ইভিএম নিয়ে সিদ্ধান্তে আসেনি ইসি, আমলে সংলাপের ১০ প্রস্তাব

0
68
নির্বাচন কমিশন ভবন

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের সার্বিক বিষয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) এখনো স্থির কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেনি। রাজনৈতিক সংলাপ ছাড়াও ইতোপূর্বে ইভিএম নিয়ে যেসব কর্মশালা, মতবিনিময়, পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে তার সার্বিক ফলাফল বিচার-বিশ্লেষণ করে ইভিএম ব্যবহার বিষয়ে কমিশন যথাসময়ে অবহিত করবে।

সম্প্রতি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের প্রস্তাবসমূহ পর্যালোচনা করে ইসি যে মতামত দিয়েছে তাতে এ তথ্য জানা গেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আওয়ালের সই করা এই মতামত ইসির যুগ্ম সচিব (পরিচালক-জনসংযোগ) এসএম আসাদুজ্জামান গণমাধ্যমকে অবহিত করেছেন।

নির্বাচন কমিশন গত জুলাই মাসে দেশের ৩৯টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ২৮টির সঙ্গে সংলাপ করেছে। ৯টি দল এই সংলাপ বর্জন করেছে। বাকি দুটি দলের সাথে সেপ্টেম্বরে সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। সংলাপে সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকাজে সেনা মোতায়েনের প্রস্তাবনাটি যৌক্তিক বলেও কমিশন মত প্রকাশ করেছে। সংলাপের সারংক্ষেপে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাবকে ১০টি ভাগ করে নিজেদের মতামত তুলে ধরেছে ইসি।

ইসির মতামত হলো, ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তি এবং সমর্থন দুই-ই রয়েছে। আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম-এর ব্যবহার বিষয়ে কমিশন যথাসময়ে অবহিত করবে।

ভোটগ্রহণ চলাকালীন ভোটকেন্দ্রে ভোটকার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য সাংবাদকর্মী এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের অবাধ সুযোগ দেয়ার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করে ইসি বলেছে, দেশি এবং বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষকগণকে ভোট পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেয়া হবে। সামর্থ্য সাপেক্ষে ভোটকেন্দ্রের অভ্যন্তরে সিসি ক্যামেরা প্রতিস্থাপন করা হবে।

নির্বাচনে প্রার্থীদের জয়-পরাজয় মেনে নিতে হবে বলে অভিমত ব্যক্ত করে নির্বাচন কমিশন (ইসি) বলেছে, পরাজয় মেনে না নেয়ার মানসিকতা পরিত্যাগ করতে হবে। অর্থশক্তি ও পেশিশক্তি দেশের রাজনৈতিক ও নির্বাচনি সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে অপচর্চার মাধ্যমে অপশক্তি হিসেবে অবাঞ্ছিত স্থায়ী রূপ ধারণ করেছে। এমন অপসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে অবশ্যই সার্বিক রাজনৈতিক নেতৃত্বে সমঝোতা ও মতৈক্য প্রয়োজন।

কোনো দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করতে পারে না উল্লেখ করে ইসি জানিয়েছে, তারা সেই ধরনের কোনো প্রয়াস গ্রহণ করবে না। তবে সব দলকে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য শেষ পর্যন্ত আন্তরিকভাবেই আহ্বান করে যাবে।

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ও লেভেল প্লেইং ফিল্ডের বিষয়ে রাজনৈতিক দলের পরামর্শের প্রেক্ষিতে ইসি তার সুপারিশে বলেছে, কমিশন নির্বাচনে সকল দলের, বিশেষত প্রধানতম রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ আন্তরিকভাবে প্রত্যাশা করে।

অর্থশক্তি ও পেশিশক্তির ব্যবহার এবং প্রভাব প্রতিরোধ, রিটার্নিং অফিসার হিসেবে কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তাদের নিয়োগের সুপারিশের বিষয়ে ইসি বলেছে, সংবিধান, আইন ও বিধি-বিধানের অধীনে সকল ক্ষমতা যথাযথভাবে প্রয়োগ করে ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগে সৃষ্ট সকল বাধা ও প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করে লেভেল প্লেইং ফিল্ড প্রতিষ্ঠা করে নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগের অনুকূল পরিবেশ ও সুযোগ সৃষ্টি করতে তারা সকল উদ্যোগ গ্রহণ করবে। কারচুপির সম্ভাব্য সকল সুযোগ প্রতিরোধ করে সঠিক ও নিরপেক্ষ ফলাফল নিশ্চিত করতেও সততা, আন্তরিকতা, নিষ্ঠা, সাহসিকতা ও সর্বোপরি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করে যাবে। আগামী নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার হিসেবে প্রশাসনের কর্মকর্তগণ ছাড়াও কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তা এবং অন্যান্য বিভাগ থেকে কর্মকর্তাদের নিয়োগদানের বিষয়টি কমিশন সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করে দেখবে। এক্ষেত্রে কিছু মৌলিক প্রশ্নে মতৈক্যে রাজনৈতিক দলগুলোকে সমঝোতার মাধ্যমে লেভেল প্লেইং ফিল্ড প্রতিষ্ঠা করে নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগের অনুকূল পরিবেশ ও সুযোগ সৃষ্টি করতে ভূমিকা রাখতে হবে।

একই মঞ্চ থেকে সকল দলের প্রার্থীদের বক্তব্য প্রদানের এবং প্রচারণার নতুন পদ্ধতি প্রবর্তন করার, নির্ধারিত স্থানে সকল প্রার্থীর পোস্টার লাগানো বা লটকানোর ব্যবস্থা করা এবং প্রয়োজনে একই পোস্টারে সকল প্রার্থীর প্রচারণার ব্যবস্থা করার প্রস্তাবকে আধুনিক উল্লেখ করে ইসি বলেছে, এতে নির্বাচনি ব্যয় কমে আসতে পারে। নির্বাচনি সহিংসতা হ্রাস পেতে পারে। রাজনীতিতে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির নতুন সংস্কৃতির প্রচলন সূচিত হতে পারে। ইউটিলিটি বিল বাকি থাকার কারণে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য বিষয়ক বিধানটি যৌক্তিক করার বিষয়ে কমিশন বিবেচনা করবে বলেও মতামত ব্যক্ত করেছে।

নির্বাচন নিরপেক্ষ করতে এবং ভোটার সাধারণকে আশ্বস্ত করতে নির্বাচনের পূর্বেই সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে দিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার (পূর্বের অনুরূপ অরাজনৈতিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়) গঠনের পরামর্শ ও কয়েকটি মন্ত্রণালয় ইসির অধিনে রাখার প্রস্তাবের জবাবে ইসি তার মতামতে বলেছে, নির্বাচন কমিশন মনে করে নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়টি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রয়োজনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রাণালয় ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্বাচনকালীন সময়ে নির্বাচন কমিশনের অধীনে ন্যস্ত করার বিষয়টিও সংবিধানের আলোকে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন।

কমিশন সংবিধান ও শপথের প্রতি অনুগত থেকে সৎ, নিরেপক্ষ ও সাহসিকতার সাথে সংবিধান ও আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবে উল্লেখ করে মতামতে বলেছে, নির্বাচনকে অবাধ ও নিরপেক্ষ করতে সংবিধান ও আইনে প্রদত্ত ক্ষমতা সততা ও সাহসিকতার সাথে প্রয়োগ করতে বদ্ধপরিকর।

কমিশন তার মতামতে আরও বলেছে, কমিশন আন্তরিকভাবে আশা করে জাতীয় সংসদ-সদস্যদের আসন্ন সাধারণ নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও অহিংস পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে। ভোটারগণ অবাধে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সংসদ গঠিত হবে। সংসদ থেকে গঠিত সরকার জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে দেশ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.