ইউক্রেন সংকটের পেছনে যেসব কারণ, যা করছে রাশিয়া ও পশ্চিমারা

0
53
ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর একটি ব্রিগেডের মহড়ায় গোলা ছোড়ার এ ছবি প্রকাশ করা হয়েছিল গত ১৭ ডিসেম্বর, ছবি: রয়টার্স

তবে রাশিয়া বলছে, অভিযান চালানোর পরিকল্পনা তাদের নেই। মস্কোর ভাষ্য, তারা চাইলে নিজেদের সীমান্তের যেকোনো জায়গায় সেনা সমাবেশ ঘটাতে পারে এবং তাদের সব পদক্ষেপই আত্মরক্ষামূলক। এদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ দেশটির কর্মকর্তারা ন্যাটোকে পূর্ব দিকে সামরিক উপস্থিতি না বাড়ানোর জন্য সতর্ক করছিলেন।

তাহলে সাত বছরের বেশি সময় ধরে চলা এ সংকটের মূলে কী রয়েছে
প্রায় ১ হাজার ২০০ বছর আগে মধ্যযুগীয় পরাশক্তি কিয়েভান রুসে আজকের ইউক্রেন, রাশিয়া ও প্রতিবেশী বেলারুশের আবির্ভাব ঘটে। পূর্ব ইউরোপের বিশাল এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছিল কিয়েভান রুস। ওই সব বসতি তৈরি হয়েছিল ইউরোপের চতুর্থ বৃহত্তম নিপার নদীর তীর ঘেঁষে।

রাশিয়ান ও ইউক্রেনিয়ানদের মধ্যে ভাষাগত ও ঐতিহাসিক ভিন্নতা ছিল। রাজনৈতিকভাবেও তারা আলাদা ছিল। তবে ভ্লাদিমির পুতিনের দাবি, রাশিয়ান ও ইউক্রেনিয়ানরা ‘একই জনগোষ্ঠী’ এবং উভয়ই রাশিয়ান সভ্যতার অংশ। আরেক প্রতিবেশী দেশ বেলারুশকেও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেন তিনি। রুশ প্রেসিডেন্টের এ দাবি নাকচ করে আসছেন ইউক্রেনিয়ানরা।

চলতি শতকেই ইউক্রেনে দুই দফা গণ–অভ্যুত্থান ঘটেছে। ২০০৫ ও ২০১৪ সালে উভয় ক্ষেত্রেই বিক্ষোভকারীরা রাশিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকার করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো জোটে দেশের অন্তর্ভুক্তির দাবি তুলেছেন।

অপর দিকে নিজের সীমান্তের সামনেই ন্যাটোর সম্ভাব্য ঘাঁটি নিয়ে শঙ্কিত ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি বলে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন এই সামরিক জোটে ইউক্রেনের যোগ দেওয়াটা হবে চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করা।

গত বছর জুনে জেনেভায় বৈঠক করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন

গত বছর জুনে জেনেভায় বৈঠক করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ছবি: রয়টার্স

বিদ্রোহীদের পৃষ্ঠপোষকতা

২০১৪ সালে ইউক্রেনে কয়েক মাসের বিক্ষোভের মুখে মস্কোপন্থী প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচের পতন ঘটে। সে সময় ইউক্রেনের ক্রিমিয়া অঞ্চল দখল করে নেয় রাশিয়া। পাশাপাশি দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ দোনেৎস্ক ও লুহানস্কের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করে।

এই বিদ্রোহীরা ‘পিপলস রিপাবলিকস’ নামে স্বশাসিত অঞ্চলের ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁরা কয়েক ডজন ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’ পরিচালনা করছেন, যেখানে ভিন্ন মতাবলম্বীদের ধরে নিয়ে নির্যাতন, এমনকি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে বলে ইউক্রেন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ।

দোনেৎস্ক স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইহর কোজলোভস্কি এ ক্যাম্প ও বন্দিশালায় প্রায় ৭০০ দিন কাটিয়েছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পাশাপাশি রাশিয়ান কর্মকর্তাদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তিনি। রুশ কর্মকর্তারা তাঁকে ‘রাশিয়ান সভ্যতা’র কথা বলেছেন।

ইহর কোজলোভস্কি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘ওই কর্মকর্তা আমাকে বলেন, অন্য কোনো জাতি নেই, অন্য কোনো সভ্যতা নেই, রাশিয়ান জগৎই সভ্যতা এবং যিনি এ সভ্যতার অংশ, তাঁর কাছে এটা কোন নামে ডাকা হয়, সেটা কোনো বিষয় নয়। তাতার বা ইউক্রেনিয়ান, তোমাদের অস্তিত্ব নেই।’

বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যেভাবে তাদের বিরোধীদের দমন করছে এবং নিজেদের অঞ্চলে অর্থনীতিতে যে অব্যবস্থাপনা তৈরি করছে, তাতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পক্ষে সমর্থন কমছে বলে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন।

এ বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠন নরওয়েজিয়ান হেলসিংকি কমিটির জ্যেষ্ঠ পরামর্শক ইভার ডে বলেন, রাশিয়া পক্ষান্তরে ইউক্রেনিয়ান জাতির বোধ শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখছে। যদিও রাশিয়ার রাজনীতিকদের অনেকে বলে থাকেন, ইউক্রেনিয়ান বলে কোনো জাতি নেই।

রাশিয়া-ইউক্রেন সংকট এখন ইউরোপের সবচেয়ে বড় সংঘাতে রূপ নিতে চলেছে। এ যুদ্ধে ইতিমধ্যে ১৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

২০১৪ সালে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী সমরাস্ত্রে ততটা সুসজ্জিত ছিল না। তাদের মনোবলও চাঙা ছিল না। অপর দিকে বিদ্রোহীদের ছিল রাশিয়ার পরামর্শ ও অস্ত্র।
এরপর এই কয়েক বছরে ইউক্রেনিয়ানরা সামরিক ও মানসিক দিক দিয়ে অনেক শক্তিশালী হয়েছে। সাত বছর আগে হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক বিচ্ছিন্নতাবাদীদের রুখতে এগিয়ে এসেছিলেন। তাঁরা আবারও যুদ্ধে যেতে প্রস্তুত আছেন।

২০১৪ সালে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমে যুদ্ধক্ষেত্রে ১৪ মাস কাটিয়েছিলেন স্বেচ্ছাসেবক রোমান নাবোঝনিয়াক। তিনি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘একজন বর্ষীয়ান হিসেবে বহিরাক্রমণ থেকে ইউক্রেনকে রক্ষায় সামরিক বাহিনীতে পুনরায় যোগ দিতে আমি সব সময় প্রস্তুত।’

এর মধ্যে পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ ও তুরস্কের কাছ থেকে আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র পেয়েছে ইউক্রেন। এসব সমরাস্ত্রের মধ্যে ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। আরও আছে তুরস্কে তৈরি বেরাকটার ড্রোন (মানববিহীন যুদ্ধবিমান)। এসব ড্রোন গত বছর আজারবাইজান ও আর্মেনিয়া যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবার অভিশংসিত হয়েছিলেন ইউক্রেনে সামরিক সহায়তা ও অস্ত্র রপ্তানি বন্ধ করার জেরে। তাঁর উত্তরসূরি জো বাইডেন ইউরোপের দেশটিতে এখন প্রাণঘাতী অস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম পাঠাচ্ছেন।

এদিকে ইউক্রেন অভ্যন্তরীণভাবেও অস্ত্র আধুনিকীকরণ ও উৎপাদন বাড়িয়েছে। এসব অস্ত্রের কোনো কোনোটি পশ্চিমা সমরাস্ত্রের মতোই শক্তিশালী।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ

আদর্শিক ও রাজনৈতিক কারণের সঙ্গে এ সংকটের পেছনে অর্থনৈতিক দিকও রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন চান, ২০০০ সালে চালু হওয়া মস্কো নিয়ন্ত্রিত মুক্তবাণিজ্য জোটে যোগ দিক ইউক্রেন। ইউরেশিয়ান ইকোনমিক কমিউনিটির (ইএইসি) পতাকাতলে সাবেক সোভিয়েতভুক্ত বেশ কয়েকটি দেশ মিলেছে এবং একে দেখা হচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়নকে আবার সক্রিয় করার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে।

৪ কোটি ৩০ লাখ জনসংখ্যার দেশ ইউক্রেন কৃষি ও শিল্প উৎপাদনে বেশ এগিয়ে। ইএইসিতে রাশিয়ার পরই শক্তিশালী সদস্য হওয়ার সক্ষমতা রয়েছে তাদের। তবে এ জোটে যোগ দিতে অস্বীকার করে আসছে কিয়েভ।

এ বিষয়ে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যানের তত্ত্বের কথা তুলে ধরে কিয়েভভিত্তিক বিশ্লেষক আলেকসেই কুশচ বলেছেন, একটি স্বনির্ভর বাজার তৈরির জন্য ২৫ কোটির মতো জনসংখ্যার প্রয়োজন হয়। ক্রুগম্যানের মডেলের ওপর ভিত্তি করেই এই ব্লকের চিন্তা করা হয়েছে এবং এটা কার্যকর করার জন্য ইউক্রেন ও উজবেকিস্তানকে (৩ কোটি ৪০ লাখ জনসংখ্যা) দরকার। সে কারণে এই দেশগুলোকে নিয়ে স্থায়ী ভূরাজনৈতিক লড়াই চলছে।

একসময়ের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অংশীদার রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পর ইউক্রেনের অর্থনীতি দুর্বল হয়েছিল। তবে এরপরের সাত বছরে দেশটির অর্থনৈতিক মন্দদশা দূর হয়েছে। বিশ্ববাজারে ইউক্রেনের প্রধান রপ্তানি পণ্য খাদ্যশস্য ও ইস্পাতের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। অপর দিকে ইউক্রেনের কোম্পানিগুলো ও অভিবাসী শ্রমিকেরা পশ্চিমে নতুন বাজার খুঁজে পেয়েছে।

এখন কেন

রাশিয়ার জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে করোনার টিকা নেওয়ার প্রতি অনীহা রয়েছে। অপর দিকে টিকা নিতে সরকারের দিক থেকে চাপ রয়েছে। আবার করোনা মহামারির কারণে দেশটির জনগণকে অর্থনৈতিকভাবে খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। এসব কারণে প্রেসিডেন্ট পুতিনের জনপ্রিয়তা কমছে।

২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের পর ক্রেমলিনের প্রতি সমর্থন তুঙ্গে উঠেছিল—প্রায় ৯০ শতাংশ। এখন তারা মনে করছে, নতুন একটি যুদ্ধ শুরু হলে জনদৃষ্টি অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো থেকে সরে যাবে এবং আবার পুতিনের জনপ্রিয়তা বাড়বে।

ক্রেমলিন আবার পশ্চিমা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে চায়। একই সঙ্গে ইউক্রেন সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে সেনা সমাবেশ ঘটাতে শুরু করে।

গেল বসন্তে (মার্চ-এপ্রিল) ইউক্রেন সীমান্তে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করে এবং জুনে পুতিন প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে বসেন।

গত ৭ ডিসেম্বর দুই প্রেসিডেন্ট দুই ঘণ্টাব্যাপী ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলেন। সেখানে বাইডেন ইউক্রেন বিষয়ে নমনীয় না হলে রুশ প্রেসিডেন্টকে আরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও ইউরোপে ন্যাটো বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানোর হুমকি দেন। তবে পুতিন এখনো সরাসরি বাইডেনের সঙ্গে বসতে চান।

সম্প্রতি রুশ গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে বাইডেনের উদ্দেশে পুতিনকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা অবশ্যই দেখা করব। আমি সত্যিই এটা পছন্দ করি।’

ভাষান্তর: আজিজ হাসান

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে