ইসি-মাঠ প্রশাসনের বৈরী সম্পর্কে সুষ্ঠু ভোটে শঙ্কা

0
63
নির্বাচন কমিশন ভবন

বিদ্যমান ব্যবস্থায় দলীয় সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কিনা এ নিয়ে চলছে রাজনৈতিক বিরোধ। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে মাঠ প্রশাসনের বৈরী সম্পর্কের বিষয়টি প্রকাশ্য হয়ে পড়েছে। ফলে ভবিষ্যতে সুষ্ঠু ভোট আয়োজনের শঙ্কা বাড়ছে। সংবিধান অনুযায়ী আগামী বছরের শেষে বর্তমান সরকারের অধীনে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে।

বিএনপিসহ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেওয়া দলগুলোর অন্যতম অভিযোগ, মাঠ প্রশাসনের ওপর ইসির নিয়ন্ত্রণ নেই। ক্ষমতাসীনদের নির্দেশের বাইরে তারা কোনো কাজ করে না। আগামী নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা না দিলেও সুষ্ঠু ভোট করতে বর্তমান ইসির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। এ কারণেই বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো বিলুপ্ত ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ বা ‘নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার’ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে দাবি তুলেছে। নানা রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ তৈরির চেষ্টাও চালাচ্ছেন তাঁরা।

গত শনিবার ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের ঢাকায় ডেকে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেছিলেন কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশন। তবে বৈঠকে সৃষ্ট অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় বিব্রত হওয়ার কথা প্রকাশ্যেই বলছেন কমিশনের সদস্যরা। অন্যদিকে ডিসিরা বলছেন, তাঁদের ডেকে নিয়ে অপমান করা হয়েছে। সাংবিধানিক পদ থেকে কমিশনের একজন সদস্য যেভাবে কথা বলেছেন, এটা তাঁর শপথ ভঙ্গের শামিল। ওই সভায় নির্বাচন কমিশনার আনিছুর রহমানের একটি বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান ডিসিরা। এ সময় হট্টগোল তৈরি হয়। পরে আনিছুর রহমান আর বক্তব্য দেননি।

ইসি কার্যালয়ের কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, কাজী রকিব কমিশন ও কে এম নূরুল হুদা কমিশনের আমলে রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পেয়ে অবাধে ক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহার করেছেন মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। ওই দুই নির্বাচনে কারও বৈধ মনোনয়নপত্র অবৈধ করে দিয়েছেন। আবার মনোনয়ন প্রত্যাহারের পরেও তাঁকে বৈধ প্রার্থী হিসেবে ঘোষণার মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটিয়ে পার পেয়েছেন। এমনকি পরবর্তী সময়ে তাঁদের রাজনৈতিক সরকার পুরস্কৃতও করেছে। দীর্ঘদিন এমন সুবিধায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন তাঁরা। এর বাইরে তাঁরা কিছু চিন্তা করতে পারছেন না। এখন সময় এসেছে ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব দিয়ে নির্বাচন পরিচালনার সক্ষমতা প্রদর্শনের। এর আগে অবশ্য ইসির পক্ষ থেকে ঘোষিত রোডম্যাপে বলা হয়েছিল- রিটার্নিং কর্মকর্তা, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা যতদূর সম্ভব ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে নিয়োগ দেওয়া হবে।

সংশ্নিষ্টরা জানান, ডিসিদের বিরুদ্ধে আনা কমিশনার আনিছের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। কারণ প্রতিটি নির্বাচনেই ম্যাজিস্ট্র্রেটসহ নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য ইসি থেকে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই অর্থের সুষ্ঠু বণ্টন না হওয়ার অভিযোগ অনেক পুরোনো। ফলে প্রার্থীদের কাছ থেকে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে থাকা কর্মকর্তারা উৎকোচ গ্রহণে উৎসাহিত হন। এ বিষয়টি তুলে ধরতে গিয়ে ডিসি-এসপিদের তোপের মুখে পড়েছেন সাবেক এই আমলা।

তবে নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর অবশ্য বলছেন, বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। সফল আলোচনা হয়েছে। কমিশনের বক্তব্য ডিসি-এসপিরা মন দিয়ে শুনেছেন। তাঁরা সমস্যার কথা বলেছেন। এসব সমস্যা সমাধানে সীমিত সক্ষমতার মধ্য দিয়ে কমিশন সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। তিনি আরও বলেন, শুধু জাতীয় নির্বাচন নয়, সব ধরনের নির্বাচনে মাঠ প্রশাসনের সহায়তা ইসিকে নিতে হয়। এটা টিম ওয়ার্ক। টিমে বিভিন্ন ধরনের সদস্য থাকেন। দ্বিমত থাকে। তারপর বিতর্ক হয়। আলোচনা হয়। সবাই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। সবাই প্রজাতন্ত্রের দায়িত্বে। এখানে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

কমিশনার আনিছের বিরুদ্ধে শপথ ভঙ্গের অভিযোগ

ডিসি-এসপিদের ঢাকায় ডেকে একজন কমিশনারের আচরণে শপথ ভঙ্গ হয়েছে বলে দাবি করেছেন একাধিক ডিসি। তাঁরা বলছেন, সাংবিধানিক পদে থেকে একজন কমিশনারের রাগ বা বিরাগের বশবর্তী হয়ে কোনো আচরণ করার সুযোগ নেই। দক্ষিণাঞ্চলের একজন ডিসি বলেন, ওই বৈঠকে একজন কমিশনার যেসব ভাষায় কথা বলেছেন তাতে কোনোভাবেই তাঁর শপথ রক্ষা হয়নি। মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ তুলেছেন। এতে রাত-দিন মাঠে কাজ করা এসব কর্মকর্তা মর্মাহত হয়েছেন।

ঢাকার পার্শ্ববর্তী একটি জেলার ডিসি বলেন, জেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে ইসির এত তোড়জোড়ের কোনো কারণ আছে বলে তিনি মনে করেন না। তাঁর মতে, এই ভোটে তেমন কোনো সমস্যা হওয়ার সুযোগ নেই। এতগুলো জেলার মধ্যে ১৮-২০টি অভিযোগ আসতেই পারে। স্থানীয়ভাবে তাঁদের আরও অনেক বেশি অভিযোগ মোকাবিলা করতে হয়। কমিশনের আচরণ দেখে মনে হয়েছে তারা চাপ নিতে পারছে না। অপর একজন ডিসি বলেন, স্থানীয়ভাবে উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচন সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং। এসব নির্বাচন করতে গিয়ে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। ভুল-ভ্রান্তি হয়নি তা বলব না। কিন্তু সামান্য ভুল-ভ্রান্তি নিয়ে কেন এমন আচরণ করতে হবে।

আরেকজন ডিসি বলেন, বৈঠক শুরুর পরিবেশে মনে হচ্ছিল কমিশন আগে থেকেই শাসানোর প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। তাই প্রথম বক্তাই ভীষণ আক্রমণাত্মক বক্তব্য শুরু করেন। কিন্তু ডিসি-এসপিদের আপত্তির মুখে তিনি আর বক্তব্য দিতে না পারায় অন্য কমিশনার ও সিইসি তেমন কোনো কড়া বক্তব্যে যাননি। সিলেট বিভাগের একজন ডিসি বলেন, মন্ত্রীদের সঙ্গে সম্পর্ক ছাড়া কী তিনি সচিব হতে পেরেছিলেন? মন্ত্রী-এমপিদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা পেশাগত দায়িত্বের অংশ। এখানে তিনি খারাপ কী পেলেন?

বিব্রত হলেও বিচলিত নয় ইসি: রাশেদা সুলতানা 

ডিসিদের অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণে বিব্রত হলেও ইসি বিচলিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন নির্বাচন কমিশনার রাশেদা সুলতানা। তিনি বলেন, এরকম একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে তাঁরা তা আগে থেকে আঁচ করতে পারেননি। গতকাল সোমবার তাঁর নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ কমিশনার বলেন, ‘বিব্রত তো বটেই, কারণ একরম একটা ঘটনা কে চায়? মাথার মধ্যেই তো আনতে পারি নাই, ওরকম একটা পরিস্থিতি তৈরি হবে। যেটা গেছে গেছে। ওটা নিয়ে আমরা এত বিচলিত না। বিচলিত হওয়ার কোনো কারণ আছে বলে আমি মনে করি না।’

রাশেদা সুলতানা আরও বলেন, ডিসিদের হইচই করাটা ঠিক হয়নি। এরকম পরিস্থিতি উদ্ভব না হলে ভালো হতো। কিন্তু এটার মধ্য দিয়ে সবকিছু ভেস্তে গেছে, ইসি তাদের আয়ত্তে আনতে পারব না, তিনি এটা মনে করেন না।

সংবিধান লঙ্ঘন হয়েছে মত সাবেক ইসি রফিকের

ডিসি-এসপিদের হইচই ও প্রতিবাদের মুখে কমিশনার আনিছুর রহমানের বক্তব্য দিতে না পারাকে নির্বাচন কমিশন ভুল বোঝাবুঝি বলে মনে করলেও সাবেক নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম মনে করেন, এতে আইন ও সংবিধানের লঙ্ঘন হয়েছে। তিনি বলেন, ডিসিদের আচরণ সংবিধান ও আইনের লঙ্ঘন। হইচই করে একজন কমিশনারকে বক্তব্য দিতে না দেওয়া সরকারি কর্মচারী আচরণবিধির লঙ্ঘন বলেও মত তাঁর। এ ব্যাপারে কমিশনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নির্বাচনকালীন এই কর্মকর্তারা ইসির নির্দেশ অনুযায়ী আদৌ দায়িত্ব পালন করবেন কিনা এ ঘটনায় তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন সাবেক এই ইসি। একই সঙ্গে তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন ছাড়া কর্মকর্তাদের উদ্দেশে আনিছুর রহমানের ঢালাও মন্তব্য করা ঠিক হয়নি বলেও মনে করেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৮ সালের নির্বাচনে ডিসি-এসপিদের অনেক বেশি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁরা রাতের ভোটে সহায়তা করেছেন। কমিশন নিজেই নিরপেক্ষ নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, তারা যদি নিরপেক্ষ হতো তাহলে মাঠ প্রশাসন এ ধরনের আচরণ করতে সাহস পেত না। এ ঘটনার পর ইসির পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। অবস্থাদৃষ্টে পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে আগামী নির্বাচনেও নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা ইসির হাতে নয়; এই ডিসি-এসপিরাই থাকবেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.