আমের নগরে উদ্বেগ আর বিষণ্নতা

0
84
১৫ মে শুরু হবে আম পাড়া। কিন্তু প্রতিবছরের মতো এখনো শুরু হয়নি বেচা-বিক্রির কোনো আয়োজন। গতকাল দুপুরে রাজশাহীর রায়পাড়ায়।

মৌসুম চলে এসেছে আমের। অন্য বছরগুলোতে এ সময় আম বেচাকেনা নিয়ে রীতিমতো উৎসব শুরু হয়ে যেত আমের রাজধানী হিসেবে খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জ কিংবা রাজশাহীতে। তবে এ বছর আমের নগরে উৎসব নেই।

আম পাড়ার দিনক্ষণ ঠিক হয়েছে। রাজশাহীতে ১৫ মে থেকে আর চাঁপাইনবাবগঞ্জে গাছে আম পাকলেই পাড়া যাবে। আম বেচাকেনা নির্বিঘ্ন করতে প্রতিবারের মতো এবারও প্রশাসন নানা ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু আম কেনার কোনো লোক নেই। হাটবাজারগুলো এখনো সুনসান। বাগানমালিক, ব্যাপারী, খুচরা ব্যবসায়ীসহ আমের সঙ্গে যুক্ত কয়েক লাখ মানুষের দম ফেলার ফুরসতটুকুও মিলত না এ সময়। তবে এ বছর সব পাল্টে দিয়েছে করোনাভাইরাস। এই অঞ্চলের প্রধান অর্থকরী ফসল আম। আমের ওপর নির্ভরশীল বহু মানুষের জীবন ও জীবিকা। আম বেচতে পারবেন কি না, বিক্রি হলেও ঠিক দাম পাবেন কি না, এসব নানা উদ্বেগে রয়েছেন চাষি ও বাগানমালিকেরা। বিষণ্নতা নেমে এসেছে ঘরে ঘরে।

প্রতিবছর ঢাকার ব্যবসায়ীরা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আম কেনার জন্য শত শত কোটি টাকা দাদন (সুদবিহীন ঋণ) হিসেবে আগাম দিয়ে থাকেন। শর্ত হচ্ছে, ওই ব্যবসায়ীদের আড়তে আম দিতে হবে। এবার তাঁরাও কোনো টাকা দেননি। প্রতিবছর এ সময় রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম ব্যবসায়ীদের সেই রকম দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে যায়, বাজার এলাকার রাস্তাগুলো ট্রাক, ভ্যান আর মোটরসাইকেলে ঠাসা থাকে। একটি বাগান এর মধ্যেই দু-তিন হাত বদল হয়ে যায়। এবার এই ব্যবসায়ীরা কেউ আম কিনতে আসছেন না। স্থানীয় কিছু ছোট ব্যবসায়ী মাঠে আছেন। তাঁরা গতবারের চেয়ে পাঁচ থেকে ছয় গুণ কম দাম বলছেন। এ নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন চাষিরা। তাঁরা বলছেন, এবার আম বিক্রি করে পরিচর্যার খরচ তোলা যাবে কি না, এ নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আড়পাড়া গ্রামের আমচাষি ও ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, এবার ঢাকার ব্যবসায়ীরা কোনো দাদন তো দেনইনি, তাঁরা গতবারের আমের দামও দেননি। এখন পর্যন্ত এলাকার বাইরের কোনো ব্যবসায়ী আম কিনতেও আসেননি। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা তিন লাখ টাকার বাগানের দাম বলছেন ৫০-৬০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, এবার আম পরিচর্যার খরচ তোলা নিয়েই উদ্বেগে তাঁরা।

আম বেচাকেনা নিয়ে একই রকম হতাশার কথা বলেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ ম্যাংগো প্রডিউসার কো-অপারেটিভ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক শামীম খান বলেন, অন্য বছর ব্যবসায়ীরা আম কিনতে যেভাবে হুমড়ি খেয়ে পড়তেন, এ বছর তার ছিটেফোঁটাও নেই। ব্যবসায়ীরা যোগাযোগই করছেন না। খুব উদ্বেগে দিন কাটছে তাঁদের। জেলার ভোলাহাট আম ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক, ম্যাংগো প্রডিউসার অ্যান্ড মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুল ওয়াহেদও একই রকম উদ্বেগের কথা জানান।

শিবগঞ্জের কানসাট আমবাজারই হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় আমবাজার। সেখানে অন্য বছরগুলোতে এই সময়ের মধ্যেই বাগান হাতবদল হয়ে লেনদেন হতো কোটি কোটি টাকার। আমকে ঘিরে উৎসব শুরু হয়ে যায়। এবার তার ছিটেফোঁটাও নেই।

রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আলীম উদ্দীন জানান, গত বছরের চেয়ে রাজশাহীতে এবার ফলন বেশি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের ফলন কিছুটা কমতে পারে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ বছর আমের ফলনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে রাজশাহীতে ২ লাখ ১১ হাজার টন আর চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২ লাখ ৩৯ হাজার টন।

কয়েক বছর থেকে আম রপ্তানিকারক সমিতির মাধ্যমে ‘কন্টাক্ট ফার্মিং’ করে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের গ্রাম থেকে সরাসরি ৫৭ জন চাষি বিদেশে আম রপ্তানি করেছেন। এবারও কন্টাক্ট ফার্মিংয়ের আওতায় এই চাষিদের আম পরিচর্যায় কৃষি বিভাগ থেকে বিশেষ নজরদারি করা হয়েছে। কিন্তু করোনা সংকটের কারণে বিদেশি কোনো ক্রেতা এখন পর্যন্ত তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি।

রপ্তানিকারক সমিতির সঙ্গে চুক্তি করে রাজশাহীর বাঘা থেকে সরাসরি ইউরোপের বাজারে আম পাঠায় সাদী এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। গত বছর প্রতিষ্ঠানটি নিজের বাগানের ও কেনা মিলিয়ে প্রায় দুই হাজার টন আম বিক্রি করেছে। বিদেশে পাঠিয়েছে ৩৬ টন আম। প্রতিষ্ঠানটির মালিক শফিকুল ইসলাম বলেন, এবার গাছে আম কম কিন্তু আকারে বড় হয়েছে। ফলন আরও বেশি হতে পারে কিন্তু এখন পর্যন্ত দেশি-বিদেশি কোনো ক্রেতাই তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। প্রতিবছর এত দিনে ক্রেতারা হুমড়ি খেয়ে পড়তেন।

তবে রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শামছুল হক বলেন, রাজশাহীতে এবার দেরিতে আমের মুকুল এসেছে। আম পাকবে দেরিতে। তাঁরা এখনো এক মাস সময় হাতে পাবেন। এই সময়ের মধ্যে অনেক কিছুই স্বাভাবিক হয়ে আসবে। আমের বাজার পাওয়া যাবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ) আসনের সাংসদ সামিল উদ্দীন আহমেদ বলেন, ইতিমধ্যেই প্রশাসন, আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সভা হয়েছে। আমের বাজারজাত নির্বিঘ্ন করার সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অন্যদিকে নিরাপদ আম, অর্থাৎ রাসায়নিকমুক্ত আম সরবরাহও নিশ্চিত করা হবে।

আর রাজশাহীর জেলা প্রশাসক হামিদুল হক বলেন, আমে রাসায়নিকের ব্যবহার ঠেকাতে এবং অসময়ে আম পাড়া বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং পুলিশ কঠোরভাবে নজরদারি করবে।

আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ, রাজশাহী ও আনোয়ার হোসেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে