এসডিজি বাস্তবায়নে অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

0
61
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নে অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘এসডিজি বাস্তবায়নে আমরা নীতি সহায়তা এবং অর্থের যোগান অব্যাহত রাখবো, তবে অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার এবং অপচয়রোধ নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি যথাযথভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।’

এসডিজি’র বাস্তবায়ন পর্যালোচনার জন্য দ্বিতীয় জাতীয় সম্মেলন উদ্বোধন উপলক্ষে আজ সোমবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি একথা বলেন। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে যুক্ত হন প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি- আমরা সকলে মিলে এক সঙ্গে কাজ করলে ২০৩০ এর আগেই আমরা নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে এবং ২০৪১ সালের পূর্বেই জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা দারিদ্র্যমুক্ত এবং উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে সমর্থ হব।’

তিনি বলেন, ‘এসডিজি একটি বৈশ্বিক উন্নয়ন ধারণা হলেও বাংলাদেশের উন্নয়নের পথ পরিক্রমার সঙ্গে এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এসডিজি প্রণয়নের প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। আমাদের দেশের সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের মতামত নিয়ে ২০১৩ সালে আমরা জাতিসংঘের নিকট মোট ১১টি অভীষ্টের প্রস্তাব করেছিলাম। এর মধ্যে ১০টি অভীষ্টই জাতিসংঘ হুবহু অনুসরণ করে, অবশিষ্ট অভীষ্টটিও অন্যান্য লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়। ফলে এসডিজি প্রণয়নকাল হতেই বাংলাদেশের বিভিন্ন নীতি-কৌশল এসডিজির আদলে প্রণয়ন করা সম্ভব হয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক উন্নয়ন এজেন্ডা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা প্রণয়নে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে যথেষ্ট অগ্রগতি সাধন করেছে। এসডিজি বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে লিড/কো-লিড ও অ্যাসোসিয়েট মন্ত্রণালয়/বিভাগ চিহ্নিত করা হয়েছে। এসডিজি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণের জন্য কী পরিমাণ তথ্য-উপাত্ত রয়েছে ও নতুন কী তথ্য প্রয়োজন তার স্টাডি করা হয়েছে। এসডিজি বাস্তবায়নে কী পরিমাণ অর্থ ও সম্পদের প্রয়োজন তাও চিহ্নিত করা হয়েছে। সকল মন্ত্রণালয়/বিভাগ কর্তৃক এসডিজি বাস্তবায়নের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এসডিজি বাস্তবায়নের গুরুত্ব বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক-এর পদ সৃজন করা হয়েছে। তার নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট সচিবগণকে নিয়ে এসডিজি বাস্তবায়ন পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসডিজি বাস্তবায়নে কার্যকর সক্ষমতা অর্জনে মন্ত্রণালয়-ভিত্তিক কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিট ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বাস্তবায়নে জনপ্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ শীর্ষক একটি বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। আমরা আমাদের সকল মধ্য ও দীর্ঘ-মেয়াদী পরিকল্পনা দলিল এসডিজি লক্ষ্যমাত্রাকে বিবেচনায় নিয়ে প্রণয়ন করেছি। সর্বশেষ গৃহীত অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এসডিজি লক্ষ্যমাত্রাকে পরিপূর্ণভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।’

এছাড়াও, দেশের সকল মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করাসহ সার্বিক উন্নয়নে প্রয়োজনের নিরিখে বিশেষ বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে- উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পল্লীসঞ্চয় ব্যাংক, আশ্রয়ণ প্রকল্প, ডিজিটাল বাংলাদেশ, শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচি, নারীর ক্ষমতায়ন, সবার জন্য বিদ্যুৎ, কমিউনিটি ক্লিনিক ও শিশুর মানসিক বিকাশ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, পরিবেশ সুরক্ষা ও বিনিয়োগ বিকাশ- এর মতো উদ্যোগসমূহ ইতোমধ্যে দেশের সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

তিনি বলেন, ‘ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের চেয়ার হিসেবে, বাংলাদেশ ‘মুজিব ক্লাইমেট প্রোসপারিটি প্ল্যান’-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে, যার রূপকল্প হলো জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা অর্জন এবং বাংলাদেশের পরিকল্পিত অগ্রযাত্রাকে সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাওয়া।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা ২০২২ সালের এপ্রিলের মধ্যে সারাদেশে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৩টি গৃহহীন পরিবারকে বাড়ি বানিয়ে দিয়েছি। এছাড়াও, কক্সবাজারে ৬৪০ জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারকে নতুন বাড়ি করে দিয়েছি; ২০২৩ সালের মধ্যে মোট ৪ হাজার ৪০৯টি জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবার নতুন বাড়ি পাবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এসডিজি বাস্তবায়নে আমাদের গৃহীত উদ্যোগ ও কার্যক্রম বিশ্ব দরবারেও সমাদৃত, হয়েছে। জাতিসংঘের সকল দেশের মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম ৫ বছরে এসডিজি অর্জনে সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি করায় ‘সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সল্যুশন নেটওয়ার্ক’ আমাদেরকে ‘এসডিজিএস প্রোগ্রেস অ্যাওয়ার্ড’-এ ভূষিত করেছে।’

তিনি বলেন, বাংলাদেশ এসডিজিকে কেবল একটি বৈশ্বিক উন্নয়ন ধারণা হিসেবে গ্রহণ করেনি, বরং বৈশ্বিক এ লক্ষ্যমাত্রাকে দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় নিজের উপযোগী করে প্রণয়ন করার কার্যক্রম শুরু করেছে, যা এসডিজি স্থানীয়করণ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। এ কার্যক্রমের আওতায় ১৭টি অভীষ্ট হতে ৩৯টি সূচককে বাংলাদেশের জন্য এসডিজি অগ্রাধিকার ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেসঙ্গে প্রতিটি জেলা এবং উপজেলার বাস্তবতা বিবেচনায় ১টি করে অতিরিক্ত সূচক নির্ধারণ করা হয়েছে। আশা করা যায়, এই অগ্রাধিকার তালিকা অনুযায়ী জেলা, উপজেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের সকল সরকারি দপ্তরে দ্রুততা ও সফলতার সঙ্গে এসডিজি পরিবীক্ষণ এবং বাস্তবায়ন সম্ভব হবে, এবং দেশের চলমান উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনের পথে আমরা সাত বছর অতিক্রম করছি। গত দুই বছর কোভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারির কারণে এসডিজি বাস্তবায়ন গতি কিছুটা মন্থর হয়েছে, তবে আমরা আমাদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে যাচ্ছি। সরকারের পক্ষ হতে সময়োচিত প্রণোদনা প্যাকেজ প্রদান ও যথাযথ নীতি সহায়তা প্রদানের কারণে অর্থনীতি আবারও ইতিবাচক ধারায় ফিরে আসছে। নির্দিষ্ট সময়ে এসডিজি’র পথ পরিক্রমা নিশ্চিত করা কঠিন, তবে আমি বিশ্বাস করি সঠিক ও উদ্ভাবনী কর্মপরিকল্পনা এবং কার্যকর পরিবীক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব। এ প্রেক্ষাপটে ‘এসডিজি বাস্তবায়ন পর্যালোচনা সম্মেলন ২০২২’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আমি আশা করি, এ সম্মেলনের মাধ্যমে এসডিজি বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা করার এবং বাস্তবায়ন সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানের পন্থা খুঁজে বের করতে সমর্থ হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে বেসরকারিখাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে- একথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যেই বেসরকারিখাতে বিনিয়োগের জন্য বিনিয়োগ পরিবেশ অধিকতর সহায়ক করা হয়েছে। আমরা ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছি। অবকাঠামো উন্নয়নে মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে বেসরকারিখাত আরও বেশি গতিশীল হবে। এ সম্মেলনে বেসরকারিখাতের অংশগ্রহণ সম্মেলনের উদ্দেশ্য পূরণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আমি আশা করি।

পরে প্রধানমন্ত্রী ‘এসডিজি বাস্তবায়ন পর্যালোচনা সম্মেলন ২০২২’ এর শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে