আর রাজনীতি করব না: ছাত্রলীগ নেতা

0
246
হামলার শিকার শ্রীপুর উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি জাকিরুল ইসলাম।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে গাজীপুর জেলার মাওনা বাসস্ট্যান্ড। এখান থেকে আট কিলোমিটার ভেতরে গেলে শ্রীপুর রেলস্টেশন। স্টেশনের পাশে পদচারী–সেতু ও তার আশপাশ এলাকায় অসংখ্য পোস্টার ও ব্যানার। এতে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসের শ্রদ্ধাঞ্জলি ও ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে দেখা যায়।

গাজীপুর-৩ আসনের বর্তমান সাংসদ ইকবাল হোসেনের পক্ষে ঈদের শুভেচ্ছাবার্তা–সংবলিত পোস্টার–ব্যানারে শ্রীপুর উপজেলা যুবলীগ নেতা হাবিবুর রহমান ওরফে জুয়েল ও আশরাফুল ইসলাম ওরফে ওয়াসিমের নাম চোখে পড়ল। এই দুজন সম্প্রতি ঘটে যাওয়া শ্রীপুর উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি জাকিরুল ইসলাম ওরফে জিকু হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি।

গত ২৯ আগস্ট হামলায় গুরুতর আহত হয়ে জাকিরুল ইসলামের একটি কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তাঁর পুরোপুরি সুস্থ হতে দীর্ঘ সময় লাগবে। সুস্থ হলেও ধকল আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে। এদিকে, শারীরিক এই অসুস্থতার কারণে এবং নিজের মতাদর্শের লোকদের হাতে হামলার শিকার হওয়ায় রাজনীতি ছেড়ে দেবেন বলে জানিয়েছেন জাকিরুল।

ব্যানারে ওয়াসিম, জুয়েল ও মেহেদীর ছবি। যুবলীগের এই তিন নেতা শ্রীপুর উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতির ওপর হামলার মামলার আসামি।

দুই দফা হামলার শিকার
জাকিরুল ইসলামের পরিবার শ্রীপুর উপজেলার স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাঁর দাদা আবুল হাসান একজন মুক্তিযোদ্ধা। শ্রীপুর রেলগেট থেকে একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে আবুল হাসানের নামে। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হন। জাকিরুলের বাবা শরিফুল আলমও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। দাদা ও বাবার রাজনৈতিক মতাদর্শ অনুসরণ করেন জাকিরুল। যুক্ত হন ছাত্রলীগের রাজনীতিতে। শ্রীপুর কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে বর্তমানে উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি তিনি। শ্রীপুরে সাবেক সাংসদ রহমত আলীর অনুসারী হিসেবে জাকিরুলের পরিচিতি আছে।

এলাকার রাজনীতিসংশ্লিষ্ট কয়েকজন জানান, রহমত আলী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাননি। সাতবারের নির্বাচিত এই সাংসদের পরিবর্তে এবার দলীয় মনোনয়ন পেয়ে জয়ী হন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন। নির্বাচিত হওয়ার পরপরই ইকবাল হোসেনের সঙ্গে উপজেলা ছাত্রলীগের দূরত্ব বাড়তে থাকে। গত উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবদুল জলিলের পক্ষে ছিলেন জাকিরুলসহ উপজেলা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা।

অন্যদিকে সাংসদ ইকবাল হোসেন সমর্থন দেন বিদ্রোহী প্রার্থী শামসুল আলম প্রধানকে। নির্বাচনে শামসুল আলম প্রধান জয়ী হলে সাংসদের সঙ্গে ছাত্রলীগের বিরোধ আরও বাড়তে থাকে। এর জের ধরে সাংসদের অনুসারী হিসেবে পরিচিত যুবলীগের এই কয়েকজন নেতাসহ আরও অনেকে জাকিরুলকে নানা ধরনের হুমকি দিতে থাকেন। একপর্যায়ে গত ২২ আগস্ট ও ২৯ আগস্ট জাকিরুলের ওপর দুই দফা হামলা চালানো হয় বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন। জাকিরুলের পরিবারের অভিযোগ, সবশেষ হামলার ঘটনায় তাঁর একটি কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জাকিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানকার আওয়ামী লীগের রাজনীতি এখন দ্বিমুখী। এক অংশে সাবেক সাংসদ রহমত আলীর অনুসারীরা। অপর অংশে বর্তমান সাংসদ ইকবাল হোসেনের অনুসারীরা। আমি রহমত আলীর অনুসারী হওয়ায় বর্তমান সাংসদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। তাঁর পক্ষের ওয়াসিম, জুয়েল আমার ব্যবসার কাজে বাধা দিতে থাকেন। এলাকার কেব্‌ল টিভি সংযোগ ব্যবসার (ডিসেম্বর) অংশীদার ছিলাম। এবার কোরবানির ঈদের পরপরই আমার কর্মচারীরা গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা আনতে গেলে ওয়াসিম বাধা দেন। রেলগেটের পাশে দীর্ঘদিন আগে জেলা পরিষদ থেকে লিজ নেওয়া জায়গায় আমাদের সাতটি দোকান আছে। এই দোকানগুলোর ভাড়াটেদের ওয়াসিম তাঁর অফিসে ডেকে নিয়ে ভাড়ার টাকা না দিতে বলেন। অথচ, এই জায়গাটি আমার পরিবারের সদস্যদের নামে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে জেলা পরিষদ থেকে লিজ নেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক বছরই লিজের টাকা আমরা পরিশোধ করে আসছি।’

জাকিরুল ইসলাম বলেন, ‘ওয়াসিমের হুমকির পর আমি বিষয়টি গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার শামসুন্নাহারকে জানাই। এরপর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল শেখকেও বিষয়টি জানানো হয়। তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখতে শ্রীপুর থানার ওসিকে নির্দেশ দেন। তদন্তে আমাদের কোনো ব্যবসা নিয়ে কোনো ত্রুটি পায়নি শ্রীপুর থানা-পুলিশ। এরপরই ২২ আগস্ট শ্রীপুর রেলগেটে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে আমার ওপর হামলা হয়। আমি ও শ্রীপুর ছাত্রলীগ নেতা রাকিব ও তন্ময় হামলায় আহত হন। এই হামলায় আমার হাতের শিরা কেটে যায়।’

জাকিরুলের অভিযোগ, তিনিসহ আহত দুজনকে চিকিৎসার জন্য শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিতে চাইলে বাধা দেন হামলাকারীরা। পরে তিনি ঢাকায় বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। রাকিব ও তন্ময় ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এ ঘটনায় তিনি বাদী হয়ে ২৩ আগস্ট আটজনকে আসামি করে শ্রীপুর থানায় মামলা করেন। ঢাকায় তিন দিন চিকিৎসার পর শ্রীপুরে ফিরে আসেন তিনি।

জাকিরুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

দ্বিতীয় দফা হামলা
২৬ আগস্ট বাড়ি ফিরে আসার পর তিন দিন ঘরেই ছিলেন জাকিরুল। ২৯ আগস্ট সন্ধ্যার পর শ্রীপুর রেলগেট এলাকায় মোবাইল ফোনে রিচার্জ করতে যান তিনি। এশার আজানের সময় বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। তখন আবার তাঁর ওপর হামলা হয়।

ছাত্রলীগ নেতা জাকিরুল ইসলাম বলেন, ‘মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে বাড়ি ফিরছিলাম। তখনই আমার বাসা থেকে পাঁচ শ গজ দূরে অন্ধকার সড়কে দুটি মোটরসাইকেল আমার সামনে এসে থামে। একটি মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন যুবলীগের সেলিম মুন্সী। মোটরসাইকেল দুটি কিছুটা সামনে যাওয়ার পরই ১০-১৫ জন আমার পেছনে চলে আসে। একজন পেছন থেকে আমাকে লাথি মারে। অন্যরা চিৎকার করে বলে, “তুই মামলা করছিস কেন?” আমি উঠে দৌড় দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু সামনে থাকা দুটি মোটরসাইকেল ব্যারিকেড দেয়। তারপর রড দিয়ে আমাকে বেধড়ক পেটাতে থাকে। আমার বাম চোখের ভ্রুতে রড দিয়ে আঘাত করে। একপর্যায়ে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। তারপর আর কিছুই মনে নেই।’

ওই হামলার দৃশ্য দেখেছেন এমন লোকজন জানান, অনেকে সামনে থাকলেও হামলাকারীরা তাঁদের হুমকি দিতে থাকে। অচেতন হয়ে পড়ে যাওয়ার পর জাকিরুলকে উদ্ধার করে তাঁর বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে পুলিশি পাহারায় তাঁকে প্রথমে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

জাকিরুলের চাচা মঞ্জুর আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘হাসপাতালে নেওয়ার পর কয়েকবার বমি করেন জাকিরুল। টানা দুদিন তাঁর প্রস্রাব বন্ধ ছিল।’

জাকিরুলের কিডনির অবস্থা
দুদিন প্রস্রাব বন্ধ থাকার পর চিকিৎসক দ্রুত পরীক্ষা করতে বলেন। পরে ঢাকার পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কিডনি পরীক্ষা করা হয়। এতে তাঁর ডান কিডনিতে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা ছিল ৫। চার দিন পর কিডনির অবস্থার আরও অবনতি হয়। তখন পরীক্ষা করে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা পাওয়া যায় ৯ দশমিক ৭। পরবর্তীতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইনজেকশন দেওয়া হয়। সর্বশেষ ৭ সেপ্টেম্বর জাকিরুলের কিডনির পরীক্ষা করা হয়। এবার তাঁর ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা পাওয়া যায় ৫ এর ওপরে।

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এখন বাসায় ফিরেছেন জাকিরুল। তাঁকে তিন মাস সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে বলেছেন চিকিৎসকেরা। খাবার নিয়ন্ত্রণ করে দেওয়া হয়েছে। মাছ, মাংস, দুধ না খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা।

জাকিরুলের চিকিৎসক জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক রাশেদ আনোয়ার  বলেন, তাঁর কিডনির ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৭। স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। তাঁর সুস্থ হওয়া সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এ জন্য তাঁকে চিকিৎসকের পরামর্শে চলতে হবে।

নিজের শারীরিক অবস্থার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন জাকিরুল। তিনি বলেন, ‘সাত দিনের ব্যবধানে আমার ওপর দুইবার হামলা চালানো হলো। দুই দফা হামলায় যেসব শারীরিক সমস্যা হচ্ছে, এসব আগে আমার কখনো ছিল না।’

নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জাকিরুল বলেন, ‘আজকে রাজনীতি করতে গিয়েই আমার এই অবস্থা। তাই আর কখনো রাজনীতি করব না। আমার পরিবার থেকে কাউকে রাজনীতিতে আসতেও দেব না।’

এক আসামি পলাতক
জাকিরুলের ওপর গত ২৯ আগস্ট হামলার ঘটনায় তাঁর চাচা মঞ্জুর আলম ৩০ আগস্ট শ্রীপুর মডেল থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় জুয়েল, ওয়াসিমসহ ১৯ জনকে আসামি করা হয়। এঁদের মধ্যে প্রধান আসামি জুয়েল কারাগারে রয়েছেন। আরেক আসামি ওয়াসিম পলাতক। বাকি ১০ জন ধরা পড়লেও তাঁদের মধ্যে সাতজন জামিনে ছাড়া পেয়েছেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শ্রীপুর মডেল থানার পরিদর্শক (অপারেশন) আক্তার হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বের কারণে এই হামলার ঘটনা ঘটেছে।

সাংসদ যা বললেন
শ্রীপুর উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি জাকিরুল ইসলামের ওপর হামলা রাজনৈতিক নয়, ব্যবসায়িক কারণে হয়েছে বলে দাবি করেন সাংসদ ইকবাল হোসেন। তবে ঘটনাটি দুঃখজনক মন্তব্য করে ১৭ সেপ্টেম্বর তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের কোনো দল থাকতে পারে না। জিকুর (জাকিরুল ইসলাম) ওপর হামলার পর পুলিশকে সরাসরি বলেছি, আসামিদের ধরতে। এর মধ্যে অনেকে ধরাও পড়েছে।’

আসামি জুয়েল ও ওয়াসিমের ব্যানার–পোস্টার টানিয়ে সাংসদের পক্ষে ঈদ শুভেচ্ছা জানানোর বিষয়টি উল্লেখ করা হলে ইকবাল হোসেন বলেন, ‘সবাই তো আমার ছবি পোস্টারে ব্যবহার করে।’

জাকিরুলের রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা সাংসদকে জানালে তিনি বলেন, ‘এটা তো আমি জানি না। আমি চাই যারা রাজনীতিতে আছে, সবাই যেন রাজনীতি করে।’

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে