আমিরাতের জবাব আসেনি, বিমানবন্দরে শুরু হয়নি করোনা পরীক্ষা

0
36
শাহজালাল বিমানবন্দর

গাজীপুরের গিয়াস উদ্দিন ৯ মাস আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে দেশে এসেছেন ছুটিতে। করোনার কারণে ফ্লাইট বন্ধ হওয়ায় কর্মস্থলে ফেরা হচ্ছে না তার। গত ৬ সেপ্টেম্বর ভিসার মেয়াদ ফুরিয়েছে তার। মঙ্গলবার ঢাকার হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে এসেছিলেন কর্মস্থলের ফেরার উপায় খুঁজতে। এসে জানলেন, আমিরাতের বিমানে উঠার জন্য বিমানবন্দরে বাধ্যতামূলক করোনা পরীক্ষা মন্ত্রীদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চালু হয়নি, কবে হবে- তাও নিশ্চিত নয়।

খবরটি শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন গিয়াস উদ্দিন। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলেন, বিদেশে কাজে ফিরতে না পারলে অর্থাভাবে পরিবার নিয়ে মরা ছাড়া আর কোনো গতি নেই তার।

গিয়াস উদ্দিনের মতো হাজার আরব আমিরাত প্রবাসী দেশে এসে আটকা পড়েছেন। যারা ফিরতে পারছেন না বিমানবন্দরে করোনার র‌্যাপিড পরীক্ষার সুবিধা চালু না হওয়ায়। ভারত, পাকিস্তান এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে দেশটিকে নিয়ে হাস্যরস করা হয় সেই উগান্ডার বিমানবন্দরেও করোনার র‌্যাপিড পরীক্ষার পিসিআর ল্যাব স্থাপন হয়েছে। ভারত থেকে ৯ আগস্ট এবং পাকিস্তান থেকে ১৬ আগস্ট থেকে যাত্রী যাচ্ছে আরব আমিরাতে।

সেই সব দেশের বিমানবন্দরে ল্যাব স্থাপনের পর তা করোনা পরীক্ষার জন্য উপযুক্ত কিনা- আমিরাতের কাছ থেকে এমন মতামত নেওয়ার নজির নেই। কিন্তু শাহজালালে স্থাপিত ছয় ল্যাবে করোনা পরীক্ষা অনুমোদন চেয়ে গত ১৮ সেপ্টেম্বর আমিরাতের কাছে চিঠি পাঠায় বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। ল্যাব স্থাপন করা প্রতিষ্ঠানগুলোর দেওয়া এসওপি অনুমোদনের জন্য আমিরাতে পাঠায়। তার জবাব ১১ দিনেও দেয়নি দেশটি। জবাব আসেনি এ যুক্তিতে শাহাজালালের ল্যাবে করোনা পরীক্ষা শুরু হয়নি, যেতে পারছেন না আটকেপড়া প্রবাসীরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যে কারিগরি কমিটি বিমানবন্দরে করোনা পরীক্ষার ল্যাব স্থাপনের জন্য প্রতিষ্ঠান বাছাই করেছিল, তারা গত ২৬ সেপ্টেম্বর বেবিচককে চিঠি দিয়ে জানায় ল্যাবগুলো র‌্যাপিড টেস্টের জন্য সক্ষম। এরপর দুই দিন পার হলে পরীক্ষা শুরু হয়নি- আমিরাতের অনুমোদন মেলেনি এই অজুহাতে।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্র বলেছে, বিমানবন্দরে স্থাপন করা ল্যাবগুলো করোনা পরীক্ষায় সক্ষম কি-না তা আমিরাত জানতেই চায়নি। এমন কোনো চিঠি মন্ত্রণালয়ে আসেনি। বিমাববন্দর কর্তৃপক্ষ নিজের আগ্রহে অনুমোদনের জন্য এসওপি পাঠিয়েছে। এখন বলছে- এসওপির অনুমোদন পাওয়া যাচ্ছে না। আমিরাত সরকার এসওপি চায়নি- অনুমোদন কেনো দেবে? তবে এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ করে মন্তব্য করেননি। মন্ত্রী ইমরান আহমদ বিদেশ সফরে থাকায় তার বক্তব্য জানতে পারেনি ।

ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বলেছেন, করোনা র‌্যাপিড পরীক্ষা ‘রকেট’ সায়েন্স নয়। উগান্ডাতেও এই পরীক্ষা হচ্ছে। পৃথিবীর কোনো দেশে সামান্য করোনা পরীক্ষা নিয়ে এত টানাহ্যাচড়া হয়নি। অন্য কোনো দেশকে ল্যাবের অনুমোদন আমিরাতের কাছ থেকে নিতে হয়নি। বাংলাদেশকে কেনো নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৬ সেপ্টেম্বর বলেছেন, দুই তিন দিনের মধ্যে টেস্ট সুবিধা চালু করতে। এরপর মন্ত্রীরা বারবার দিনক্ষণ ঘোষণা করার পরও টেস্ট চালু হয়নি। এর মাধ্যমে মন্ত্রীদের মিথ্যাবাদী বানানো হয়েছে। আগেই চাপ রয়েছে- একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠানকে বিমানবন্দরে করোনা পরীক্ষার কাজ দিয়ে লাভবান করার। সেই কারণে টেস্ট নিয়ে কালক্ষেপন এবং আমিরাতের অনুমোদনের অজুহাত দেওয়া হচ্ছে কিনা তদন্ত করা উচিত সরকারের।

এদিকে মঙ্গলবার বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম মফিদুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, স্বাস্থ্য অধিদফতর বিমানবন্দরে যে ল্যাবটি বসিয়েছে, তা ব্যবহার করে যাত্রীরা যেতে পারেন। বেসরকারি ছয় প্রতিষ্ঠানের ল্যাব প্রস্তুত রয়েছে। তাদের দেওয়া স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরে (এসওপি) আমিরাতের সম্মতি থাকতে হবে। দুই সপ্তাহ আগেই এসওপি পাঠিয়েছি। এর অনুমোদন আমিরাত এখনো দেয়নি। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঢাকাস্থ আমিরাত দূতাবাসের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। বিশেষ ফ্লাইট আপাতত আর পরিচালনা করা হবে না। এসওপি অনুমোদনের চিঠি পেলে ফ্লাইট চলবে। মঙ্গলবার সন্ধ্যার ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।

বেবিচক কর্মকর্তারা জানান, আমিরাতের অনুরোধে ও এমিরেটসের উদ্যোগে কয়েকটা ফ্লাইট গেছে পরীক্ষামূলকভাবে। এসব ফ্লাইটে ব্যবসার কাজে এবং জরুরি প্রয়োজনে যাত্রীরা গিয়েছেন। তাদের করোনা পরীক্ষা ছয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটির মাধ্যমে করা হয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও বেবিচক সূত্র জানিয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানটিকেই এককভাবে করোনা পরীক্ষার কাজ দিতে ‘চাপ’ ছিল। প্রতিষ্ঠানটি গত মাসে মন্ত্রণালয়ে দেওয়া প্রস্তাবে আমিরাত দূতাবাসের প্রত্যায়ন জমা দিয়েছিল। যাতে বলা হয়, তারা করোনা পরীক্ষার জন্য আমিরাত সরকারের অনুমোদিত। যদিও এ প্রত্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।

আটকেপড়া আমিরাত প্রবাসী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মহিউদ্দিন বেলাল রনি বলেছেন, কে কাজ পাবে, কে কত মুনাফা করবে- তারা জটিলতা বোঝেন না। প্রবাসীরা কাজে ফিরতে চান না। অনেকে ছয়/সাত মাস দেশে বেকার বসে আছেন। সঞ্চয় ভেঙে খেয়েছেন। এখন আর পেট চালাতে পারছেন না।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে