হয়।

গত ডিসেম্বর থেকে চীনে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়। এরপর এখন পর্যন্ত ১০০টির বেশি দেশে তা ছড়িয়েছে। বাংলাদেশে গতকাল সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা জানান, দেশে তিনজনের শরীরে এ ভাইরাসের সংক্রমণ পাওয়া গেছে। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই মানুষ বাজারে ছোটে।

বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা লিংকন মোহাম্মদ লুৎফরজামান বলেন, তিনি গতকাল সন্ধ্যা সাতটার পরে গুলশান–১ নম্বরের কয়েকটি ফার্মেসিতে মাস্কের খোঁজে যান। কিন্তু তিনটি ফার্মেসি ঘুরেও মাস্ক পাননি। এ ছাড়া হ্যান্ড স্যানিটাইজার, হেক্সিসল তিনি গুলশান–বাড্ডার বিভিন্ন দোকান ঘুরেও পাননি। তিনি জানান, সব ফার্মেসিতেই প্রচুর ভিড় ছিল।

ধানমন্ডির এক ওষুধের দোকানের বিক্রয় প্রতিনিধি বলেন, ‘বিকেলের পর লাইন ধরে মানুষ মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও হেক্সিসল কিনে নিয়েছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সব শেষ। আজকে যারা আসছে, সবাই ফিরে যাচ্ছে। আমরা কোম্পানির কাছে চাহিদাপত্র দিয়েছি, এখন কতক্ষণে আসবে জানি না।’

একটি ওষুধের দোকানের ব্যবস্থাপক বলেন, তাঁদের কাছেও কিছু নেই। একজন এসে মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার চাইলে তিনি তাঁকে বিকেলে ফোন করে আসার জন্য পরামর্শ দেন। প্রত্যেকে ব্যাগভর্তি করে কিনেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি একজনকে খুব বেশি না দিতে। মানুষ এভাবে কিনতে থাকলে আসলে যাদের দরকার, তারা প্রয়োজনের সময় পাবে না। সবার এই বিষয়ে খেয়াল রাখা উচিত। নিজে সতর্ক হতে গিয়ে আরেকজনকে যেন বিপদে না ফেলি।’

ওষুধ ডটকম অনলাইন–অফলাইন সব মাধ্যমেই ওষুধসহ প্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি করে। তাদের এক বিক্রয় প্রতিনিধি বলেন, করোনার আতঙ্কে মাস্কসহ অন্যান্য জিনিসের প্রচুর অর্ডার আসছে, কিন্তু সরবরাহ না থাকায় দিতে পারছেন না।

ধানমন্ডি, কলাবাগান ও গ্রিন রোডের ১৫টি ফার্মেসি ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও হেক্সিসল নেই। প্রতিটি ফার্মেসি ঘুরে দেখার সময়ই অনেক ক্রেতাকে ফিরে যেতে দেখা গেছে। দোকানিরা জানান, গতকাল রাতেই সব শেষ হয়ে যায়।

সুপারশপগুলোতেও একই অবস্থা। ধানমন্ডির একটি সুপারশপে কথা হয় ব্যবসায়ী মনজুরুল হকের সঙ্গে। তিনি হ্যান্ড স্যানিটাইজার খুঁজছিলেন। পাননি। বিক্রয় প্রতিনিধি তাঁকে হ্যান্ডওয়াশ ও স্যাভলন দেখান। সেগুলোই নিয়ে যান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ডেঙ্গুর সময় মশা মারার ক্রিমের দাম দ্রুত বাড়তে থাকল। একসময় অভিযানের কারণে বিক্রিই বন্ধ হয়ে যায়। পরে আমি পাইনি। সেই শিক্ষা হয়েছে। এবার আগেই বেশি করে কিনে রাখছি।’ আরেকটি সুপারশপের ম্যানেজার জানান, গতকাল কেনার সময় ক্রেতারা ঝগড়া বাধিয়েছে। তাঁদের কাছেও হ্যান্ডওয়াশ ছাড়া কিছু নেই।

একাধিক দোকানি জানান, মাস্কের সরবরাহ কম। যেসব কোম্পানির কাছ থেকে তাঁরা নিয়ে আসেন, সেখান থেকে বলা হচ্ছে নেই। তাই মাস্কের সংকট বেশি। এক বিক্রয় প্রতিনিধি বলেন, কোম্পানি বাজারে পর্যাপ্ত ছাড়ছে না, তাই তাঁরাও পাচ্ছেন না।

কারওয়ান বাজারে ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা মো. সোহেল বলেন, দুই মাস ধরে দিনে ৫০ থেকে ৬০টি মাস্ক বিক্রি হয়। কিন্তু গতকাল তাঁর কাছে যা ছিল, সব এক ঘণ্টায় শেষ হয়ে যায়। আজও তাঁর মাস্কের চাহিদা প্রচুর। দামও বেশি। মানভেদে ৫০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত একেকটি মাস্ক বিক্রি করছেন।

আজ অবশ্য হাইকোর্ট বলেছেন, মাস্ক ব্যবহারে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হচ্ছে। তবে মাস্ক নিয়ে পেঁয়াজের মতো ব্যবসা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিষয়টি তদারক করা দরকার, কেউ যাতে বেশি দাম না নিতে এবং মজুত করতে না পারে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে