অনিয়ম করে এমফিলে ভর্তি হন জিএস রাব্বানী

0
290
গোলাম রাব্বানী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর এমফিল (মাস্টার অব ফিলোসফি) ভর্তিতে অনিয়ম করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের এমফিলের ছাত্র হিসেবে তিনি ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন।

রাব্বানী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হয়েছিলেন। ২০১৩ সালে তাঁর স্নাতকোত্তর শেষ হয়। এরপর এমফিলে ভর্তি হয়ে তিনি গত ১১ মার্চ ডাকসু নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। ওই নির্বাচনে জিএস নির্বাচিত হন তিনি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প থেকে চাঁদা দাবিসহ বিভিন্ন অভিযোগে গত ১৪ সেপ্টেম্বর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ ছাড়েন তিনি।

অনুষদের সুপারিশ ছাড়াই ভর্তি হয়ে ডাকসুর জিএস নির্বাচিত হন গোলাম রাব্বানী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমফিল প্রোগ্রামে ভর্তির নিয়ম অনুযায়ী, কোনো শিক্ষার্থী এমফিলে ভর্তি হতে চাইলে সংশ্লিষ্ট বিভাগে আবেদনের পর বিভাগের একাডেমিক কমিটি, অনুষদ সভা, বোর্ড অব অ্যাডভান্স স্টাডিজের সভার সুপারিশের পর একাডেমিক পরিষদের সভায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গোলাম রাব্বানীকে এমফিলে ভর্তির ক্ষেত্রে অনুষদ সভার সুপারিশ ছিল না বলে নিশ্চিত হয়েছে প্রথম আলো। এমনকি বোর্ড অব অ্যাডভান্স স্টাডিজ ও একাডেমিক পরিষদের নিয়মিত যে অ্যাজেন্ডা, সেখানেও তাঁর নাম পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে গত ২১ সেপ্টেম্বর গোলাম রাব্বানী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ীই তিনি ভর্তি হয়েছেন। বোর্ড অব অ্যাডভান্স স্টাডিজ এবং একাডেমিক পরিষদের নিয়মিত সভার অ্যাজেন্ডায় নাম না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টা খোঁজ নিয়ে দেখব।’ তিনি খোঁজ নিয়ে কী পেলেন, তা জানতে গতকাল কয়েক দফা যোগাযোগ করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অপরাধবিজ্ঞান বিভাগ থেকে রাব্বানীর এমফিলে ভর্তির নথি সংগ্রহ করে দেখা যায়, এ বছর বোর্ড অব অ্যাডভান্স স্টাডিজের ২২ জানুয়ারির সভা ও ২৪ জানুয়ারির একাডেমিক পরিষদ সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁকে ২০১৮–১৯ শিক্ষাবর্ষে এমফিল প্রোগ্রামের প্রথম বর্ষে ভর্তির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। নথি অনুযায়ী রাব্বানীর সঙ্গে এই বিভাগে আরও দুজনকে এমফিলে ভর্তি করা হয়েছে। এই তিনজনের তত্ত্বাবধায়ক বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক জিয়া রহমান।

বোর্ড অব অ্যাডভান্স স্টাডিজ ও একাডেমিক পরিষদের কার্যবিবরণীতে ২০১৮–১৯ শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল প্রথম বর্ষে ভর্তির অনুমতির জন্য উত্থাপিত শিক্ষার্থীদের তালিকা উল্লেখ আছে। কিন্তু কোনোটিতেই অপরাধবিজ্ঞান বিভাগ থেকে কোনো শিক্ষার্থীকে এমফিল প্রথম বর্ষে ভর্তির বিষয় সেখানে উল্লেখ নেই। রাব্বানীর ভর্তির নথিতে সই করা উপ–রেজিস্ট্রার শেখ মো. জামাল বলেন, ২৪ জানুয়ারি একাডেমিক কাউন্সিলের সভার পাঁচ–দশ মিনিট আগে অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান জিয়া রহমান উপাচার্যের কাছে গোলাম রাব্বানীসহ তিনজন শিক্ষার্থীর এমফিলে ভর্তির অ্যাজেন্ডা নিয়ে যান। তাঁদের ভর্তির বিষয়টি ওই সভায় অনুমোদিত হয়েছে বলে জানানোর পর গোলাম রাব্বানীসহ তিনজনের নাম তাঁরা সভার সিদ্ধান্তের কপিতে যুক্ত করেন।

প্রশাসনিক ভবন থেকে ওই সিদ্ধান্তের একটি কপি সংগ্রহ করে দেখা যায়, সিদ্ধান্তের নিয়মিত কপিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সই থাকলেও গোলাম রাব্বানীসহ অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের তিন শিক্ষার্থীর এমফিল ভর্তির অনুমোদনের পৃষ্ঠাটিতে কারও সই নেই।

অপরাধবিজ্ঞান বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে। এই অনুষদের যাঁরা ২০১৮–১৯ শিক্ষাবর্ষে এমফিলে ভর্তির অনুমতি পেয়েছেন, তাঁদের বিষয়ে গত ১৬ জানুয়ারির অনুষদ সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেখানও অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধীনে কোনো শিক্ষার্থীকে এমফিলে ভর্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি।

গোলাম রাব্বানীসহ তিনজনের এমফিলে ভর্তির বিষয়ে জানতে চাইলে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন সাদেকা হালিম বলেন, নিয়মমাফিক যেসব শিক্ষার্থী এমফিলে ভর্তি হন, তাঁদের বিষয়ে অনুষদ সভায় সিদ্ধান্ত হয়ে বোর্ড অব অ্যাডভান্স স্টাডিজে আলোচনার জন্য পাঠানো হয়। কিন্তু এই তিনজনের নামই বিভাগ থেকে অনুষদ সভায় পাঠানো হয়নি। এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তও হয়নি। তাঁরা তাহলে কীভাবে ভর্তি হয়েছেন, জানতে চাইলে সাদেকা হালিম বলেন, ‘বিষয়টি আমি অবগত নই।’

তবে ভর্তির ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করেছেন অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান জিয়া রহমান। গত ২২ সেপ্টেম্বর তিনি বলেন, তিন শিক্ষার্থীর মধ্যে একজনের গবেষণার সারাংশ জমা দিতে দেরি হয়েছিল। এ কারণে অনুষদ সভা ছাড়াই তিনি ভর্তির অনুমতির জন্য পাঠান। এ প্রক্রিয়াকে ‘টেবিল অ্যাজেন্ডা’ বলে। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈধ কোনো প্রক্রিয়া কি না, জানতে চাইলে এই অধ্যাপক বলেন, ‘এটি বহুল প্রচলিত একটি প্রক্রিয়া।’

তবে অনুষদ সভা ও বোর্ড অব অ্যাডভান্স স্টাডিজের সভায় ভর্তির বিষয়টি না যাওয়া মানে এটা অনিয়ম বলে মন্তব্য করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন মো. হাসানুজ্জামান। ১১ ফেব্রুয়ারি ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ছাত্রলীগের ৩৪ জন সাবেক ও বর্তমান নেতা পরীক্ষা ছাড়াই ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের মাস্টার্স অব ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামে ভর্তি হন। তাঁদের মধ্যে ডাকসুতে বিজয়ী হন সাতজন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে