এমন ছাত্ররাজনীতি চায় না কেউ

0
390
বুয়েটের ছাত্র আবরার হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ ও বিচার দাবি করে দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতি। রংতুলির আঁচড়ে নিহত আবরারের রক্তমাখা পায়ের ছবি আঁকছেন এক শিক্ষার্থী। গতকাল বুয়েটের তিতুমীর হলের সামনের দেয়ালে।

দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে ছাত্ররাজনীতির নামে হত্যা–খুন, হানাহানি, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, রাহাজানির ধারা চলে আসছে। সম্প্রতি বুয়েটে আবরার ফাহাদ হত্যা তারই আরেক নৃশংস রূপ।

এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যে ধারায় চলছে, এমন অবস্থায় সুষ্ঠু ধারার ছাত্ররাজনীতি ফিরে আসার সম্ভাবনা কম। বর্তমানে ছাত্ররাজনীতির নামে যে ধ্বংসাত্মক ও রক্তাক্ত কর্মকাণ্ড চলছে, তা মানুষ আর নিতে পারছে না। বিশেষ করে, বুয়েটে আবরার হত্যার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে হলে টর্চার সেল, র‍্যাগিং ও নানা অত্যাচার–নির্যাতনের যেসব খবর বেরিয়ে আসছে, তা শিউরে ওঠার মতো। বছরের পর বছর এটা চলছে, কেউ এত দিন টুঁ শব্দ করার সাহস পায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, প্রক্টর কিংবা বিভাগীয় প্রধানেরাও কোনো ব্যবস্থা নেননি।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে বুয়েট কর্তৃপক্ষ সেখানে ছাত্ররাজনীতি তথা দলীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ও অনুসরণ করুক—ছাত্র, শিক্ষক ও অভিভাবকদের অনেকেই তা চাইছেন। ক্যাম্পাসে সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় রাজনীতি তথা ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা যায় কি না, সেই আলোচনাও সামনে চলে এসেছে। এ ছাড়া মেডিকেল কলেজ এবং প্রকৌশল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে এ ধরনের ভয়ংকর ছাত্ররাজনীতিকে বিদায় করা জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় নিজ নিজ সিদ্ধান্তে এটা করতে পারে। একই সঙ্গে ছাত্রদের ন্যায়সংগত দাবিদাওয়ার জন্য ছাত্র সংসদকে কার্যকর ও নিয়মিত নির্বাচন করার উদ্যোগ থাকতে পারে। সরকারকে এ বিষয়ে চিন্তা করতে হবে।

বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে সম্প্রতি পিটিয়ে হত্যা করেছেন ছাত্রলীগের একদল নেতা-কর্মী।

সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আইন বা অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে ছাত্ররাজনীতি সম্পর্কে কিছু বলা নেই। কিন্তু ছাত্র সংসদ গঠনের কথা আছে। প্রতিটির আইনে শিক্ষকরাজনীতির বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও দলীয় সম্পৃক্ততার কথা বলা নেই। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংগঠন ও নানা রঙের আড়ালে শিক্ষকদের সমিতি বা সংগঠন রয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব সমিতি ও সংগঠন দলীয় রাজনীতির শক্তিকে পুঁজি করে দলাদলি ও নানা স্বার্থসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে যুক্ত।

ছাত্ররাজনীতি বন্ধ যেসব প্রতিষ্ঠানে

পরিস্থিতি সামাল দিতে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় নিজ উদ্যোগে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু থেকে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ছাত্রলীগের চাপের মুখে ছাত্ররাজনীতি চালুর অনুমতি দেন উপাচার্য মো. আবদুস সাত্তার। ২০১৪ সালে সেখানে কমিটিতে ঠাঁই পাওয়া না–পাওয়াকে কেন্দ্র করে চতুর্থ বর্ষের ছাত্র নাইমুল ইসলামকে (রিয়াদ) কুপিয়ে হত্যা করে ছাত্রলীগের একটি পক্ষ। এই হত্যা মামলায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখার বর্তমান সভাপতি সুব্রত বিশ্বাস ও সাধারণ সম্পাদক এস এম শামীম হাসান দুজনই অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি। সর্বশেষ গত জানুয়ারি মাসে এখানে শিক্ষকদের ওপর হামলা করে ছাত্রলীগ। এ ঘটনায় ছাত্ররাজনীতি আবার বন্ধ করে দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এখানকার বর্তমান উপাচার্য আনোয়ার হোসেন বলেন, এখানে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু একজন উপাচার্য তা উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। শিক্ষকদের ওপর হামলার পর রিজেন্ট বোর্ডে (সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী বোর্ড) ছাত্ররাজনীতি বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় রাজনীতি তথা ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা যায় কি না, সেই আলোচনা সামনে এসেছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় আইনে ছাত্ররাজনীতি প্রসঙ্গে কিছু বলা না থাকলেও শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচরণবিধিতে ছাত্ররাজনীতি করা যাবে না মর্মে শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। শুরু থেকে ছাত্ররাজনীতি না থাকা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে ঢাকার অদূরে গাজীপুরে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। ছাত্ররাজনীতি থাকা না–থাকার মধ্যে বড় পার্থক্য দেখানোর দৃষ্টান্ত হিসেবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম শোনা যায়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, এই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি নেই। ছাত্ররাজনীতি ছাড়াই কোনো বিশ্ববিদ্যালয় যে ভালো চলতে পারে, এটি তার একটি দৃষ্টান্ত।

নিষিদ্ধ থাকলেও চলছে

নিষিদ্ধ থাকলেও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংগঠনের কার্যক্রম চলছে। যদিও ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফরমের সঙ্গে অঙ্গীকারনামায় বলা আছে, ছাত্ররাজনীতি ও ধূমপান করা যাবে না।

এর আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সহিংস ঘটনার পর ২০০৮, ২০১২ ও ২০১৪ সালে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করে। এসব নিষেধাজ্ঞা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়নি, তবে ছাত্ররাজনীতি চলছে।

২০১০ সালে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত হন ঢাবির শিক্ষার্থী আবুবকর সিদ্দিক। একই বছর ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে মারা যান জাবির শিক্ষার্থী জুবায়ের আহমেদ।

২০০৬ সালে চালু হওয়া নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রিজেন্ট বোর্ডের প্রথম সভায় সিদ্ধান্ত হয়, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম ২০ বছর শিক্ষক ও ছাত্ররাজনীতি বন্ধ থাকবে। কিন্তু ১১ বছরের মাথায় সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক এম অহিদুজ্জামানের (চান) সময়ে সেখানে ছাত্ররাজনীতি চালু হয়। অবশ্য একমাত্র ছাত্রলীগ সেখানে কমিটি গঠন করে।

এ ছাড়া সংঘাত ও খুনের ঘটনার পর সিলেটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। পরে দুটিতেই আবার ছাত্ররাজনীতি চালু হয়।

আইনেও ছাত্ররাজনী​তি নেই

দেশে এখন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৪৯। এগুলোর প্রতিটির জন্য রয়েছে আলাদা আইন। তাতে ছাত্ররাজনীতির কথা নেই। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, যেখানে ছাত্ররাজনীতি নেই, সেখানকার পরিবেশ তুলনামূলক শান্ত। এর মধ্যে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও গাজীপুরে বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া ও মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও সেখানে দলাদলি বা খুনোখুনি নেই, ছাত্ররাজনীতিও নেই।

আইনে কিছু বলা না থাকলেও দেশের চারটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর) ছাত্ররাজনীতি আছে।

২০১২ সালে ছাত্রলীগ নেতাদের চাপাতির কোপে প্রাণ হারান পুরান ঢাকার দরজি বিশ্বজিৎ দাস।

তবে ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে। ওই অধ্যাদেশের পর ৪৬ বছর পার হয়েছে, এটা এখন পুনর্বিবেচনা জরুরি হয়ে পড়েছে। ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী পরিচালিত বুয়েট ও ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি সম্পর্কে কিছু উল্লেখ না থাকলেও সেখানে ছাত্র সংসদ গঠনের কথা বলা আছে। ১৯৮৯ সালে বুয়েট একাডেমিক কাউন্সিল একটি ছাত্র অধ্যাদেশ পাস করেছিল, সেটাই বুয়েট আইন। যার ১৬ ধারা অনুযায়ী, লিখিত অনুমতি ছাড়া কেউ ছাত্রসংগঠন করতে পারবে না।

ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনায় অবস্থিত চারটি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে ছাত্ররাজনীতির বিষয়ে কিছু বলা নেই। নব্বই-পরবর্তী প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রাজনীতির বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আছে।

দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতেও ছাত্ররাজনীতি করা যাবে, এমন কথা আইনে নেই। ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ খান আবুল কালাম আজাদ বলেন, এ বিষয়ে আইনে স্পষ্ট কিছু বলা নেই।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি রশিদ ই মাহবুব বলেন, ‘ছাত্রদের অবশ্য রাজনৈতিকভাবে সচেতন হতে হবে। তবে এখন ছাত্ররাজনীতির নামে যা হচ্ছে, সেটা আমি চাই না।’

বিভিন্ন সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একেকটি বড় ঘটনার পর ছাত্ররাজনীতি নিয়ে সমালোচনা হয়, এটি বন্ধের দাবি ওঠে। আবার প্রশ্ন ওঠে—ছাত্ররাজনীতি না থাকলে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা ছাত্রদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন হবে কীভাবে? এর জবাবে এমন কথা আসছে যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমন ভিসি বা নেতৃত্ব কেন দেওয়া হবে, যাঁদের অযোগ্যতার কারণে ছাত্ররা রাস্তায় নামতে বাধ্য হবেন।

তা ছাড়া, ছাত্ররাজনীতি না থাকলেও সাধারণ ছাত্ররা দাবি আদায় করে নিয়েছেন, এমন তিনটি সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত রয়েছে। গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে উপাচার্যদের চলে যেতে হয়েছে। বুয়েটে চলমান ছাত্র আন্দোলনটিও অরাজনৈতিক। কোটাবিরোধী আন্দোলন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুলশিক্ষার্থীদের আন্দোলন, ২০০৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থানের বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাটবিরোধী আন্দোলনও কোনো রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনের উদ্যোগে হয়নি; বরং নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগ বেপরোয়া হামলা করেছে।

শিক্ষাবিদেরা বলছেন কার্যকর ছাত্র সংসদের কথা। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া কোথাও ছাত্র সংসদ নেই। সেটাও দীর্ঘদিন কার্যকর ছিল না। অনেক বছর পর যা–ও ডাকসু নির্বাচন হয়েছে, সেটাও গ্রহণযোগ্য হয়নি; চলছেও না।

বুয়েটের প্রাক্তন ছাত্র, অভিনেতা, নাট্যকার ও লেখক আবুল হায়াত বলেন, ‘রাজনীতি থাকলে ভালো হবে, না রাজনীতি ছাড়া ভালো চলবে—এটা চট করে বলা কঠিন। তবে আমরা যে পরিবেশে লেখাপড়া করেছি, বড় হয়েছি, সেখানে রাজনীতি দরকার হয়নি। আমরা আমাদের সমস্যার কথা উপাচার্যকে গিয়ে বলতে পেরেছি। এখন ইউকসু নেই। তার ওপর ছাত্ররাজনীতির খারাপ প্রভাব পড়েছে। এ ছাড়া সেখানে উপাচার্য, প্রভোস্ট, শিক্ষক, ছাত্র—সবার মধ্যেই দূরত্ব তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে পরিবেশটা ভালো নেই, যা ফেরাতে হবে যেকোনো মূল্যে।’

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুষ্ঠু পরিবেশ ফেরাতে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা হবে কি না, এ প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বুধবার এবং শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বৃহস্পতিবার বলেছিলেন, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চাইলে সেখানকার রাজনীতি বন্ধ করতে পারে।

শিক্ষকরাজনীতি, আসন বরাদ্দ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতি খুব ক্ষতিকর হয়ে উঠেছে। অনেক সময় শিক্ষকরাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ছাত্ররাজনীতি।

এ ছাড়া যখন যে সরকার ক্ষমতায়, সেই সরকারের ছাত্রসংগঠনের প্রভাবশালীরা হলের সিট বণ্টন করেন। হল প্রশাসন ছাত্রনেতাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে, কখনো রাজনৈতিক চাপে, কখনোবা নিজের দলীয় রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে।

২০১৮ সালে ঢাবির এসএম হলে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের নির্যাতনের শিকার হন এহসান রফিক।

এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় রাজনীতি বন্ধ করা গেলে হলের সিট বণ্টনে অনিয়ম থেকে শুরু করে গেস্টরুম কালচার, গণরুম ও র‍্যাগিংয়ের নামে ভয়ংকর ছাত্রনিপীড়ন বন্ধ হয়ে যাবে।

নব্বইয়ের দশকে এইচ এম এরশাদ সরকারের আমলে ছাত্ররাজনীতি বন্ধে মোট দুই দফায় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে প্রথমবার ১৯৮৬ সালের ৮ ডিসেম্বর এবং দ্বিতীয়বার ১৯৮৯ সালের ২৬ নভেম্বর। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিল, শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাজনীতিমুক্ত করা উচিত। ১৯৮৯ সালে রাজনীতিমুক্ত কলেজকে সরকারি অনুদান প্রদানে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে তখনকার স্বৈরশাসকের উদ্দেশ্য হয়তো ভিন্ন ছিল। স্বৈরাচারের পতনের পর ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। ছাত্ররাজনীতির নামে হানাহানি বন্ধ হয়নি। ২০০১ সালে ছাত্রদলের হানাহানির কারণে সংগঠনের তৎ​কালীন সভাপতি ও সংসদ সদস্য নাসিরউদ্দিন পিন্টুকে গ্রেপ্তার করতে বাধ্য হয়েছে। একই সঙ্গে তিন বছর ছাত্রদলের কমিটি স্থগিত রেখেছিল। ২০০২ সালে টেন্ডারবাজি নিয়ে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের গোলাগুলিতে খুন হন বুয়েটের ছাত্রী সাবেকুন নাহার (সনি)। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হানাহানির শুরু স্বাধীনতার পর থেকে, যা দিনে দিনে আরও ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে।

ধ্বংসাত্মক রাজনীতি সবার অপছন্দ
ছাত্রসংগঠনের নামে ধ্বংসাত্মক রাজনীতির যে কদর্য চেহারা বছরের পর বছর ধরে তৈরি হয়েছে, তাতে খুব ব্যতিক্রম ছাড়া কোনো অভিভাবকও এখন আর চান না, তাঁর সন্তান রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হোক। এমনকি শীর্ষ পর্যায়ের রাজনীতিকদের সন্তানদেরও ছাত্ররাজনীতিতে দেখা যায় না। যদিও অন্যের সন্তানদের ছাত্ররাজনীতির নামে তাদের পেটোয়া বাহিনী হিসেবে ব্যবহারের ব্যাপারে আগ্রহের কমতি নেই। যার কারণে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের কথা উঠলেই সেটাকে ‘বিরাজনীতিকরণের ষড়যন্ত্র’ আখ্যা দিয়ে বক্তৃতা–বিবৃতি শুরু হয়।

তবে বুয়েটে নিহত আবরার ফাহাদের বাবা বরকত উল্লাহও চান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ হোক। তিনি ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করায় বুয়েট কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তাঁর ছেলেকে হারানোর মধ্য দিয়ে হাজার হাজার ছেলের জীবন যদি ভালো থাকে, এই নষ্ট ছাত্ররাজনীতি বন্ধ হয়; সেটাও তাঁর জন্য একটা সান্ত্বনা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাঁরা পড়াশোনা করেন, তাঁরা ভবিষ্যতে রাজনীতি করতে বা নেতৃত্বে যেতে চান না। তাঁরা মূলত নিজেকে দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে গড়তে চান। তাই সেই সুযোগ দেওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, প্রয়োজনে যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসন, ছাত্র ও শিক্ষকেরা চাইলে রাজনীতি বন্ধ রাখতে পারেন। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যেও তা স্পষ্ট। এমতাবস্থায় মেডিকেল, প্রকৌশল এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি থাকবে কি থাকবে না, এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে