উদ্বোধনের অপেক্ষায় ৩৭১২ কোটি টাকার পয়ঃশোধনাগার, পাইপলাইনের খবর নেই

0
34
উদ্বোধনের অপেক্ষায় দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার।ছবি: সংগৃহীত

দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগারের নির্মাণ ব্যয় ৩ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। পয়োবর্জ্য শোধনাগারে পৌঁছানোর নেটওয়ার্ক তৈরি হয়নি। নেটওয়ার্ক করতে নতুন প্রকল্প নিতে হবে। এতে সময় লাগবে কয়েক বছর।

ঢাকা ওয়াসা

ঢাকা ওয়াসা

ঢাকা ওয়াসার একাধিক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু ঘটনায় ঢাকা ওয়াসা ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে। উচ্চ আদালত থেকে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) বেতন-ভাতা নিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে। কর্মীদের পারফরম্যান্স বোনাস স্থগিত করা হয়েছে। এ অবস্থায় শোধনাগার উদ্বোধন করে সরকারপ্রধানের সামনে ঢাকা ওয়াসার এমডি নিজের সফলতা তুলে ধরতে চান। কিন্তু এত টাকা ব্যয়ে নির্মিত শোধনাগারের উদ্দেশ্য যে আপাতত পূরণ হবে না, এ তথ্য গোপন করা হচ্ছে।

দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার প্রকল্পের উদ্দেশ্য—রাজধানীর বেশ কিছু এলাকার পয়োবর্জ্য পরিশোধন করে বালু নদীতে নিষ্কাশন করা। এলাকাগুলোর মধ্যে গুলশান, বনানী, ডিওএইচএস, আফতাবনগর, বাড্ডা, মগবাজার, নিকেতন, কলাবাগান, ধানমন্ডি (একাংশ) ও হাতিরঝিল অন্যতম। দৈনিক ৫০ কোটি লিটার পয়োবর্জ্য পরিশোধনের মাধ্যমে ৫০ লাখ নগরবাসীকে সেবা দেওয়াই এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য।

ঢাকা ওয়াসার একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, শোধনাগার নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে নেটওয়ার্ক তৈরি করা প্রয়োজন ছিল। পাইপলাইন নির্মাণ একটি সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। পয়োবর্জ্য নেটওয়ার্ক করতে কয়েক হাজার কোটি টাকার নতুন প্রকল্প নিতে হবে। এতে সময় লাগবে কয়েক বছর। ফলে যে উদ্দেশ্যে শোধনাগার করা হয়েছে, তা নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন ছাড়া পূরণ হবে না। এত টাকা ব্যয়ে নির্মিত শোধনাগারের সুফল জনগণকে পেতে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বলছে, হাতিরঝিলে আসা বর্জ্য শোধন করা হবে দাশেরকান্দি শোধনাগারে। প্রকল্পের নির্ধারিত এলাকার জন্য পাইপলাইন নেটওয়ার্ক নির্মাণে আলাদা প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। নতুন এ প্রকল্পে চীনের এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়নের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। তবে কবে নাগাদ এ নেটওয়ার্ক নির্মাণের কাজ শুরু হবে, তা নিশ্চিত নয়।

ঢাকা ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খান

ঢাকা ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খান

ঢাকার পয়োবর্জ্য পরিস্থিতি বদলাতে ২০১৩ সালে ঢাকা মহানগরীর পয়োনিষ্কাশন মহাপরিকল্পনা তৈরি করে ওয়াসা। সে অনুসারে, ঢাকার চারপাশের নদীদূষণ রোধে পাঁচটি শোধনাগার নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে হাতিরঝিল থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে আফতাবনগরের কাছে দাশেরকান্দিতে শোধনাগার প্রকল্প নেয় ওয়াসা।

দাশেরকান্দি প্রকল্পটি অনুমোদন পায় ২০১৫ সালে। একই বছরের জুলাইয়ে শুরু হয়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে।

শুরুতে প্রকল্পের খরচ ছিল ৩ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এতে প্রকল্পের খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। এ প্রকল্পে ২ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে চীন সরকার।

নগর গবেষণা ও নীতি বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘নেটওয়ার্ক ছাড়া শোধনাগার অর্থহীন। এটা বিপুল অর্থ খরচ করে অশ্বডিম্ব পাওয়ার মতো একটা অবস্থা হয়েছে। এতে ঋণের বোঝাই শুধু বাড়বে। নগরবাসী প্রকল্পের সুবিধা পাবে না। কিন্তু পানির দাম বাড়ায় তাদেরই ঠিকই দায় মেটাতে হবে।’

ঢাকা ওয়াসার মূল দায়িত্ব নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা।

গত ১৩ বছরে ঢাকায় নতুন কোনো সুয়ারেজ লাইন তৈরি হয়নি। বরং আগের পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা পুরো ভেঙে পড়েছে।

ঢাকা ওয়াসার পয়োনিষ্কাশন মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজধানীতে বাকি চারটি শোধনাগার হবে উত্তরা, মিরপুর, রায়েরবাজার ও পাগলায় (দ্বিতীয়)। এসব প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হয়নি।

বর্তমানে ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় পয়োবর্জ্য নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই। ফলে রাজধানীর অধিকাংশ পয়োবর্জ্য কোনো না কোনো পথে নদীতে যাচ্ছে।

ঢাকা ওয়াসার উপপ্রধান জনতথ্য কর্মকর্তা এ এম মোস্তফা তারেকের মাধ্যমে সংস্থাটির কর্তৃপক্ষ জানায়, দাশেরকান্দি শোধনাগার প্রকল্পের নির্ধারিত এলাকার জন্য পাইপলাইন নেটওয়ার্ক একটি আলাদা প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে। ইতিমধ্যে নেটওয়ার্ক তৈরির জন্য একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। চীনের এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়নের জন্য তা প্রক্রিয়াধীন। তার আগপর্যন্ত হাতিরঝিলের দুই পাশের সীমানা বরাবর নির্মিত বিশেষ পয়োবর্জ্য ডাইভারশন অবকাঠামো (এসএসডিএস) থেকে আসা বর্জ্য শোধন করা হবে দাশেরকান্দিতে।

শিগগির সুফল মিলবে না, তা সত্ত্বেও তড়িঘড়ি করে শোধনাগার উদ্বোধনের উদ্যোগ নিয়ে ঢাকা ওয়াসার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে। এ উদ্যোগে অনেকেই বিব্রত।

আইপিডির নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘এ শোধনাগারের সুবিধা কী? এত দিনেও নেটওয়ার্ক কেন হলো না?—শোধনাগার উদ্বোধন করতে এসে সরকারপ্রধান ঢাকা ওয়াসার দায়িত্বপ্রাপ্তদের কাছে এসব প্রশ্নের জবাব চাইতে পারেন। কাদের গাফিলতিতে এত টাকা ব্যয়ের পরও এখন প্রকল্পের সুফল মিলবে না, তাঁদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’

সামছুর রহমান

ঢাকা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.