এখনও মৃত্যুঝুঁকিতে কবর থেকে উদ্ধার হওয়া সেই নবজাতক!

0
192
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি

সম্প্রতি ভারতের উত্তরপ্রদেশের একটি গ্রাম থেকে মাটির পাত্রে রাখা এক নবজাতককে জীবিত উদ্ধার করা হয়।ঘটনাটি নিয়ে অনেকে আনন্দ প্রকাশ করলেও শিশুটি এখন পর্যন্ত শঙ্কামুক্ত নয় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তারা বলছেন, জীবন বাঁচিয়ে রাখতে প্রাণপন লড়াই করছে শিশুটি।

শিশু বিশেষজ্ঞ রবি খান্না জানিয়েছেন, শিশুটির শরীরে প্লাটিলেটের সংখ্যা মারাত্মক কমে যাওয়ায় তার অবস্থা এখনও গুরুতর।

বিবিসিকে তিনি জানিয়েছেন, আগামী পাঁচ থেকে সাতদিন পর তার অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে জানাতে পারবেন।

এদিকে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ ‘অজ্ঞাত ব্যক্তিদের’ বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছে। বারেইলি জেলার এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, এ ঘটনাটি ব্যাপক প্রচারিত হওয়ার পরেও কেউই শিশুটিকে তাদের সন্তান দাবি করতে এগিয়ে আসেনি। এ কারণে তাদের সন্দেহ, নবজাতক শিশুটিকে জ্যান্ত কবর দেওয়ার ব্যাপারে তার বাবা-মায়ের হাত রয়েছে।

শিশুটিকে উদ্ধারের পর পরই স্থানীয় সরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানকার শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. সৌরভ অঞ্জন জানান, শিশুটি সম্ভবত ৩০ সপ্তাহে জন্মগ্রহণ করেছিল । তার ওজন ছিল মাত্র ১ দশমিক কেজি, যা কিনা জন্মের সময়ে শিশুর আদর্শ ওজনের হিসেবে খুব কম।

ডাঃ অঞ্জন জানান, শিশুটির হাইপোথেরমিক ছিল অর্থাৎ তার দেহের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের চেয়ে কম ছিল। শিশুটির রক্তে শর্করার পরিমাণ ছিল ৩৫ যেটা কিনা কমপক্ষে ৪৫ হওয়া জরুরি।

তিনি বলেন, ‘ শিশুটি খুব ছোট আর দুর্বল ছিল। তাকে হাসপাতালে আনার পর তাৎক্ষণিকভাবে আমরা তাকে অক্সিজেন দিয়েছিলাম। সেই সঙ্গে হাইপোথার্মিয়ার চিকিৎসাও শুরু করেছিলাম।’

নবজাতককে কাপড়ের ব্যাগের ভিতরে মাটির পাত্রে  এখানেই সমাধিস্থ করা হয়েছিল

এরপর উন্নত সুবিধা থাকায় শিশুটিকে ডাঃ রবি খান্নার পেডিয়াট্রিক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

ডাঃ খান্না জানান, শিশুটিকে নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে রাখা হচ্ছে এবং একটি টিউবের মাধ্যমে তরল খাওয়ানো হচ্ছে। তার অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক। তিনি বলেন, ‘তার প্লাটিলেটের সংখ্যা ১০ হাজারে এ নেমে গেছে। অথচ স্বাভাবিক মাত্রায় এর পরিমাণ হয় দেড় লাখ থেকে সাড়ে চার লাখ। এ কারণে আমরা তাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন আছি।’

শিশুটি কতক্ষণ মাটির নিচে চাপা পড়ে ছিল সে বিষয়ে আলাদা আলাদা অনুমান রয়েছে। ডাঃ খান্না বলেন, ‘ শিশুটিকে তিন থেকে চার দিন আগে কবর দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাচ্চারা তাদের পেটে, উরু এবং গালে ফ্যাট নিয়ে জন্মায় এবং কিছুটা জরুরি অবস্থায় তারা এটার উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে পারে। ওই শিশুটি এতদিন তার শরীরে থাকা ব্রাউন ফ্যাটের কারণে বেঁচে আছে।’

তবে ডাঃ অঞ্জন বিশ্বাস করেন, শিশুটিকে উদ্ধারের কেবল দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। তার ভাষায়, যদি তাকে উদ্ধার করা না হতো তবে সম্ভবত আরও এক বা দুই ঘণ্টার জন্য সে বেঁচে থাকতে পারতো।

তিনি বলেন, ‘ যে পাত্রটির ভিতরে শিশুটিকে রাখা হয়েছিল সেখানে একটি বাতাসের পকেট ছিল যা তাকে অক্সিজেন সরবরাহ করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কিছু অক্সিজেন হয়তো আলগা হয়ে যাওয়া মাটির ভেতর দিয়ে ফিল্টার হয়ে ভেতরে প্রবেশ করেছে।’ তার ভাষায়, যেহেতু পাত্রটি ঘন মাটির তৈরি ছিল না, তাই এটিও বাতাস চলাচলে সহায়তা করতে পারে।

এদিকে বিজেপির এক স্থানীয় রাজ্য নেতা রাজেশ কুমার মিশ্র শিশুটিকে দত্তক নিতে চান। তিনি জানান, শিশুটি ভালো হয়ে উঠলেই তিনি এবং তার স্ত্রী শিশুটিকে নিজ বাড়িতে বড় করবেন।

বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘এটি একটি অলৌকিক ঘটনা যে সে বেঁচে আছে। আমি বিশ্বাস করি, ঈশ্বর তার জীবন বাঁচিয়েছেন এবং আমার কাছে পাঠিয়েছেন। এখন তার জন্য সব কিছু করা আমাদের কর্তব্য।’

জনপ্রিয় পৌরাণিক কাহিনী ‘রামায়ন’ অনুসারে, রাজা জনক জমি চাষ করার সময় দেবী সীতাকে খুঁজে পান। মাটির নিচ থেকে উদ্ধার হওয়ার কারণে মিশ্রাও কন্যা শিশুটির নাম রেখেছেন সীতা।

গত বৃহস্পতিবার বেরেলি জেলায় মৃত শিশুর জন্য কবর খুঁড়তে গিয়ে মাটির পাত্রে ওই নবজাতকের সন্ধান পান গ্রামবাসী।এ ঘটনায় হৈ চৈ পড়ে যায় ওই দেশে। উল্লেখ্য, ভারতে এখনও অনেক স্থানে তীব্র লিঙ্গ বৈষম্য বিদ্যমান। দারিদ্রতার কারণে অনেক পরিবার এখনও মেয়ে সন্তানকে পরিবারের বোঝা মনে করে। এ কারণে নিষিদ্ধ থাকলেও অনেক স্থানে এখনও অবৈধভাবে কন্যা ভ্রুণ মেরে ফেলা হয়। এমনকী জন্মের পরও বিভিন্ন স্থানে কন্যা শিশু হত্যার ঘটনা ঘটে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে